বাংলাদেশে দারিদ্র্য রোধের উপায়গুলো ব্যাখ্যা কর।

অথবা, বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায়সমূহ আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশে দারিদ্র্য রোধের উপায় বর্ণনা করা।
অথবা, বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায়সমূহ কী কী?
অথবা, বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায়গুলো আলোকপাত কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
যদিও পঞ্চাশের দশক থেকে আমাদের দেশে পরিকল্পিত উন্নয়ন শুরু হয়েছিল, কিন্তু সমাজের অবহেলিত ও দুর্বল শ্রেণি ও উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত রয়েছে এবং যতদিন যায় ধনী ও গরিবের মধ্যকার এ ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সমসাময়িককালে দারিদ্র্য একটি বহুল আলোচিত বিষয়, যা মানবতার প্রতি একটি বড় অভিশাপ। আধুনিক মানবসভ্যতার বিকাশে দারিদ্র্য একটি মারাত্মক অন্তরায়। অনুন্নত ও তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহের বিশেষ করে বাংলাদেশের অনুন্নয়নের অন্যতম কারণ হলো দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের সারিতে স্থান পাওয়া ১৩টি দেশের একটি হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমান বিশ্বে ‘দারিদ্র্য বিমোচন’ (Poverty Alleviation) একটি সামাজিক আন্দোলনে (Social movement) রূপ নিয়েছে।
দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায় : নিম্নে বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণের পদক্ষেপ আলোচনা করা হলো :
১. সম্পদের সুসম বণ্টন : আমাদের দেশের ২০% সম্পদ ৮০% লোক ভোগ করে। আর ৮০% সম্পদ ২০% লোক ভোগ করে। Land reform এবং প্রগতিশীল করারোপ করে ধনীদের কাছ থেকে সম্পদ এনে গরিবদের প্রদান করার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন অনেকাংশে সম্ভব। এক্ষেত্রে জাকাত প্রথাকে সমর্থন করা যায়।
২. যুবসমাজের অংশগ্রহণ : উৎপাদন খাতে যুবসমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং সে সাথে বেকার সমস্যার সমাধানও হবে। ফলে দেশে দারিদ্র্যের সংখ্যা কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে।
৩. সামাজিক সমতা : দারিদ্র্য দূরীকরণের সামাজিক সমতার বিধান করতে হবে। কারও দক্ষতা, যোগ্যতা, নেপুণ্য মর্যাদা অনুযায়ী তার কাজ নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক পদমর্যাদা অনুযায়ী এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মবণ্টন নিশ্চিত করতে পারলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হবে। যেমন- শ্রমিক শ্রেণিকে কাজের নিশ্চয়তা, ডাক্তার, নার্স, প্রভৃতি পেশাজীবীদের কর্মের ব্যবস্থা করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন করতে হবে।
৪. সঞ্চয় বৃদ্ধি : সঞ্চয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব। তাইওয়ানের GDP এর ৫২% আসে সঞ্চয় থেকে। মালেশিয়ায় আসে ৪৬%। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পদ্ধতির মাধ্যমে সঞ্চয় বৃদ্ধি করা উচিত।
৫. কৃষি উন্নয়ন : আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বহুমুখী কৃষি উৎপাদন, ভূমি খণ্ডায়ন দূরীকরণ প্রচলিত ভূমিস্বত্ব ব্যবস্থার সংস্কার ইত্যাদির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা যায়।
৬. শিল্পায়ন : শিল্পক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমর্থনে উপযুক্ত শিল্প নীতি প্রণয়ন এবং দেশীয় কাঁচামাল ও উন্নত
প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব।
৭. কুটিরশিল্পের প্রসার : গ্রামীণ দক্ষ ও কারিগরিদের সংগঠিত করে স্থানীয় কাঁচামাল ও চাহিদানির্ভর কুটিরশিল্প স্থাপনের মাধ্যমে পল্লি এলাকায় কর্মসংস্থান এর সুযোগ সৃষ্টির মধ্যদিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।
৮. বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার : বাস্তব চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে। বৃত্তিমূলক কর্মসূচি ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে জনগণকে সম্পদে পরিণত করতে হবে এবং কর্মসংস্থান দেশে ও বিদেশে নিশ্চিত করতে হবে।
৯. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা : প্রাকৃতি দুর্যোগময় আমাদের দেশে বন্যা, খরা, ঝড়, সাইক্লোন, প্রভৃতির কারণে ব্যাপক সম্পদ ও জানমালের ক্ষতি হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ কিছুটা হলেও সম্ভব।
১০. শিক্ষার প্রসারতা : বলা হয় “Education is the panacea for of all development”. সুতরাং, শিক্ষাবিস্তারের মাধ্যমে জনগণকে কাজ ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে তারা যে কোনো কাজ সুষ্ঠু ও পরিকল্পনায় সঠিক বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে, যা দারিদ্র্য দূরীকরণের মোটামুটি ভূমিকা পালন করে থাকে।
১১. গণমুখী প্রশাসন কাঠামো সৃষ্টি : দারিদ্র্য দূরীকরণে তথা পল্লিউন্নয়নের লক্ষ্যে বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে সঠিক খাতে যথাযথভাবে ব্যয় করা হয়, তার জন্য উপযুক্ত, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন কাঠামো গঠন করা প্রয়োজন।
১২. স্বেচ্ছাসেবী কার্যাবলির তত্ত্বাবধান : বাংলাদেশে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি সাহায্যপুষ্ট দেশীয় সংস্থার দূরীকরণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই তাদের কাজের সাথে সহায়তা, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করা দরকার। এজন্য সরকারি পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১৩. স্থানীয় পর্যায়ে কর্মমুখী পরিকল্পনা : বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে দারিদ্র্য কিছুটা রোধ করা সম্ভব। যেমন- থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যাবলি হাতে নেওয়ার মাধ্যমে গ্রামের দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো যায়। এর ফলে উন্নয়নমূলক কাজও বাস্তবায়িত হলো, সাথে সাথে দরিদ্র
জনগণের আর্থিক সচ্ছলতা আসল। যেমন- কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (কাবিখা) বিভিন্ন অবকাঠামোগত কার্যাবলি যেমন— রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট, সেতু প্রভৃতি নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে দরিদ্র একটি রাষ্ট্রভিত্তিক ও জাতীয় সমস্যা আকারে রূপ নিয়েছে। সমস্যা নিরলসকল্পে সরকারি পদক্ষেপ অনস্বীকার্য। সাথে সাথে সর্বস্তরের জনগণ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সমাজকর্মী, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী গোষ্ঠী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, প্রভৃতিদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এ সমস্যা নিরসনে একযোগে কাজ করতে হবে। উপর্যুক্ত পদক্ষেপগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ থেকে দারিদ্র্য বিমোচন কিছুটা হলেও সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। তবে দারিদ্র্য বিমোচনে উক্ত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকরী ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন সাথে সাথে দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা নিবিড় করতে হবে। তবে দারিদ্র্য বিমোচনের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন সহজ
ও সুফল হবে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079
or 01773270077

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*