অথবা, সামাজিক অসমতার প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, সামাজিক বৈষম্যের ফলাফল আলোচনা কর।
অথবা, সামাজিক অসমতা কী প্রভাব ফেলে? আলোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা : মানুষ সমাজে বসবাস করতে পরস্পরের সাথে বিভিন্নভাবে স্বার্থগত সম্পর্কে জড়ায়। এ সম্পর্কে যদি অসম অবস্থান তৈরি হয় তখনই বলা হয় অসমতা তৈরি হয়েছে। তখনই সমাজজীবনে অসমতা দেখা দেয়।
অসমতার প্রভাব বা ফলাফল :
মানুষের জীবন প্রকৃতিতে প্রভাব : সামাজিক অসমতার ফলে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামগ্রিক জীবন প্রকৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। যেমন-
১. মানুষের আয় পেশা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে : মানুষের শিক্ষা, আয়, পেশার ক্ষেত্রে সামাজিক অসমতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখা যায়। কারণ সমাজে যে পরিবার শিক্ষিত তাদের পেশা সমাজে মর্যাদাবান এবং তাদের আয় সমাজে অন্যান্যদের তুলনায় বেশি। খ্যাতি ও যশের ক্ষেত্রে তারা সবার থেকে এগিয়ে।
২. সন্তান উৎপাদন ও লালন-পালনের ক্ষেত্রে : সাধারণত উচ্চ আয় শিক্ষিত পরিবারের সন্তান উৎপাদনের হার কম হয়। অশিক্ষিত ও নিম্ন আয়সম্পন্ন পরিবারে সন্তান উৎপাদন বেশি হয়। ফলে নিম্ন আয়ের সন্তান নিম্ন-মানবীয় সেবার ফলে নিম্নশ্রেণির পর্যায়ভূক্ত হয়। এশিয়ার দেশগুলোতে (মিশর, জর্ডান, সৌদি আরব, কুয়েত) কম আয়ের লোকদের সন্তান উৎপাদন হার বেশি।
৩. ধর্মীয় কাঠামোতে : আর্থসামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কাঠামো ভিন্ন রূপধারণ করে। নিম্নবিত্ত পরিবারে ধর্মীয় অনুশীলন বেশি দেখা যায়। নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণা মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়ে তখনই ধর্মের আশ্রয় নেয়। ঠিক এর কম মনোভাব উচ্চবিত্তের মধ্যে দেখা যায় না ।
জীবনযাত্রার মানে প্রভাব : জীবনযাত্রার মান বলতে কয়েকটি বিষয়কে বুঝানো হয়। যেমন-
১. বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য : সমাজে যাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, শিক্ষা ও ক্ষমতা রয়েছে তারাই অধিক মাত্রায় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাথে জড়িত। শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অংশগ্রহণের হারও বৃদ্ধি পায়।
২. বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ : এক্ষেত্রে দেখা যায় যে, যাদের আয় বেশি, শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি তারাই অধিক হারে বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচিতে অংশ নেয়। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা অংশগ্রহণ করে।
৩. শিল্প সংস্কৃতিতে অংশগ্রহণ : আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যারা উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে তারাই বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপভোগ করে এবং তাদের জীবনধারায় পরিবর্তন আসে।
৪. ভোগব্যবস্থা : ব্যক্তির আয়ের উপর নির্ভর করছে তার ভোগ ব্যবস্থা কেমন হবে। সাধারণত দেখা যায় নিম্ন আয়ভুক্ত ব্যক্তি পরিবার তাদের প্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল দ্রব্য ক্রয় করতে সক্ষম হয় না। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান ও উচ্চ আয়ের পরিবার হতে ভিন্নতর হয়ে থাকে।
৫. টেলিভিশন বিনোদন : শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধির সাথে TV দেখার হার কমেছে। অন্যদিকে, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের চেয়ে নিম্ন আয়ের ব্যক্তিরা অধিক সময় TV দেখে।
৬. ভাষার প্রকৃতি : ভাষা ব্যাকরণ, শব্দ সম্ভার উচ্চারণ ভঙ্গির সাথে সামাজিক অসমতার সম্পর্ক রয়েছে। কেননা বিভিন্ন দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বিভিন্ন রকম। তাই তাদের ভাষাগত বৈচিত্র্যতা দেখা যায়। সাধারণত ধনীদের মুখের ভাষার সাথে দরিদ্রের ভাষায় পার্থক্য রয়েছে। কেননা তাদের মধ্যে দক্ষতা ও অনুশীলনের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। আদর্শ মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে :
১. শিক্ষা সম্পর্কে মনোভাব : সামাজিক অসমতার কারণে মানুষের বিভিন্ন বয়সের প্রতি চিন্তা ভাবনা ও মনোভাব ইত্যাদিতে পার্থক্য হয়। যেমন-যারা আর্থসামাজিক কাঠামোতে উচ্চ স্তরে অবস্থান করে তারা শিক্ষা গ্রহণের প্রতি যে মনোভাব প্রকাশ করে নিম্নস্তরের মানুষ তা করে না। নিম্ন আয়ের চেয়ে উচ্চ আয়ভুক্ত পরিবারে কলেজ শিক্ষার প্রতি তাদের মনোভাব ইতিবাচক।
২. কর্মকাণ্ডের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ : বিখ্যাত তাত্ত্বিক Gerhard Lenski তার ‘The Religious Factor’ বইতে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টেন্টদের মধ্যে Work Ethic এর তীব্র মনোভাব নিয়ে আলোচনা করেন। দেখা যায় ক্যাথলিকরা গতানুগতিক ধর্মে বিশ্বাসী। ফলে কর্মকাণ্ডের নৈতিকতায় তারা নেতিবাচক।
৩. সমাজের প্রতি মনোভাব, মূল্যবোধ এবং প্রথা : আয় ও শিক্ষার স্তরে সমাজের প্রতি মানুষের মনোভাব ও আচরণ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে । অধিকাংশ নিম্নবিত্ত ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ঊষালগ্ন থেকে মানব সমাজে কোনো না কোনোভাবে অসমতা বিরাজ করছে। তবে প্রকৃতি, ধরন ও কঠোরতা, নমনীয়তার মানদণ্ডে অসমতার ক্ষেত্রে পার্থক্য লক্ষণীয়, তাত্ত্বিকভাবে সামাজিক অসমতার বিরুদ্ধে কঠোর নিন্দা জানালেও এটি মানবসমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Leave a Reply