ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

চলচ্চিত্র কী? বাংলাদেশের বর্তমান মূলধারার চলচ্চিত্রে নারীকে কিভাবে উপস্থাপন করা হয়? দর্শক হিসেবে তোমার মতামত ব্যক্ত কর।

অথবা, চলচ্চিত্র বলতে কী বুঝ? বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নারীকে কিভাবে উপস্থাপন করা হয়?
আলোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
বর্তমান যুগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গণমাধ্যম হল চলচ্চিত্র। তথ্য, সংযোগ, শিক্ষা ও বিনোদনের জন্য সিনেমা বা চলচ্চিত্রের মত পরাক্রমশালী দ্বিতীয় কোন গণমাধ্যম আছে বলে মনে হয় না। চলচ্চিত্রের এ অপরিসীম ক্ষমতা লক্ষ্য করেই ১৯১৭ সালে লেলিন বলেছিলেন, “Of all art cinema is the most important.” চলচ্চিত্র যেমন মানুষের গভীরে চৈতন্যে নাড়া দিতে সক্ষম, তেমনি তার মননশীলতাকে চটুল ও হালকা পর্যায়ে নিয়ে আসতে সবচেয়ে পারঙ্গম।
চলচ্চিত্র : চলচ্চিত্র একটি অসাধারণ শক্তিশালী গণমাধ্যম, যা মানুষকে প্রভাবিত করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এটি মানব শরীরের ৩টি ইন্দ্রিয়গাহ্য অঙ্গে বিরাট প্রভাব ফেলে যার মধ্য দিয়ে মানুষের অনুভূতি সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌছায়। বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন। সত্যজিৎ রায় বলেছেন, “চলচ্চিত্র হল ছবি, চলচ্চিত্র হল শব্দ, এর মধ্যে রয়েছে গতি, রয়েছে নাটক, সঙ্গীত, গল্প, চলচ্চিত্র এরূপ সহস্রাধিক শ্রাব্য ও দৃশ্যের সমাহার। আজকের দিনে এও বলতে হয় চলচ্চিত্র রং এবং মাত্র মিনিট খানেকের স্থায়িত্বে সমস্ত জিনিসগুলোকে তুলে ধরতে পারে একই সঙ্গে।” লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় (প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা) বলেছেন, “ক্যামেরায় ধারণ করা গতিশীল ছোট ছোট স্থির কোন বিষয়,
ঘটনা বা কাহিনীকে দর্শকদের চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে এ রকম বিষয়কে বলা হয় চলচ্চিত্র।”
বাংলাদেশের বর্তমান মূলধারার চলচ্চিত্রে নারীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় : সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মূলধারা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা ব্যাপক আকার লাভ করেছে, আর এ অশ্লীলতার কেন্দ্রে নারীর অবস্থান। নারীকে যৌন উদ্দীপক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, নারীর এ ইমেজ দর্শককে সহজেই প্রভাবিত করছে। বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্রে নারীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় দর্শক হিসেবে আমি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্নে তা আলোচনা করার চেষ্টা করছি :
১. সতী নারী বা নারীর সতীত্ব : এফডিসি’র চলচ্চিত্রে সতীত্ব একটি ধ্রুব ধারণা। সতী নারীই নারী প্রতিমূর্তির আকাঙ্ক্ষিত রূপ । পৌরাণিক, লোক বা রূপকথাভিত্তিক চলচ্চিত্রে, নির্দোষ অথচ ভাগ্যদোষে অসহায় পতিকে রক্ষার্থে অশেষ ত্যাগ ও কষ্টভোগের মধ্য দিয়ে সতী নারীর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
২. নারীর সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেওয়া : দৈহিক সৌন্দর্যই নারীর একমাত্র যোগ্যতা ও মূল্যবান সম্পদ। নারী নিজেও নিজেকে এভাবে মূল্যায়ন করে। নারীর যৌবনকেই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বলে ধরে নেওয়া হয় এবং প্রেমিকার ভূমিকায় নারী তার দৈহিক আকর্ষণকে উপজীব্য করে নিজেকে পুরুষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
৩. গৃহিণী হিসেবে নারী : নারীকে যে ভূমিকাতেই দেখানো হোক না কেন, সব চরিত্রই একটি অদৃশ্য মৌলিক ভিত্তিতে দাঁড় করানো। নারীর স্থান গৃহে, তাদের প্রধান পেশা গৃহিণী এবং এটি একটি সর্বজনীন স্টেরিওটাইপ। বিবাহই নারীর একমাত্র আরাধ্য এবং নারীর সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি নির্ভর করে তার বিবাহ হওয়া বা না হওয়ার উপর। অলক্ষণীয় অনূঢ়া নারী অপয়া বলে নারীর একমাত্র লক্ষ্যই হল কোন পুরুষের স্ত্রীত্ব অর্জন করা।
৪. নারীর মাতৃত্ব বা মা হিসেবে নারী : মাতৃত্ব, সন্তান কামনা ও সন্তান বাৎসল্য নারীকে একদিকে দেয় অপার মহিমা, অন্যদিকে বন্ধ্যা নারী বা পুত্রসন্তান জন্মদানে ব্যর্থ নারী অবহেলা ও নিগ্রহের বস্তু। কোন কোন সময় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে বলে দেওয়া হয় মৃত্যুবরণই তাদের করণীয় পরিণতি।
৫. নির্যাতিত হিসেবে নারী : উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অনুকরণে ঢাকাই ছবিতেও নারীরা প্রহার, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি নানারূপ নির্যাতনের শিকার। বিশেষ করে প্রতিটি চলচ্চিত্রে ধর্ষণ অনিবার্য। আর ধর্ষিতা নারীর অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু। পার্শ্ব নারী চরিত্ররা ধর্ষিত হয় এবং ধর্ষিতাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিম্নবিত্তের নারী এবং কখনও কখনও তাদেরকে শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে দেখানোরও প্রবণতা থাকে। নায়ক যে নারীকে গ্রহণ করবে তাকে হতে হবে কুমারী। ধর্ষণ সিকোয়েন্সে শেষ মুহূর্তে নায়ক এসে তাকে রক্ষা করে।
৬. কুটিল নারী : নারীরাই নারীর শত্রু। বিমাতা, সতীন, শাশুড়ি, জা, ননদ ইত্যাদি সম্পর্কগুলোর উপর এক ধরনের কূট নারীরূপ আরোপ করা হয়, যারা পরস্পরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে ।
৭. ভীতু, দুর্বল, নিষ্ক্রিয় নারী : পুরুষ নারীর রক্ষাকর্তা। সুন্দরী নারী রাস্তাঘাটে ঝোপঝাড়ে, রাতের আঁধারে একদল পুরুষের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু, যেখানে আকস্মিকভাবে পুরুষ এসে অলৌকিক শারীরিক ক্ষমতাবলে তাকে রক্ষা করে। নারীটি ভীত সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে পুরুষটির বীরত্ব অবলোকন করবার পর দুর্বৃত্তরা পর্যুদস্ত হয়ে পলায়ন করলে মুহূর্ত বিলম্ব না করে নিজেকে নায়কের কাছে সমর্পণ করে।
৮. পেশাহীন নারী : নারীদের কোন পেশা নেই। পৌরাণিক, রূপকথা, লোককাহিনীভিত্তিক ছবিগুলোতে তারা রাজকন্যা, বেদেনী, নর্তকী ইত্যাদি পরিচয়ে পরিচিতা। বেদেনী পরিচয়ে অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকলেও তা উহ্য থাকে। নর্তকী পরিচয়ের আড়ালে তারা পতিতার ভূমিকাটিকেই পালন করে।
কৃত্রিম পৌরুষ আরোপ : সাম্প্রতিক সময়ের চলচ্চিত্রে নারীদের ভূমিকায় কৃত্রিম পৌরুষ আরোপের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তারা পুরুষালী পোশাকে সজ্জিত হয়ে মারমুখী চৌকস রূপ আরপ্ত করে। পুলিশ ইন্সপেক্টর থেকে দস্যুরানী, পকেটমার, মাস্তান ইত্যাদি ভূমিকায় প্রতিশোধপ্রবণ নারীরা ব্যক্তিগত শত্রু নিধনে অপরাধমূলক পেশায় সহিংসতা প্রতিকৃতিতে নির্মিত হয়। সাম্প্রতিক কালের চলচ্চিত্রে নারীদের এ স্টেরিওটাইপ বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে মূল নারীরূপ আসলে মাত্র দুই প্রকার। একনিষ্ঠ গৃহবধূ, স্নেহান্ধ মাতা ও সতী নারী এ ভূমিকাগুলোয় নারীরূপ অকুণ্ঠ সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে পূজিত হয়।
উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, চলচ্চিত্র এমনই একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম যে এখানে উপস্থাপিত সবকিছুই দর্শকের কাছে বাস্তব বলে মনে হয় এবং দর্শক খুব সহজেই এটা দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই চলচ্চিত্রে নারীদের যে খণ্ডিত ও বিকৃত রূপে উপস্থাপিত করা হয় তা দর্শকের কাছে বাস্তব বলে মনে হয় এবং তা তাদের মনে স্থায়ী
প্রভাব ফেলে। সে কারণেই বাস্তব নারীর পূর্ণাঙ্গরূপ দর্শকরা চলচ্চিত্রে দেখতে পায় না, যেটি পায় সেটি আংশিক এবং উদ্দেশ্যমূলক। ফলে যে নারী সমাজের গঠনে, উন্নয়নে, সভ্যতার বিকাশে যুগ যুগ ধরে অংশগ্রহণ করে আসছে তার পরিচয় দর্শকের অগোচরে থেকে যাচ্ছে। তাই আমাদের চলচ্চিত্রে পূর্ণাঙ্গ নারীকে উপস্থাপনের জন্য সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে, চলচ্চিত্রের সাথে যারা জড়িত তাদেরকেও উদ্যোগী হতে হবে চলচ্চিত্রের পর্দায় নারীকে মানবীয় সত্তা হিসেবে যথাযথভাবে উপস্থাপন করার জন্য।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!