অথবা, বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণে একজন সমাজকর্মীর ভূমিকা ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণে একজন সমাজকর্মীর ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
অথবা, বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণে একজন সমাজকর্মীর ভূমিকা আলোচনা কর।
উত্তর ভূমিকা : যদিও পঞ্চাশের দশক থেকে আমাদের দেশে পরিকল্পিত উন্নয়ন শুরু হয়েছিল, কিন্তু সমাজের অবহেলিত ও দুর্বল শ্রেণি ও উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত রয়েছে এবং যতদিন যায় ধনী ও গরিবের মধ্যকার এ ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সমসাময়িকালে দারিদ্র্য একটি বহুল আলোচিত বিষয়, যা মানবতার প্রতি একটি বড় অভিশাপ। আধুনিক মানবসভ্যতার বিকাশে দারিদ্র্য একটি মারাত্মক অন্তরায়। অনুন্নত ও তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহের বিশেষ করে বাংলাদেশের অনুন্নয়নের অন্যতম কারণ হলো দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের সারিতে স্থান পাওয়া ১৩টি দেশের একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমান বিশ্বে ‘দারিদ্র্য বিমোচন’ একটি সামাজিক আন্দোলনের (Social movenent) রূপ নিয়েছে।
দারিদ্র্য দূরীকরণে একজন সমাজকর্মীর ভূমিকা : একজন সমাজকর্মীর দায়িত্ব মূলত পরোক্ষ, যেমন- দারিদ্র্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, শিক্ষা বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করা, দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক গবেষণা ইত্যাদি । তবে তারা দারিদ্র্য দূরীকরণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিম্নে এ ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. সামাজিক জরিপ ও গবেষণা : দারিদ্র্য একটি মারাত্মক সমস্যা। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে সমাজকর্মী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সামাজিক জরিপ, যেমন- দারিদ্র্যের প্রভাব, প্রকৃতি, কারণ প্রভৃতি সম্পর্কে ব্যাপক ও বাস্তব তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন। এ তথ্য অনুযায়ী দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায় সম্পর্কে গবেষণা করে বের করতে হবে।
২. শিক্ষার উন্নয়ন : বলা হয় “Education is the panacea for of all development.” সুতরাং, উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে শিক্ষাকে গণ্য করা হয়। আর এ শিক্ষার উন্নয়নে একজন সমাজকর্মী সমাজে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন- কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, আধুনিক শিক্ষা প্রভৃতির প্রচলনের পরামর্শ দিয়ে দেশে কর্মসংস্থানের
ব্যবস্থা করতে পারে, যার দ্বারা দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে।
৩. সম্পদের সুষম বণ্টন : ভূমি সংস্কার প্রগতিশীল করারোপ, যাকাত ব্যবস্থা প্রভৃতির মাধ্যমে ধনীদের থেকে সম্পদ এনে গরিবদের বণ্টন করার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা অনেকাংশে সম্ভব। আর এক্ষেত্রে একজন সমাজকর্মী সরকার তথা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে পারে, পরামর্শ দিতে পারে এবং সুফল তুলে ধরতে পারে।
৪. কৃষি উন্নয়ন : একটি কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে এ দেশের কৃষি উন্নয়ন অপরিহার্য। আর কৃষির উন্নয়নে আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত সার, বীজ, প্রভৃতি দরকার যা উৎপাদন বৃদ্ধি করবে। আর এ উৎপাদন বৃদ্ধিতে এ দেশের সর্বস্তরের জনগণকে সহায়তা করতে হবে।
৫. যুব সমাজের অংশগ্রহণ : যুব সমাজ একটা দেশের মানবসম্পদরূপে বিবেচিত হয়। আমাদের দেশের যুব সমাজকে দারিদ্র্য দূরীকরণে উৎপাদন খাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে। আর এ অংশগ্রহণের ফলে বেকারসমস্যা দূর হবে।
৬. সঞ্চয় বৃদ্ধি : সঞ্চয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ করা সম্ভব। আকতার হামিদ খানের কুমিল্লা মডেলের কথা বলা যেতে পারে, যেখানে গ্রামের দারিদ্র্য কৃষক গোষ্ঠী সঞ্চয়ের মাধ্যমে তাদের দারিদ্র্য বিমোচন করতে সক্ষম হয়েছিল। তাইওয়ানের জিডিপি (GDP) এর ৫২% আসে সঞ্চয় থেকে, মালেশিয়া ৪৬%। সুতরাং, আমাদের দেশের অর্থনৈতিক
উন্নয়নে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পদ্ধতিতে সঞ্চয় বৃদ্ধি করা উচিত।
৭. কুটিরশিল্পের প্রসার : গ্রামীণ দক্ষ ও কারিগরিদের সংগঠিত করে স্থানীয় কাঁচামাল ও চাহিদানির্ভর কুটিরশিল্প স্থাপন করার মাধ্যমে পল্লি এলাকার কর্ম সংস্থান বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আর এর মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস করা সম্ভব।
৮. বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার : বাস্তব চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে জনগণকে সম্পদে পরিণত করতে হবে এবং তাদের কর্মসংস্থান দেশে ও বিদেশে নিশ্চিত করতে হবে। জনসংখ্যাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্পদে পরিণত করতে পারলেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে
সহায়তা করবে। চীন তার বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে এখনও টিকে আছে। ভারত তার দক্ষ জনশক্তি নিয়ে এখনও উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছে।
৯. প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার : আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। যেমন- গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথর ইত্যাদি। এ প্রাকৃতিক সম্পদের সৃষ্ট ব্যবহার দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করতে পারে। গ্যাস, বিদ্যুৎ
কয়লা প্রভৃতি সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করে শিল্পোন্নয়ন করা সম্ভব, যেখানে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে সাথে সাথে বেকার সমস্যা দূর হবে।
১০. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা : প্রাকৃতিক দুর্যোগময় বাংলাদেশে বন্যা, খরা, সাইক্লোন প্রভৃতির কারণে ব্যাপক সম্পদ ও জানমালের ক্ষতি হয়, যার কারণে আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি একেবারে ভেঙে পড়ে। সুতরাং, এ প্রাকৃতিক সমস্যা মোকাবিলা করে দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব।
১১. গণমুখী দক্ষ প্রশাসন কাঠামো সৃষ্টি : দারিদ্র্য দূরীকরণে তথা পল্লিউন্নয়নের লক্ষ্যে বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে সঠিক খাতে এবং সুষ্ঠুভাবে ব্যয় করা হয়, তার জন্য উপযুক্ত, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন কাঠামো গঠন করা প্রয়োজন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা বলতে পারি যে, দারিদ্র্য বাংলাদেশের একটি মারাত্মক সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সমানভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। সুশীল সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সমাজকর্মী প্রভৃতি শ্রেণিগুলো দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আর দারিদ্র্য সম্পর্কে সর্বস্তরে সচেতন ও গবেষণামূলক কার্যক্রমে সমাজকর্মী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সমাজকর্মীকে সঠিক জ্ঞানে ও প্রশিক্ষণে আধুনিকতার সাথে সমাঞ্জস্যশীল হতে হবে।

Leave a Reply