সামাজিক স্তরবিন্যাসের বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।

অথবা, সামাজিক স্তরবিন্যাসের রূপ ও প্রকৃতিসমূহ আলোচনা কর।
অথবা, সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রকৃতি আলোচনা কর।
অথবা, সামাজিক স্তরবিন্যাসের রূপ বর্ণনা কর।
অথবা, সামাজিক স্তরবিন্যাসের বৈশিষ্ট্যসমূহের বিবরণ দাও।
উত্তর৷ ভূমিকা :
আমাদের সমাজে সব ধরনের সব বয়সের এমনকি সব ধর্মের লোক একত্রে বসবাস করে। কখনো কখনো সমাজে নারী-পুরুষভেদে বৈষম্য দেখা যায়। অনেক সমাজে আবার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য দেখা যায়। তবে একটি বৈষম্য পৃথিবীর সব সমাজেই লক্ষ করা যায়। আর সেটা হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। সমাজে উঁচুনিচু ও
ধনীগরিবের পার্থক্য নির্ণীত হয় অর্থের দ্বারা। অর্থের মাধ্যমে মানুষ সমাজের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করে। সেজন্য আমরা একই সমাজে কেউ রাজা, কেউ প্রজা আবার কেউ শাসক, কেউ শোষিত ইত্যাদি শ্রেণি দেখতে পাই। সমাজে এ ধরনের শ্রেণি বা স্তর আছে এবং সেটা কিছু মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর এ প্রত্যেকটি শ্রেণি গড়ে উঠার পিছনে কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য কাজ করছে।
সামাজিক স্তরবিন্যাসের বৈশিষ্ট্য : অধিকার, কর্তব্য, সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক ক্ষমতা ইত্যাদির তারতম্যের ফলে সামাজিক স্তরবিন্যাসের সৃষ্টি হয়। সমাজস্থ মানুষের উঁচুনিচু স্তর বা মর্যাদার মাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়। তাতে সমাজবিজ্ঞানীগণ সামাজিক স্তরবিন্যাসের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. স্তরবিন্যাস হলো সামাজিক : সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটা সামাজিক। প্রাচীনকাল সামাজিক স্তরবিন্যাস প্রচলিত ছিল তা সমাজের প্রয়োজনকে সমাজকর্মেই সমাজে ধনী ও গরিব আছে আবার আছে মালিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণি ৷ শ্রমিকরা মালিকের কাজ করে তাদের জীবন নির্বাহ করে। আবার মালিক শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশ ভোগ করে। অতএব, এটা চিরাচরিত নিয়ম। যদি এ ধরনের স্তরবিন্যাস না থাকত, তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করত। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, সমাজের প্রয়োজনে স্তরবিন্যাসের সৃষ্টি এবং এটা সামাজিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। থেকে শুরু সৃষ্টি এবং করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সমাজে যে সমাজের মানুষ তার স্বীকৃতি দিয়েছে।
২. সামাজিক স্তরবিন্যাস সর্বজনীন : সামাজিক স্তরবিন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সর্বজনীনতা। মানবসমাজ সৃষ্টির সময় থেকেই স্তরবিন্যাস প্রচলিত ছিল এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত তা বিদ্যমান আছে। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যে দেশের সমাজব্যবস্থায় স্তরবিন্যাস নেই। প্রাচীন সমাজ, আধুনিক সমাজ, কৃষিসমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ এমনকি সমাজতান্ত্রিক সমাজেও স্তরবিন্যাস লক্ষ করা যায়। প্রাচীন সমাজে বয়স, লিঙ্গ, নেতৃত্বের গুণ ইত্যাদির ভিত্তিতে স্তরবিন্যাস প্রচলিত ছিল। আবার মধ্যযুগে রাজা, দার্শনিক, ব্যবসায়ী, ভূ-স্বামী, প্রজাগণ এবং সৈনিক পুরুষ ইত্যাদি স্তরায়িত ছিল। আধুনিক সমাজে শিল্প মালিক ও শিল্প শ্রমিক, পুঁজিপতি ইত্যাদি স্তরবিন্যাস দেখা যায়। সামাজিক স্তরবিন্যাসের সর্বজনীনতা সম্পর্কে কিংস ডেভিস ও উইলবার্ট ম্যুর তাদের “Some Principles of Stratification, American Sociological Review, জার্নালে যথার্থই বলেছেন, “No society is classless or unstratified.” অর্থাৎ, কোনো সমাজই স্তরবিহীন নয়। সুতরাং, আমরা বলতে পারি সামাজিক স্তরবিন্যাস সর্বজনীন।
৩. সামাজিক স্তরবিন্যাস একটি প্রাচীন ব্যবস্থা : আমরা জানি, সুদূরপ্রাচীন সমাজেও স্তরবিন্যাস প্রচলিত ছিল। প্রাচীন সমাজে যখন মানুষ দলবদ্ধভাবে বাস করত, তখন তাদের মধ্যে একজন দলনেতা থাকত। নেতাকে সবাই শ্রদ্ধা করত আবার প্রাচীন সমাজে নারী ও শিশুদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হতো। এভাবে দেখা যায়, প্রাচীন সমাজেও স্তরবিন্যাস প্রচলিত ছিল। বর্তমানকালেও এ ব্যবস্থা টিকে আছে। অতএব বলতে পারি যে, সামাজিক স্তরবিন্যাস একটি প্রাচীন ব্যবস্থা, যা আজও টিকে আছে ।
৪. সামাজিক স্তরবিন্যাস সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে : সামাজিক স্তরবিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর মিথস্ক্রিয়া। সাধারণত সামাজিক স্তরবিন্যাসের ফলে দেখা যায় যে, এক শ্রেণির লোক অন্য শ্রেণির লোকদের সাথে মিশতে পারে না। যেমন- একজন মালিকের মেয়ের সাথে শ্রমিকের ছেলের মেলামেশা সহজ হয় না। কিন্তু মালিকের ছেলেমেয়েরা অবাধে চলাফেরা করতে পারে। এভাবে দেখা যায়, সমগোত্রীয় লোকদের মধ্যে বিবাহ, বৃত্তি নির্বাচন, বন্ধুত্ব ‘ইত্যাদি হয়। আবার অনেক জায়গায় সবাই সমান কোনো ভেদাভেদ নেই। যেমন- খেলার মাঠ।
৫. সামাজিক স্তরবিন্যাসের রূপ ও প্রকৃতি : যদিও বলা হয় কোনো সমাজই স্তরবিহীন নয়, তবে একথাও সত্য যে, সব সমাজেরই স্তরবিন্যাস একই রকম নয়। সমাজ ও দেশভেদে সামাজিক স্তরবিন্যাসের রূপ ও প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন- একটি শিল্পোন্নত ও একটি উন্নয়নশীল দেশের সমাজব্যবস্থায় একই রকম সামাজিক স্তরবিন্যাস কখনই থাকতে পারে না। কারণ দু’দেশের সমাজব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য আছে। সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, দেশ ও স্থানকালভেদে সামাজিক স্তরবিন্যাসের রূপ ও প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
৬. তরবিন্যাসের ফলাফল : সামাজিক স্তরবিন্যাসের একটা ফলাফল আছে। সাধারণত স্তরবিন্যাসের দু’রকম ফলাফল আছে। যথা :
১. জীবনে সুযোগ সুবিধা পাওয়ার মাত্রা,
২. জীবনযাপনের রীতি।
মানুষের জীবনের খাওয়া, পরা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে কে কতটুকু সুযোগ সুবিধা পাবে তা নির্ভর করে স্ত রবিন্যাসের দ্বারা। যেমন- একজন শিল্পপতির ছেলে শিল্পপতির ঘরে জন্ম নেওয়ার কারণে তার জীবনযাত্রা হবে অনেক উন্নত। আবার একজন কৃষকের ছেলে কৃষকের ঘরে জন্ম নেওয়ার কারণে সে উন্নত জীবনযাপন করতে পারে না।
৭. সামাজিক স্তরবিন্যাস ক্রমোচ্চভাবে সজ্জিত : সমাজে মেধা, যোগ্যতা, পেশা এবং সম্পদের ভিত্তিতে উচ্চ শ্রেণি, মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ইত্যাদি শ্রেণি লক্ষ্য করা যায়। এদের জীবনযাত্রায়ও পার্থক্য আছে। সাধারণত যাদের ধনসম্পদ বেশি তারা ধনী আর যাদের ধনসম্পদ কম তারা নিম্ন শ্রেণির। অফিস-আদালতে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি, তৃতীয় শ্রেণি ইত্যাদি স্তর আছে। অতএব, আমরা বলতে পারি সামাজিক স্তরবিন্যাস ক্রমোচ্চভাবে সজ্জিত ।
৮. সামাজিক স্তরবিন্যাসের ধারণা আনুষঙ্গিক : সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, স্তরবিন্যাসের ধারণা কিছু কিছু আনুষঙ্গিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন-
১. সামাজিক স্তরবিন্যাস মানুষের জীবনযাত্রার নানা প্রকার সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করে।
২. সামাজিক স্তরবিন্যাসের দ্বারা মানুষের জীবন প্রণালি নির্ধারিত হয়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, সামাজিক স্তরবিন্যাস প্রাচীনকাল থেকে সমাজব্যবস্থায় প্রবেশ করে আজও টিকে আছে। তবে সমাজের প্রয়োজনে সামাজিক স্তরবিন্যাসের সৃষ্টি হয়েছিল। সব সমাজেই সামাজিক স্তরবিন্যাস বিদ্যমান ছিল, এখনও আছে সমাজের মানুষের স্বীকৃতি পেয়ে। ভবিষ্যতে সমাজে সামাজিক স্তরবিন্যাস বিদ্যমান থাকবে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079
or 01773270077

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*