ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ ও অর্জন সম্পর্কে আলোচনা কর।

অথবা, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পূনর্বাসনের উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন বিষয়ে আলোচনা কর।
অথবা, একাত্তরের ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ অর্জন সম্পর্কে বর্ণনা দাও।
অথবা, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পূনর্বাসনের উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন বিষয়ে বর্ণনা দাও।
উত্তর৷ ভূমিকা :
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র এবং তাদের দোসরদের অপতৎপরতার কুফল বাংলার প্রায় ৩০ লক্ষ দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন ছিনিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পাশাপাশি প্রায় তিন লক্ষ নারীদেরকে তাদের দ্বারা ধর্ষিতও হতে হয়েছিল। এদের একটা বড় অংশ পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতনের ফলেই মারা যায়। নির্যাতিত নারী দেশেই থেকে গিয়েছিলেন, যাদের অনেকেই অবাঞ্ছিত পাকবাহিনীর বলাৎকারে গর্ভধারণ করেন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেন। মুক্তিযোদ্ধা একজন পিতা, ভাই, স্বামী গ্রহণ করতে চায়নি তাদের ধর্ষিতা মেয়ে বা বোন বা স্ত্রীকে। এ পরিণতি সমাজদেহে এক বিষফোঁড়ার আকৃতি পেলে বঙ্গবন্ধু তাদেরকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বীরাঙ্গনা খেতাবে ভূষিত করেন, যাতে নির্যাতিত এ শ্রেণিটির প্রতি উন্নত সামাজিক ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম নেয় । ফলে নির্যাতিত নারীসমাজ সমাজে পেল স্বীকৃতি।
একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ ও অর্জন : একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীরা সমাজ ও ধর্মের চোখে হয়ে পড়েন অবৈধ ও অপবিত্র। সমাজ কখনো তাদের পূর্বের মতো গ্রহণ করতে চায় নি। ফলে দেশে থেকে যাওয়া ধর্ষিতাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ নারীদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ ও অর্জন কতটুকু ছিল তা নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. উদ্যোগ :
ক. জাতীয় পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন : স্বাধীনতার পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে কথিত বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের জন্য গঠিত হয় ‘জাতীয় পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ এবং মহিলা পুনর্বাসন সংস্থা। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার পুনর্বাসনের এ পদক্ষেপের সূচনা করে নারী পুনর্বাসন বোর্ডের মাধ্যমে। ১৯৭৪ সালে সরকার এদের সপক্ষে আইন প্রণয়ন করে। ১৯৭৫ সালে ১৭ জানুয়ারি এ বোর্ডই ‘নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ এ রূপান্তরিত হয়। এ ফাউন্ডেশনের কাজের অন্যতম ছিল নির্যাতিতদের ধর্ষণজাত সন্তান সংগ্রহ, লালনপালন এবং বিদেশে দত্তক হিসেবে প্রদান করা। এ সংগঠনের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলির মাধ্যমে যাযাবর শ্রেণি স্থায়ী ঠিকানা পায় ।
খ. দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণ প্রদান : বাংলাদেশের কল্যাণধর্মী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্যাতিত কিছু নারীদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তুলতে নানা কর্মে দুক্ষ করে তোলে। আগ্রহী অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করে অসহায় ও নির্যাতিতদের নিকটজনদের নিকট হস্তান্তর করা, বিবাহ দেয়া প্রভৃতি কর্মসম্পাদন করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতিতদের বিয়ে দেয়ার মতো মানবিক কাজটি কোন ধর্মের লোকদের কাছেই বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কারণ আমাদের সমাজ তো মূলত পুরুষতান্ত্রিক এবং শাস্ত্রতান্ত্রিক। ধর্ষিতা সম্পর্কে তাদের ধর্মীয় কঠোরতা দারুণভাবে অমানবিক হলেও এ কর্মকাণ্ডের পক্ষে সমাজে ধর্ষিতাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ব্যাপক কোন আন্দোলন তখন গড়ে উঠেনি। তাই সমাজ তাদের যথোপযুক্ত সাহায্য সহযোগিতা করতে পারেনি।
গ. নারী পুনর্বাসন বোর্ড : পরিবেশ মন্ত্রী বেগম সাজেদা চৌধুরী ছিলেন নারী পুনর্বাসন বোর্ডের পরিচালকের দায়িত্বে। এ বোর্ডের সাথে আরো যুক্ত ছিলেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম, বিচারপতি সোবহান, বাসন্তী গুহঠাকুরতা, নওশেবা আহমদ, মালেকা খান, বেগম বদরুন্নেসা আহমেদ প্রমুখ। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও এ ধরনের পুনর্বাসন কার্যকলাপ পরিচালিত হয়েছে। নারী নেত্রীরা বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক দেয়া অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে নির্যাতিত, অসহায় ও বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। এ পুনর্বাসন কেন্দ্রের মাধ্যমে তারা বেশকিছু বীরাঙ্গনাকে সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন।
ঘ. সামাজিক স্বীকৃতি : স্বাধীনতার ৩৩ বছর পূর্তিতেও আমরা বীরাঙ্গনাদের সামাজিকভাবে গ্রহণ করে নিতে পারিনি। তবে সুশীল সমাজ ও প্রগতিশীল উন্নয়নে সংগঠনসমূহ মুক্তিযোদ্ধা নারীদের অনুসন্ধান, উপস্থাপন এবং তাদের সামাজিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার যে লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন, তার সুফল বর্তমানে ফলতে শুরু করেছে। বীরাঙ্গনাদের অশিক্ষিত, ও গোঁড়াধর্মীয় বিশ্বাসীরা ভিন্নদৃষ্টিতে দেখলেও শিক্ষিত যুব সমাজ তাদের সম্মানের চোখে দেখতে শুরু করেছে। এমনকি অনেকে গর্ব করে বলে, এ বীরাঙ্গনাদের ত্যাগেই আমরা পেয়েছি নতুন মানচিত্র।
ঙ. আর্থসামাজিক নিরাপত্তা : বাংলাদেশের নারীসমাজ বিভিন্ন কারণে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য আত্মনির্ভরশীল হতে পারেনি। যদি বীরাঙ্গনাদের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিধান এবং পারিবারিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, তাহলে অকপটে পাকবাহিনীর নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশে তারা উৎসাহী হবেন। এ স্বীকারোক্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংঘটিত করার জন্য প্রয়োজনীয়ও বটে। সংবাদপত্রের পাতায় আজ যেসব বীরাঙ্গনার খবর প্রকাশিত হয়, তাতে তাদের চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের চিত্রই ফুটে উঠে। কেউ রোগে ভুগছে, কেউ ভিক্ষা করছে, কেউ যাযাবরের মতো দিনাতিপাত করছে।
২. অর্জন : বিভিন্ন কারণে পুনর্বাসন উদ্যোগ আয়োজনগুলো পূর্ণ সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। নিম্নে এগুলো আলোচনা করা হলো :
ক. পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব : পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং দেশে বিরাজিত ধর্মাচ্ছন্ন রাজনীতির কারণে একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্ত এসব নারীর পূর্ণ সামাজিক মর্যাদা আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, পায়নি সামাজিক স্বীকৃতি। যার ফলে নির্যাতিত নারী বীরাঙ্গনা হিসেবে পূর্বেই চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার কারণে এদের পক্ষে সমাজে মিশে গিয়ে সাধারণ জীবনযাপনও অসম্ভব হয়ে পড়ে। কাজেই তাদের পক্ষে পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত হয়ে জীবনধারণ করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা ছিল না। সর্বোপরি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসিত নারীর সংখ্যা ধর্ষিতা নারীর প্রকৃত সংখ্যার এক শতাংশেরও কম।
খ. সামাজিক রক্ষণশীলতা : একাত্তরের নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের কাজে লিপ্ত থেকে ড. নীলিমা ইব্রাহিম বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁর এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ গ্রন্থটি বেঁচে থাকা মেয়েদের জীবন সংগ্রামের একটি বেদনাদায়ক দলিল। এ গ্রন্থে যাদের কথা বলা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই একাত্তর উত্তরকালে খান সেনাদের চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে আমাদের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থাকেই। ফলে বীরাঙ্গনারা নীরবে বেদনা লালন করে মৃত্যুবরণ করেছেন বা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন । সমাজ তাদের স্বীকৃতি দেয় নি কখনো।
গ. যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা : যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা গোষ্ঠী শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গণআদালত গঠন করা হয়। এ আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজন বীরাঙ্গনা ঢাকায় এসেছিলেন। এ নিয়ে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি হয়। সমাজের লোকজন তাদেরকে নানাভাবে বিদ্রূপ, উপহাস করেছে। এতে তাদের জীবনে নেমে এসেছে এক নতুন বিড়ম্বনা। এ ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, আজও একাত্তরের নির্যাতিত কোন নারীর পক্ষে প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করার মতো প্রগতিপন্থি আমরা এখনো হতে পারিনি।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। যে যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সাথে সকল শ্রেণির বেসামরিক লোকরাও বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেছেন, এর একটি বড় অংশ ছিল আমাদের দেশের দেশপ্রেমিক নারীরা। শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে লেখাপড়া না জানা নিম্নবিত্তের নারীদের অবদানও ছিল। সবাই যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয়েছেন তা নয়, প্রত্যেকের অংশগ্রহণ প্রক্রিয়াই তার নিজস্ব পারিবারিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল ছিল। নূরজাহান মুরশিদ বা সুফিয়া কামাল মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব হতেই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ভূমিকায় লিপ্ত ছিলেন, কিন্তু তারামন বিবি তা নন। তারা যুদ্ধ চলাকালে পারিপার্শ্বিক, সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা এবং মুক্তিযোদ্ধা বা এর সংগঠকদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এ মহান দায়িত্বে নিয়োজিত হন এবং সাহসী ভূমিকা রাখেন।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!