অথবা, বর্তমানে বাংলাদেশের বিরোধী দলের ভূমিকা মূল্যায়ন কর।
অথবা, বর্তমানে বাংলাদেশের বিরোধী দলের ভূমিকা কি যথার্থ? মূল্যায়ন কর।
অথবা, বর্তমানে বাংলাদেশের বিরোধী দলের ভূমিকা যথাযথ কী না? মতামত দাও।
উত্তর ভূমিকা : ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট গৃহীত সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা শুরু হয়। যেকোনো সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে বিরোধী দল হলো রাষ্ট্রের ‘Sadow Government’ অর্থাৎ, ছায়া সরকার। সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত হতে বিরোধী দল দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। যেকোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু ও কার্যকরী বিরোধী দল । কেননা বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমেই সংসদীয় সরকারের সফলতা নির্ভর করে।
বর্তমান বিরোধী দলের ভূমিকার মূল্যায়ন : ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধীনতা লাভের পর ২০০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিরোধী দলের গঠনমূলক কার্যক্রমের অভাবে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র বার বার ভূলণ্ঠিত হয়েছে। উপর্যুক্ত ভূমিকার অধিকাংশই বর্তমান বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দলের মধ্যে অনুপস্থিত। মূলত বলা যায়, বাংলাদেশের
রাজনীতিতে বিরোধী দলের ইতিবাচক ভূমিকার চেয়ে নেতিবাচক ভূমিকাই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে কারণে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে অভিজাত মহলে তথা এলিটপন্থি মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। নিম্নে বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতিবাচক ভূমিকার উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ তুলে ধরা হলো :
১. বিরোধিতার ক্ষেত্রে বিরোধিতা : বাংলাদেশ যে দলই বিরোধী দলের অবস্থানে থাকুক না কেন সে দলই সরকারের বিরোধীতার ক্ষেত্রে বিরোধিতা করে। যেটা বর্তমানে আ’লীগ ও বর্তমান সরকার প্রধানের প্রধান শরিক দল B.N.P এর মধ্যে দেখা যায়।
২. গঠনমূলক সমালোচনার অভাব; কোনো বিরোধী দলই সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে না। যার কারণে কোনো সরকারই সঠিক পথে তার কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হয়।
৩. সংসদীয় কার্যক্রমে অনুপস্থিত : বর্তমানে বাংলাদেশের বিরোধী দল মনে করে বর্তমান সংসদে তাদের ন্যায্য অধিকার ও দাবি রক্ষা করা হয় না যে কারণে তারা সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে।
৪. হরতালের রাজনীতি : বর্তমানে বাংলাদেশের বিরোধী দলসমূহ হরতালের রাজনীতিতে বিশ্বাসী।
৫. রাজপথের রাজনীতি : বাংলাদেশের বিরোধী দলসমূহের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে তারা সংসদীয় রাজনীতির চেয়ে রাজপথের রাজনীতিতে বেশি আগ্রহী।
৬. সুষ্ঠু নেতৃত্বের অভাব : বিরোধী দলগুলোর সুষ্ঠু নেতৃত্বের অভাবে তাদের আন্দোলনের ইস্যুগুলো সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ব্যর্থ হয়।
৭. সাংগঠনিক কাঠামোর অভাব : বর্তমানে বাংলাদেশে বিরোধী দলের মধ্যে সাংগঠনিক দক্ষতা ও সুষ্ঠু সাংগঠনিক কাঠামোর অভাবে তাদের কর্মসূচিসমূহ সফল হতে পারে না।
৮. দলীয় কোন্দল : বর্তমানে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সর্বদা দলীয় কোন্দল বিরাজমান যে কারণে একটা বড় দল ভেঙ্গে অনেক উপদল সৃষ্টি হয়। যেমন B.N.P খালেদা জিয়া ও বি. চৌধুরীর দুটি গ্রুপ। বর্তমানে বি. চৌধুরী গ্রুপ আওয়ামী লীগ এর সাথে যোগ দিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে রত ।
৯. সন্ত্রাসের রাজনীতি : বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলই সন্ত্রাসমুক্ত নয়। কি সরকারি দল, কি বিরোধী দল। সরকারি দলের সন্ত্রাসের দাপট ঠেকাতে বিরোধী দলসমূহ বিভিন্ন ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলে। মূলত তাদের হাতেই রাজনৈতিক নেতারা জিম্মি হয়ে থাকে।
১০. আমলাতান্ত্রিকতা : বর্তমানে বিরোধী দলসমূহের মধ্যে আমলাতন্ত্রের প্রবণতা যথেষ্ট পরিমাণে লক্ষণীয়। যে | কারণে বিরোধী দলসমূহ জনগণের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়।
১১. রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব : যে দলই বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকুক না কেন তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দেখা যায়। বর্তমানে চারদলীয় ঐক্যজোটের সরকারের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া বহুবার সংলাপ আলোচনার প্রস্তাব দিলেও বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ। কারণ সুষ্ঠু ও শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্র সফলকাম হতে পারে না। এ কারণে গণতন্ত্রে বিরোধী দলের অস্তিত্ব একান্তই অপরিহার্য। অধ্যাপক ব্রাইস যথার্থই বলেছেন, “গণতন্ত্রে রাজনৈতিক
দলের তথা বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।” সেজন্য ব্রিটেনে বিরোধী দলকে “His or Her Majesty’s Opposition” বলে আখ্যায়িত করা হয়।

Leave a Reply