Answer

ইউনিয়ন পরিষদে নারীর ক্ষমতায়নের সমস্যা দূর করার উপায়সমূহ আলোচনা কর।

অথবা, ইউনিয়ন পরিষদে নারীর ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধকতাসমূহ কী কী? কিভাবে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা যায়?
অথবা, ইউনিয়ন পরিষদে নারীর ক্ষমতায়নের সমস্যা দূর করার উপায়সমূহ তুলে ধর।
অথবা, ইউনিয়ন পরিষদে নারীর ক্ষমতায়নে বাধাসমূহ দূর করার উপায়সমূহ তুলে ধর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যে দেশ শুধু অনুন্নতই নয় নারীরা যেখানে শত বাধানিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ, সেখানে তাদের ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ইউ. পি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, জনসভা করা এবং হাতে পোস্টার, প্লাকার্ড হাতে নিয়ে মিছিল করা সত্যিই অবাক করা একটি কাণ্ড। কিন্তু এ অবাক করা কাণ্ডটিই এখন বাস্তবে রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশে নারী এবং পুরুষের অবস্থানটি অসম। সমাজে নারীদের অবস্থান পুরুষের তুলনায় নিম্নস্তরে রয়েছে। এ ধরনের একটি সামাজিক কাঠামোয় ইউনিয়ন পরিষদের এ নির্বাচন নারীদের কাছে অনেক বড় একটি প্রত্যাশার বাস্তবায়ন। কিন্তু এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নারীকে হতে হয় নানা সমস্যার সম্মুখীন।
ইউনিয়ন পরিষদে নারীর ক্ষমতায়নে সমস্যাবলি : স্থানীয় পর্যায়ে মহিলা সদস্যদের বহু সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ত হতে হয়। এভাবে নানা প্রতিকূল পরিবেশ হতে
অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে ইউনিয়ন পরিষদে মহিলা সদস্য হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেও তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের সুযোগ পায় না। ফলে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেকে পরবর্তী নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। নারী সদস্যদের ক্ষমতায়নের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবাধকতাসমূহ নিম্নে আলোচনা করা :
১. সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব : ইউনিয়ন পরিষদে নারী সদস্যদের দায়দায়িত্ব, ক্ষমতা ও অধিকার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা সরকার কর্তৃক এখনো পর্যন্ত প্রণয়ন করা হয়নি। যার ফলে চেয়ারম্যান কিংবা পুরুষ সদস্যদের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করতে তারা বাধ্য হয়।
২. বৃহৎ এলাকা : সংরক্ষিত নারী আসনের কর্ম এলাকা সাধারণ আসনের চেয়ে তিনগুণ বড়। কিন্তু সে তুলনায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ সুবিধা ও ক্ষমতা নারী সদস্যদেরকে দেয়া হয় না। ফলে তারা তাদের দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালনে ব্যর্থ হয়।
৩. পুরুষ সদস্যদের সহযোগী মনোভাবের অভাব : ইউনিয়ন পরিষদের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, সেখানে সবক্ষেত্রেই চেয়ারম্যানের প্রাধান্য বজায় থাকে। এক্ষেত্রে চেয়ারম্যান যদি তার পুরুষ সদস্যদের নিয়ে মহিলা সদস্যদের কাজে সহায়তা করে তাহলে ইউ. পি নারী যথার্থ ক্ষমতায়নের সুযোগ পাবে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চেয়ারম্যানসহ পুরুষ সদস্যদের অসহযোগিতা পরিলক্ষিত হয়।
৪. বেতন ভাতার স্বল্পতা : সংরক্ষিত আসন সাধারণ আসনের চেয়ে তিনগুণ বড় হওয়া সত্ত্বেও সরকারি ভাতার ভাতাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পাশাপাশি নানা অনিয়মের সম্মুখীন হতে হয় নারী সদস্যদের। এটা স্বল্পতা, তাদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা ।
৫. নিরাপত্তাহীনতা : আমাদের দেশে যেখানে সকল নাগরিকই প্রায় সর্বক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই নারীদের ক্ষেত্রে তার মাত্রাটা আরো বেশি। চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে রাত্রিকালীন বিচার সালিশে নারী সদস্যদের পক্ষে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
৬. মাসিক সভায় মহিলা সদস্যদের অংশগ্রহণে বাধা : ইউনিয়ন পরিষদের মাসিক সভা ঠিকমতো না হওয়া এবং মাসিক সভায় নারী সদস্যদের কাছে ঠিকমতো চিঠিপত্র বিলি না করার কারণে নারী সদস্যরা সভায় উপস্থিত হতে পারে না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হয়।
৭. নারী সদস্যদের অজ্ঞতা : অনেক সময় স্বল্প শিক্ষিত হবার কারণে বিভিন্ন সার্কুলার ও বিধি, আইনকানুন ও অধিকার সম্পর্কে নারীরা অজ্ঞ থাকে। যা তাদের ক্ষমতায়নের পথে একটি বিশেষ বাধা।
৮. জোরপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণ : বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিকে বৈধতা দানের জন্য নারী সদস্যদের কাছ থেকে অসৎ পুরুষ সদস্যরা নানা চাপ দিয়ে স্বাক্ষর আদায় করে নেয়।
৯. উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দের স্বল্পতা : মহিলাদের বড় নির্বাচনি এলাকা হলেও সেখানে উন্নয়ন বাজেট কম বরাদ্দ করা হয়। যার ফলে নির্বাচনি এলাকার সুষ্ঠু উন্নয়ন কার্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
১০. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা : তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নে দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে প্রতিবন্ধক বলে অনেকেই মনে করেন । আমাদের দেশের আমলারা সবচেয়ে সুবিধাভোগী এবং নেপথ্যে থেকে কলকব্জা নাড়েন । উপর্যুক্ত সমস্যাগুলো ছাড়াও অন্য যেসব সমস্যা আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে সেগুলো হলো :
১. তথ্য ও সংবাদ সরবরাহের অভাব।
২. ইউনিয়ন পরিষদে কর্মসহায়ক পরিবেশের অভাব।
৩. মহিলা সদস্যদের প্রশিক্ষণের অভাব।
৪. রাজনৈতিক দলের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
ইউনিয়ন পরিষদে নারীর ক্ষমতায়নের সমস্যা দূর করার উপায়সমূহ : তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় শাসনে নারী নেতৃত্বে কিছু সমস্যা ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। উক্ত সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত ব্যবস্থাসমূহ গ্রহণ করা আশু প্রয়োজন। তা না হলে ইউনিয়ন পরিষদে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি নিয়ে যে বিশাল আশা তা নিরাশায়
পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না। সুপারিশগুলো নিম্নরূপ :
১. নারী সদস্যদের দায়িত্ব ও এখতিয়ার সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে সরকারকে।
২. ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে নারী সদস্যদের বসার জন্য নির্দিষ্ট আসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. ভিজিডি, ভিজিএফ প্রভৃতি কার্ড বিতরণে নারী সদস্যদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৪. ইউ. পির কাজগুলো সঠিকভাবে হচ্ছে কি না এবং সেসব কাজের দায়িত্ব নারী সদস্যদের দেয়া হয়েছে সেগুলো তারা করার সুযোগ পাচ্ছে কি না তার জন্য মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. দু’জন নারী সদস্যের উপস্থিতি ছাড়া যেন ইউ. পি মিটিংয়ের ফোরাম গঠিত হতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৬. ‘নারীনির্যাতন প্রতিরোধ বিষয়ক কাজগুলোতে নারী সদস্যদের সুযোগ দিতে হবে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ইউনিয়ন পরিষদে নারীর ক্ষমতায়ন নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগই উদাসীনতা, অমনোযোগিতা বা রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সফলতার মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়নের যে দাবি এবং তা বাস্তবায়ন করার যে উদ্যোগ তা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে, যদি স্থানীয় প্রশাসনে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। তাই এক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাবলির সুষ্ঠু সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি
এ বিষয়টিকে শুধুমাত্র নারীর বিষয় নয়, বরং সমাজের সকল সদস্যের উপর অর্পিত নৈতিক দায়িত্ব ভেবে ইউ.পি পরিষদে নারী যাতে তার যথাযথ ক্ষমতায়নে সফল হতে পারে, সেজন্য সরকারের পাশাপাশি জনগণের আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই ইউনিয়ন পরিষদে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!