বাংলাদেশে এত অধিক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার কারণ কী? উপযুক্ত উদাহরণসহ বিশ্লেষণ কর।

অথবা, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক দল থাকার কারণ কী? উপযুক্ত উদাহরণসহ
ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাংলাদেশে অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার কারণ কী? উদাহরণসহ আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশে অধিক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার কারণসমূহ উদাহরণসহ আলোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
“রাজনৈতিক দল অবশ্যম্ভাবী এবং সকল স্বাধীন, বৃহৎ রাষ্ট্রেই এর অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।” Lord Bryce এর এ বক্তব্য থেকে রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে উপলব্ধি করা যায়।
তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই এর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অধিকমাত্রায় অনুভূত হয়। বাংলাদেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা এবং ক্রমেই এখানে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বর্তমান বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা প্রায় ৮০টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এ অধিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলা যায়। এখানে আমাদের আলোচ্যবিষয় হলো এত অধিক রাজনৈতিক থাকার পিছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ বিশ্লেষণ করা।
বাংলাদেশে অধিক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার কারণসমূহ : বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই একাধিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বিদ্যমান। এত অধিক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার পিছনে উপযুক্ত কারণসমূহ নিম্নে
বিশ্লেষণ করা হলো :
১. বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা (Socio-economic condition of Bangladesh) : বাংলাদেশে যেহেতু পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা বিরাজমান, কাজেই এখানে ধনী ও দারিদ্র্যের মধ্যকার ব্যবধান রয়েছে অনেক। আর এ ব্যবধান ক্রমেই বেড়ে চলছে। দেশের সমুদয় সম্পদ মাত্র গুটিকয়েক ব্যক্তি পরিবারের হাতে কুক্ষিগত। এরাই হচ্ছেন।
দেশের রাজনীতির চালিকাশক্তি (Moving force) যাদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই তারা রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির দ্বারস্থ হন। এ ক্ষমতা লাভের সহজ উপায় হিসেবে তারা দেশের রাজনৈতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে অগ্রসর হয়। আর এ উদ্দেশ্যে তারা রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক দলের এ সমস্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
২. আদর্শগত বিরোধ (Ideological conflict) : প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই একটা আদর্শ থাকে । এ আদর্শের উপর ভিত্তি করেই নেতৃবৃন্দ দলীয় কর্মসূচি রচনা করেন ও তা বাস্তবায়নে অগ্রসর হন। কিন্তু দেখা যায় যে, দলের মধ্যে আদর্শগত বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আবির্ভাব ঘটে নতুন নতুন দলের। মূলত এ ধরনের আদর্শগত দ্বন্দ্ব ও বিরোধের জন্যই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আজ শতধা বিভক্ত।
৩. রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের চরিত্র (Character of political leaders) : রাজনৈতিক দলের সুষ্ঠু ভিত্তি ও কার্যকারিতা এর নেতৃবৃন্দের গুণাবলি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও দৃঢ়তার উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। কাজেই নেতৃবৃন্দকে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত হতে হয়। কিন্তু আমাদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে এসব গুণের দারুণ অভাব পরিলক্ষিত হয়। তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশি ভাবধারা ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বদেশের স্বার্থ ভুলে গিয়ে কেবল নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হন । ফলে দেখা যায় একাধিক রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয় ।
৪. দলীয় মতানৈক্য কোন্দল (Internal party spilts and factions) : বাংলাদেশের এত অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দল থাকার অপর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এসব কোন্দলের কতিপয় উপাদান আছে। যেমন- রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ক্ষমতার লোভ, রাষ্ট্রীয় মৌলনীতির ক্ষেত্রে ঐকমত্যের অভাব প্রভৃতি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রাজনীতির উপর। এ কারণে বর্তমানের রাতারাতি দল ভাঙছে আর গড়ছে । ফলে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে।
৫. সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ (Army intervention) : এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও এর কোনো ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত দু’ দু’বার সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে। ফলে সামরিক বাহিনী ও সামরিক আমলাতন্ত্রই রাজনীতির নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। সামরিক শক্তির প্রভাবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ভেঙে বিভিন্ন উপদলে পরিণত হচ্ছে। যেমন- জাপা এর মঞ্জু ও এরশাদ গ্রুপ।
৬. সহনশীলতার অভাব (Lack of toierence) : বাংলাদেশে দলীয় নেতাদের মধ্যে সহনশীলতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। সহনশীলতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। প্রত্যেক দলীয় নেতা তার নিজস্ব মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন । এর ব্যতিক্রম ঘটলে দেখা দেয় দলত্যাগের পাঁয়তারা। ক্রমে গড়ে ওঠে নতুন নতুন দল। কাজেই রাজনীতিবিদদের মনে দলত্যাগের প্রবণতা থেকেই যায় এবং ফলে বহুদলের উদ্ভব ঘটে।
৭. ব্যাপক দারিদ্র্য ও গণসচেতনতার অভাব (Mass poverty and lack of public consciousness) : বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ গরিব। এর ফলে প্রায়ই রাজনৈতিক অসন্তোষ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলও দারিদ্র্যকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল গঠন করে তাদের স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট হয়। জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাবেই কেবল এটা সম্ভব হচ্ছে। অধিকাংশ জনগণই অশিক্ষিত বিধায় এ সুযোগে স্বার্থান্বেষী মহল নতুন দল গঠন করে সহজেই তাদের পক্ষে গণসমর্থন আদায় করে দেয়।
৮. বিদেশি শক্তির প্রভাব (Influence of foreign powers) : আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের এ প্রভাব পরোক্ষভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে ঘটান হয়ে থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে বিদেশি শক্তি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের উপর বিভিন্নভাবে প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিস্তার করে। এর স্বাভাবিক পরিণতি হচ্ছে দলত্যাগ ও নতুন দল গঠনের পালা।
৯. বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা (Mult party political system) : বাংলাদেশ দল ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বহুদলীয় ব্যবস্থা। এখানে একটা বা দু’টি নয় বহুদল বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে, এ বহুদলীয় ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলবিধির অধীনেও বেশকিছু দলের সৃষ্টি হয়। অতঃপর দলবিধি বাতিল করে দিলে সে সুযোগে অসংখ্য দলের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারির পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দেশে প্রায় অর্ধশত রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়।
১০. অসংগঠিত দল ব্যবস্থা (Unorganized party system) : বাংলাদেশের দল ব্যবস্থা মূলত অসংগঠিত। অধিকাংশ দলই রাষ্ট্রের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারেনি। কয়েকটি দল যেমন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি দলগুলো অসংগঠিত বলেই বিভিন্ন উপদল সৃষ্টি হয় ।
১১. দলত্যাগ (Party Defection) : দলত্যাগ করা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা লাভের আশায় ও ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদ লাভের আশায় ও ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে ঘন ঘন দল পরিবর্তন ও রং বদলান অনেকটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেখা যায় একাধিক দলের সৃষ্টি হয়।
উপসংহার : বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক একাধিক দলের অস্তিত্ব চিরন্তন সত্য। এটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কেননা, পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই উপমহাদেশে একাধিক রাজনৈতিক দল প্রবেশ করে, যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে প্রায় শতকের বেশি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বিদ্যমান। মূলত এদেশে গড়ে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অবস্থা তথা বর্তমানে আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম সঠিক আদর্শের অভাব প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশে অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দলের আগমন ঘটে। অর্থাৎ, একাধিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটা স্বাভাবিক ঘটনা সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079
or 01773270077

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*