ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে নারীসমাজের সাহসী ভূমিকা আলোচনা কর।

অথবা, তেভাগা আন্দোলনে নারীসমাজের অবদান আলোচনা কর।
অথবা, তেভাগা আন্দোলনে নারী সমাজের ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
অথবা, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে নারী সমাজের অবদান ব্যাখ্যা কর।
অথবা, তেভাগা আন্দোলনে নারী সমাজের ভূমিকা বর্ণনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে অবিভক্ত বাংলায় কৃষকদের ঐতিহাসিক সাড়াজাগানো তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। জমিদারি প্রথার অধীনে যে বর্গাচাষ বা অধিপ্রথা চালু হয়, তাতে ফসল উৎপাদনের জন্য লাঙল, বীজ, বলদসহ উৎপাদনের সকল খরচ বহন করতে হতো চাষিকেই। তারাই পরিশ্রম করে ফসল ফলাত কিন্তু ফসলের অর্ধেক দিয়ে দিতে হতো জমিদার জোতদারকে। তারা পেত বাকি অর্ধেক। এ অন্যায় প্রথার বিরুদ্ধে তেভাগার দাবিতে আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বরে কৃষকসভার বঙ্গীয় প্রাদেশিক কাউন্সিলের সভায়। তেভাগায় এ আন্দোলন ‘৪৬ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়ে ‘৪৭ সাল জুড়ে চলতে থাকে। দেখতে দেখতে সারা বাংলায় এ তেভাগা আন্দোলন
ছড়িয়ে পড়ে।

ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে নারীসমাজের ভূমিকা : তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এ আন্দোলনে ব্যাপক নারীসমাজের বীরত্বপূর্ণ জঙ্গি অংশগ্রহণ। সমসাময়িক আরো দুটি ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ধান কড়ারি খাজনা প্রথা বাতিলের দাবিতে টংক আন্দোলনে এবং সিলেটে মধ্যযুগীয় বর্বর দাসপ্রথার অনুরূপ নানকার প্রথা উচ্ছেদের আন্দোলনেও নারীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। নিম্নে তেভাগা আন্দোলনের প্রকৃতিতে নারীদের ভূমিকা আলোচনা করা হলো :
১. ঠাকুরগীয় ব্যাপকতা লাভ : যেসব জেলায় জোতদাররা ভাগচাষিদের সাথে প্রায় দাসের মতো ব্যবহার করতো এবং শোষণ ও অত্যাচার ছিল সীমাহীন, সেসব জেলাতেই তেভাগা আন্দোলন সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এর মধ্যে দিনাজপুর জেলায় বিশেষভাবে তৎকালীন ঠাকুরগাঁ মহকুমায় এ আন্দোলন সর্বাধিক ব্যাপকতা লাভ করে। এটাই ছিল তেভাগা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র । দিনাজপুর জেলার আন্দোলনে কৃষক রমণীদের অভূতপূর্ব বীরত্বব্যঞ্জক ভূমিকা লক্ষ্য করা যায় ।
২. দিনাজপুরের খাপুর গ্রামে : তেভাগা আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল দিনাজপুরের খাঁপুর গ্রামে। এখানে একই সময়ে পুলিশের গুলিতে ২২ জন কৃষক শহীদ হন। এদের মধ্যে দু’জন ছিলেন নারীনেত্রী। ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আত্মগোপনে থাকা কৃষক নেতাদের গ্রেপ্তার করার জন্য তিন লরি পুলিশ আসে। কৃষক মেয়েরা শাঁখ ও কাঁসার ঘণ্টা বাজিয়ে সারা গ্রামের কৃষকদের সতর্ক করে দেয়। এ সঙ্কেত পাওয়ার সাথে সাথে কৃষকের নেতাদের গ্রেপ্তারের হাত থেকে রক্ষার জন্য গাছ কেটে গর্ত খুঁড়ে ব্যারিকেড তৈরি করে। পুলিশ ৫ জন নেতাকে গ্রেপ্তার করে ফিরে যাওয়ার সময় ব্যারিকেডের মুখে গাড়িসহ আটকা পড়ে।
৩ নারী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর : কৃষক নেতাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ নেতাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন মুখর হয়ে উঠে। সবার
যশোদা রানী সরকার। যশোদার সাথে এগিয়ে যায় বিশাল নারী বাহিনী। তারা দাবি জানাতে থাকে। তাদের প্রত্যেকের হাতে ঝাঁটা। কিন্তু পুলিশ মুক্তি না দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি চালাতে থাকে। ঘটনাস্থলে ১৪ জন মারা যান। যশোদার দেহের উপর দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে ট্রাক চালিয়ে দেয়া হয়। সামনে এগিয়ে গেলেন দু’সন্তানের মা সমস্বরে নেতাদের ছেড়ে দেয়ার
৪. জলপাইগুড়ি অঞ্চলে : তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার দেবীগঞ্জ, সুন্দরদিঘী, পঞ্চগড় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুন্দরদিঘীর এক রাজবংশী বিধবা বুড়িমা কৃষক মেয়েদের নিয়ে এক ঐতিহাসিক সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তার নাম পুণ্যেশ্বরী দেবী। তিনি জলপাইগুড়ি জেলার কৃষক আন্দোলনের মা তথা ‘বুড়ি নামে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দেবীগঞ্জ যখন পুলিশি নির্যাতন ও জোতদারের সন্ত্রাসে কৃষকদের মনোবল প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল এবং পুরুষরা যখন দোদুল্যচিত্তে দিন অতিবাহিত করছিল ঠিক, তখন বুড়িমাই কৃষক মেয়েদের মিছিল নিয়ে জান দিব তবু ধান দিব না’ এ আওয়াজ তুলে ধান কাটতে শুরু করেন।
৫. পঞ্চগড়ে তেভাগা আন্দোলনের প্রভাব : পঞ্চগড়ের শিখানন্দী, তিলকতারিনী দেবী এরা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে হেঁটে গিয়ে নেতাদের খবর পৌঁছে দিতেন। কর্মীদের ভাত রেঁধে খাওয়ানো, লুকিয়ে রাখা, পালাতে সাহায্য করা, পুলিশি তাওবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করা, ১৪৪ ধারা অমান্য করে লাল ঝাণ্ডা কাঁধে নিয়ে সভা মিছিল করা, কোনকিছুতেই ওরা পিছপা হন নি। পুলিশ যখন কৃষক নেতাদের ধরতে এল তখন শিখানন্দী, তিলকতারিনী দেবী এবং আরো অনেক মেয়ে রুখে দাঁড়ায়। যে কারণে পুলিশ পিছু হঠতে বাধ্য হয়।
৬. নড়াইলে তেভাগা আন্দোলন : যশোর জেলার নড়াইল মহাকুমায় তেভাগা আন্দোলন তথা কৃষক আন্দোলনের একজন দুর্ধর্ষ নেত্রী ছিলেন সরলাদি। তিনি ছিলেন একজন নমশূদ্র কৃষক রমণী। তার সাহস ও শারীরিক শক্তির কাছে পুরুষেরাও হার মানত। নড়াইলে তেভাগা আন্দোলনের মূলকেন্দ্র ছিল বাকড়ী গ্রাম। সরলাদি এ এলাকায় শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ২৫০/৩০০ মেয়েকে নিয়ে একটি ঝাঁটা বাহিনী গঠন করেন। মেয়েদের হাতের ঝাঁটাই ছিল মূল অস্ত্র। সরলাদির ঝাঁটা বাহিনীর ঝাঁটার মুখে দু’ দু’বার পুলিশ বাহিনীকে ক্ষমা চেয়ে সরে পড়তে হয়েছে।
৭. নেত্রকোনার সিংহের বাংলা গ্রামে তেভাগা আন্দোলন : নেত্রকোনার সিংহের বাংলা গ্রামে জমির মালিকরা হিন্দু ও ভাগচাষিদের অধিকাংশ ছিলেন মুসলমান। সেখানেও তেভাগা আন্দোলন দমনের জন্য পুলিশ টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিল ও কৃষক কর্মীদের মারধর করে ভীতির সঞ্চার করেছিল। ভাগচাষিদের মেয়েরা গরিব ও পর্দানশিন। রাজবংশী, নমশূদ্র বা হাজং মেয়েদের মতো তারা ঘর থেকে বের হতে পারতেন না এবং পুরুষ নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ আলোচনা করারও সুযোগ তাদের ছিল না।
৮. সিলেটে তেভাগা আন্দোলন : সিলেটে মধ্যযুগীয় নানকার প্রথা তথা এক ধরনের দাসপ্রথা ছিল তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক সমাজের নিকৃষ্টতম একটি অমানবিক প্রথা। এ প্রথায় নানকার মহিলারা ছিলেন সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত, শোষিত ও লাঞ্ছিত। তাই তাদের মধ্যে জমিদার বিরোধী ঘৃণা ও ক্ষোভ ছিল খুবই প্রবল। এ কারণেই নানকার মেয়েরা নানকার আন্দোলনে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, তেভাগা ও টংক আন্দোলনে হিন্দু, মুসলমান, সাঁওতাল, গারো, হাজং প্রভৃতি নির্যাতিত কৃষক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করে।
৯. কমিউনিস্ট নারী নেত্রীদের অংশগ্রহণ : তেভাগা, টংক ও নানকার আন্দোলনে পুরুষ কমিউনিস্ট নেতাদের পাশাপাশি বহু মধ্যবিত্ত কমিউনিস্ট নারী নেত্রী গ্রামের কৃষক, নারী পুরুষের সাথে একাত্ম হয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নারীসমাজকে অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করেছিলেন। এর মধ্যে প্রথমেই যার নাম উল্লেখ করতে হয় তিনি
হচ্ছেন রাজশাহীর নাচোল এলাকার কৃষকদের কিংবদন্তি তুল্য প্রিয় রানীমা বীর নারী নেত্রী ইলা মিত্র। নাচোলে তেভাগা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তিনি তার স্বামী রমেন মিত্রের সাথে চলে যান নাচোলে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের ঐতিহ্য, অবদান, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা আগামী দিনেও শোষিত মানুষের শোষণ মুক্তি ও মানব মুক্তির পথকে আলোকিত করবে । আলোকিত করবে নারী প্রগতি ও নারীমুক্তির পথকে, পথের নিশানা দেখাবে মুক্তি পিয়াসী নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল কৃষক, জনতা, মেহনতি মানুষকে। শোষণ মুক্তির সংগ্রামে বর্তমান প্রজন্মের অভিযাত্রীদের কাছে আহ্বান জানাই তেভাগা সংগ্রামের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা হতে শিক্ষা গ্রহণ করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে এগিয়ে যান। তবে তেভাগা আন্দোলনের সরলাদি, যশোদা বর্মনী, রেবতী, শঙ্খমনি প্রভৃতি নারী নেত্রীর আদর্শ ও অনুপ্রেরণা নারীসমাজকে আরো প্রতিবাদী ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করবে। নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে যে ঐক্য গড়ে উঠে তা তাদের লক্ষ্যকে সফল করে তুলেছিল।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!