ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

“বাউল দর্শন একটি ভাববিদ্রোহী, সমাজদ্রোহী প্রতিবাদী দর্শন”- ধারণাটি ব্যাখ্যা কর।

অথবা, বাউল দর্শনকে কী সমাজবিদ্রোহী প্রতিবাদী দর্শন বলা যায়?
অথবা, বাউল দর্শনকে ভাববিদ্রোহী, সমাজদ্রোহী প্রতিবাদী দর্শন বলা হয় কেন?
অথবা, বাউল দর্শনকে ভাববিদ্রোহী, সমাজদ্রোহী প্রতিবাদী দর্শন বলার কারণ ও যৌক্তিকতা সংক্ষেপে বর্ণনা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
বাউল ধর্ম ও দর্শন বাংলার অতি নিচু স্তরের নিচু বর্ণের সাধারণ মানুষের জীবনদর্শন। ধর্ম ও সমাজজীবনের নানা স্তরে শোষিত-বঞ্চিত মারখাওয়া মানুষের জগজ্জীবন ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে বাউল মতে। সমাজের সর্বস্তরে বঞ্চিত এসব মানুষেরা দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তির আশায় এক এক সময় নানা ধর্ম দর্শন ও সমাজকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছেন। কিন্তু কোনো ধর্ম, দর্শন, মত, পথ ও সমাজ কাঠামোতে মুক্তির পথ খুঁজে না পেয়ে তাদের মধ্যে সমাজ ও ধর্মের প্রতি দ্রোহের ভাব সৃষ্টি হয়েছে। আর এ দ্রোহ ও বিদ্রোহের ভাব থেকেই প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাউল ধর্ম ও দর্শন।
বাউল দর্শন একটি ভাববিদ্রোহী সমাজবিদ্রোহী প্রতিবাদী দর্শন : বাউলরা বাংলার একটি স্বতন্ত্র লোকজ সম্প্রদায়। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা বাউলদের যেমন কখনো ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি তেমনি বাউলরাও প্রচলিত সমাজকে কখনো ভালোভাবে দেখেননি। এ সমাজে থেকেও তারা কোনোদিন এ সমাজের অংশ হতে পারেনি।তাঁরা সমাজে থেকেও নিজেদের মুক্ত পাখির জাত ভেবেছে সারাটা জীবন। যার দরুন তাঁদের ভিতর সমাজের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহীভাব যা দ্রোহের সৃষ্টি হয়েছে। আর সমাজে প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে দ্রোহ বা প্রতিবাদ থেকেই বাউল মতের উদ্ভব হয়েছে। তারা সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে নিজেদেরকে সমাজের প্রতিপক্ষ ভেবে স্বেচ্ছা সমাজ বর্জন করে প্রচলিত সমাজকাঠামোর বিরুদ্ধে একপ্রকার প্রতিবাদ সৃষ্টি করেছে। আর সেই প্রতিবাদের ফসল হিসেবে সমাজে একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী হিসেবে বাউল মতের আবির্ভাব ঘটে। এ প্রসঙ্গে হেমাঙ্গ বিশ্বাস মন্তব্য করেছেন, বাউল মতবাদের বিকাশ হয় সামন্ত সমাজের শাসক শ্রেণির প্রতি মতবাদ হিসেবেই। বাউলরা প্রচলিত ধর্ম, জাতি বা বর্ণ বৈষম্য,দেবদেবী, পূজা-আচার, নামাজ-রোজা, মন্দির-মসজিদ কণ্টকিত সামন্ত সমাজের ধ্যানধারণাকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করতেন
এবং এ ভাবধারাতেই আপ্লুত তাদের মনের মানুষ এক নতুন মানবতাবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সামন্ত সমাজে নিপীড়িত জনমানসে তাই সেই মানুষটি আসন পাততে চেয়েছিল। আবার আবদুল করিম মিঞা তাঁর টাঙ্গাইল অঞ্চলে ‘বাউল গান স্বরূপ ও দর্শন’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন “সমাজের অবহেলিতজনেরা ধর্মীয় ও সমাজজীবনে নানারকম পীড়নের শিকার হওয়ায় সমাজ ও ধর্মের প্রতি দ্রোহ ভাবের সৃষ্টি হয়। এই দ্রোহ ভাব থেকেই তারা মসজিদে বা মন্দিরে না গিয়ে স্বাধীন মতবাদের (বাউলবাদ) চর্চায় আত্মনিয়োগ করে।”
বাউলরা চিরকালই সমাজবিপ্লবী। বাউলবাদ বিস্তার লাভ করেছিল সমাজের নীচুতলার মানুষদের মধ্যে। সমাজের নীচুতলার মানুষ সমাজধর্ম ও সমাজপতিদের হাতে মার খেতে খেতে কখনো কখনো বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে, গড়ে তুলেছে নিজেদের মতো করে নিজেদের মতবাদ। তাই বাউলদের দর্শন মানবমুখী, ইহজীবনমুখী, তথা এককথায় মানবকেন্দ্রিক।কিন্তু তবু তারা কেন বিবাগী, কেন তারা নিজেদের পাখির জাত বলেন? এর কারণ আচার-বিচারের প্রহরী-ঘেরা বর্ণবিভক্ত হিন্দুসমাজের অঞ্চলায়তনে মুক্তমতি বাউলদের বাসা বাঁধবার কোনো সুযোগ ছিল না। এ মুক্ত ডানা, পাখির জাত ছিল সমাজতন্ত্রী শেকলে বাঁধা মেহনতকারী মানুষের মুক্তি-কামনারই প্রতীক ও প্রতিনিধি, বাউলরা তাদের এই প্রতিবাদের মাধ্যমে নিজেদেরকে তথাকথিত সমাজের বাইরে নিয়ে আলাদা এক পরিবর্তিত সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। যার ফলে শুধু জাতিভেদ প্রথাই ‘নয়, সমাজের শোষক শ্রেণি, সমাজাচার সমাজের ধর্মের নামে অনাচার সবকিছুকেই অবাক করতে পেরেছে অবলীলায়। এই প্রতিবাদের ভাবই বাউলদের শিখিয়েছে একলা পথচলার, নিরব থেকে প্রচলিত সমাজের বিরুদ্ধে ভাব বিদ্রোহ করার। তাইতো লক্ষ করলে দেখা যায় বাউলের জীবনপ্রণালি,ধর্মাচার, সংগীত সবকিছুতেই প্রতিবাদের এক অনিবার্য সুর। ড. আনোয়ারুল করিম এ প্রসঙ্গে তাই যথার্থই মন্তব্য করেছেন, “বাউল সাধনকে এমনি একটি প্রতিবাদী মতাদর্শ বলা যেতে পারে, যা সর্বোতভাবে আধ্যাত্মচেতনাবাদী। নিম্নশ্রেণির মানুষ এ মতাদর্শ গড়ে নিয়েছে একটি প্রতিবাদী আদর্শে। এই মতাদর্শ সমাজের প্রবঞ্চিত মানুষের একদিন প্রতিদিন বেঁচে থাকার প্রেরণাস্থল। এ সাধনার উৎস কোনো
বিশেষ একটি ধর্ম বা সময়ে নিহিত নয়। এর ইতিহাসও তাই একটি বিশেষ সময়ে খোঁজা নিরর্থক।”
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, প্রতিবাদের সুরকে অন্তরে ধারণ করেই বাউলবাদের উদ্ভব। সমাজের জাতি-বর্ণ প্রথার প্রকট সামাজিক বিভাজন ও আর্থসামাজিক শোষণের প্রতিক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিই হচ্ছে বাউলবাদ। অতএব,বাউলবাদ একটি সমাজদ্রোহী ভাববিদ্রোহী দার্শনিক মতবাদ তা বললে কোনো অত্যুক্তি করা হয় না।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!