অথবা, সূফিবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে যে সকল মতবাদ রয়েছে তা সম্পর্কে বিচারমূলক আলোচনা কর।
অথবা, সুফিবাদের উদ্ভব সম্পর্কিত মতবাদ সম্পর্কে তুমি যা জান তা আলোচনা কর।
অথবা, সুফিবাদের উৎপত্তি সম্পর্কিত মতবাদ ব্যাখ্যা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা : ইসলামের ইতিহাসে যারা অতিপ্রাকৃত উপায়ে পরমসত্তা বা আল্লাহর সাথে একাত্মতা অর্জনে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, তারা সুফি নামে পরিচিত। সুফিবাদ ইসলামের মতোই প্রাচীন এবং ইসলামের অবিভাজ্য অংশ। সুফিবাদ হলো প্রেমের দর্শন, অন্যকথায় আল্লাময় হয়ে যাওয়ার দর্শন। এ মতানুসারে আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ। সুফিবাদ তাই তাত্ত্বিক দিকের চেয়ে ব্যবহারিক দিকের উপর বেশি গুরুত্ব দেয়। সুফিবাদকে বর্ণনার চেয়ে অনুভবেই বুঝা সম্ভব।
সুফিবাদের উৎপত্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন মতবাদ ; পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণ সুফিবাদের উৎস পর্যালোচনা করতে গিয়ে এ সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তাদের কারো কারো মতে সুফিবাদের উৎপত্তি খ্রিস্টান ধর্ম হতে, কারো কারো মতে নব্য প্লেটোবাদ হতে। যেমন- ডেন ক্রেমার এবং ডোেজর ধারণা করেন যে, ভারতীয় বেদান্ত দর্শন হতে সুফিবাদের উৎপত্তি। মার্কস এবং নিকোলসনের মতে নব্য প্লেটোবাদের এবং ক্রিশ্চিয়ানিটি বা খ্রিস্টধর্ম হতে সুফিবাদের উদ্ভব ঘটেছে। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচিত হলো :
ক্রিশ্চিয়ানিটি বা খ্রিস্টধর্ম : ডন ক্রেমার মনে করেন যে, ইসলামি মরমিবাদের খ্রিস্টান প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। এটা ঠিক যে, খ্রিস্টান ধর্মের সাথে ইসলামের অনেকটা মিল রয়েছে, তারা আরো বলেছেন, খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকদের সংস্পর্শে যখন মুসলমানরা আসে, তখন সুফিবাদের উদ্ভব ঘটে। তারা সরল জীবনের প্রতীক হিসেবে পশমি বস্ত্র পরিধান করতেন। কিন্তু একটু বিচারমূলক দৃষ্টিকোণ হতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, প্রার্থনা ও পরিচ্ছদের সাদৃশ্য দেখে আমরা বলতে পারি না যে, সুফিবাদ খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাবে উৎপত্তি ও বিকাশলাভ করেছে।
নব্য প্লেটোবাদ : সুফিবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেকে নব্য প্লেটোবাদের প্রভাবের কথা বলেছেন। তাঁদের মতে, সুফি অনুধ্যানমূলক জ্ঞানের ক্ষেত্রে হেলেনীয় প্রভাব রয়েছে। সুফিবাদে কিছু কিছু হেলেনীয় ভাবধারা থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে এটা বলা সংগত হবে না যে, সুফিবাদের সকল অনুধ্যানমূলক আলোচনা হেলেনীয় দর্শন থেকে এসেছে। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়েও এ মত গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা ঐতিহাসিক দিক থেকে দেখা যায় যে, সুফিগণ নব্য প্লেটোবাদীদের সংস্পর্শে এসেছেন। এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাছাড়া নব্য প্লেটোবাদের বিকাশের বহু পূর্বে ইসলামে মরমিবাদের সূচনা হয়েছে।
পারসিক প্রভাব : পারসিক প্রভাবে সুফিবাদের উৎপত্তি এ সংক্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী চিন্তাবিদগণ মনে করেন যে, মুসলমানদের পারস্য বিজয় ছিল একটি উৎকৃষ্ট জাতির উপর অপর একটি নিকৃষ্ট জাতির আধিপত্য স্থাপন। পারসিকরা আরব মুসলমানদের চেয়ে একটি উন্নত জাতি বলে মনে করতো। ফলে তাদের মধ্যে নৈরাশ্যবাদ এবং কৃষ্ণবাদ দেখা দেয়। মুসলমানগণ এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন বলে তারা মনে করেন। তা ছাড়া আমরা কিছু পারসিক সুফির সন্ধান পাই।
কিন্তু বহুসংখ্যক সুফি পারস্যে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে সুফিবাদের উৎপত্তি পারস্য হতে উৎপত্তি হয়েছে তা বলা যায় না।
বৌদ্ধ প্রভাব : ১১ শতাব্দীতে মুসলমানদের ভারতের উপর রাজনৈতিক বিজয় লাভ করে। গলডিজিয়র বলেছেন, মুসলমানগণ জপমালা এবং ধর্ম গ্রহণ পদ্ধতি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন। তাছাড়া মরমি তরিকায় মোকাম পদ্ধতি নির্বাণ আকারে ফানা মতবাদটিও বৌদ্ধিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এ মতবাদ সম্পর্কে বলা হয় যে, ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতিতে মুসলমান অংশ নেয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত ভারতীয় ধর্ম মুসলিম দেশসমূহ প্রকৃত প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে দেখা যায় না।
বেদান্ত প্রভাব : M. Horten (এম. হর্টেন) মনে করেন যে, সুফিবাদের উৎপত্তি বেদান্ত দর্শনের প্রভাবে হয়েছে। তিনি মনে করেন যে, বেদান্ত দর্শনের মায়াবাদের সাথে সুফিবাদের অনেকাংশে মিল রয়েছে। তাছাড়া ভারতীয় সন্ন্যাসী ও ঋষিদের নিরাসক্ত জীবন, কঠোর সংযম ও কৃচ্ছতাবাদী ভাবধারা মুসলিম সুফিদের জীবনে একটি গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। কিন্তু এটি যথার্থ নয় যে, জগৎ সম্পর্কে সুফি ও বেদান্ত মত যথেষ্ট সাদৃশ্যপূর্ণ। কেননা মায়াবাদ অনুসারে জগৎ অলীক কিন্তু সুফিবাদ জগৎকে বাস্তব হিসেবে মেনে নেয়।
মন্তব্য: সুফিবাদের নিরপেক্ষ পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখা যায় যে, সুফিবাদের ইতিহাস ইসলামের মতোই পুরাতন। ইসলামের আবির্ভাবের পর হতেই সুফিবাদের উৎপত্তি লাভ ঘটেছে। সুফি শিক্ষাসমূহ সুফিগণ কুরআন ও হাদিস হতে গ্রহণ করেছেন। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশাবলি বিশেষভাবে পালন করে তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহময় হয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালান।
উপসংহার : পরিশেষে সুফিবাদের বীজ ইসলামের প্রারম্ভেই সূচিত হয়েছিল। হুজুরে পাক (স) প্রয়াশই ধ্যানমগ্ন থাকতেন। সাহাবাগণ একনিষ্ঠভাবে তাকে অনুসরণ করে গেছেন। তাদের মধ্যে একদল ঘনিষ্ঠ সাহাবা বিশ্বাস গ্রহণের মুহূর্ত হতে ছিলেন মরমি ভাবাপন্ন। পার্থিব বিষয়ে তারা উদাসীন এবং কাদচিৎ তারা জাগতিক বিষয়ে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতেন। তাঁরাই আহলে উস সুফফা হিসেবে পরিচিত।

Leave a Reply