অথবা, সমষ্টি সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণার্থীর ভূমিকাসমূহ আলোচনা কর।
অথবা, সমষ্টি সংগঠনের কার্যক্রমে মাঠকর্ম প্রশিক্ষণার্থীর ভূমিকা ব্যাখ্যা কর।
অথবা, সমষ্টি সংগঠনের কার্যক্রমে মাঠকর্ম প্রশিক্ষণার্থীর ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা : সমাজকর্মের একটি মৌলিক প্রত্যয় হলো সমষ্টি সংগঠন। যা সমষ্টির বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখে।ব্যবহারিক প্রশিক্ষণার্থীরা সমষ্টিতে কাজ করতে যেয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পন্ন করে থাকে। সমষ্টি সংগঠনে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মীকে সমষ্টির জনগণের সাথে পরিচিত হয়ে তাদের কল্যাণের জন্য বহুবিধ কাজ করার মানসিকতা নিয়ে তাদের কাছে যেতে হয়। ব্যবহারিক প্রশিক্ষণকর্মী তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনে বিভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োগ করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
সমষ্টি সংগঠন কার্যক্রমে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণার্থীর ভূমিকা : ব্যবহারিক প্রশিক্ষণার্থী সমষ্টিতে কাজ করতে গিয়ে দু’জায়গায় কাজ করে । যথা :
ক. শহর সমষ্টি;
খ. গ্রামীণ সমষ্টি ।
ক. শহর সমষ্টিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণার্থীর ভূমিকা : শহর সমষ্টিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণার্থী যে সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে সেগুলো হলো :
১. সমষ্টির সাথে পরিচিত হওয়া : মাঠকর্মীর অন্যতম কাজ হলো শহর সমষ্টির জনগণের সাথে পরিচিত হওয়া তথা তাদের জন্য কাজ করা।শহর সমষ্টির ক্ষেত্রে সমাজ নিজে সমষ্টিতে গিয়ে তাদের সমস্যা প্রয়োজন, সম্পদ, সমষ্টির জনসংখ্যা, তাদের প্রকৃতি এবং আশা আকাঙ্ক্ষা, নেতৃত্বের ধরন প্রভৃতির সাথে পরিচিত হওয়া। ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার,আলাপ আলোচনা, সভাসমিতি, লেখালেখি প্রভৃতি উপায়ে কর্মী পরিচিত হয়ে থাকে ।
২. গবেষণা করা : সমষ্টি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানার জন্য সমাজকর্মী গবেষণাধর্মী কাজ করে থাকেন।সমষ্টির সম্পদ, সমস্যা, তাদের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক অবস্থা নির্ভুলভাবে জানার জন্য সমষ্টি জরিপ অপরিহার্য। এর ফলে সমষ্টির প্রয়োজন ও সম্পদের মধ্যে সর্বোত্তমভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা যায় ।
৩. দ্বন্দ্ব নিরসন করা : শহর সমষ্টির অভ্যন্তরে প্রায়ই দ্বন্দ্ব লেগে থাকে।কিন্তু সে দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সমষ্টির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে তোলে। সমাজকর্মী এক্ষেত্রে সমষ্টির বিভিন্ন দলের কোন্দল দূরীকরণার্থে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে।সমষ্টির সকল ব্যক্তি, দল, যাতে একযোগে কাজ করতে পারে এবং সমষ্টির সার্বিক কল্যাণ সাধনে সক্ষম হন এজন্য তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন ।
৪. সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন : শহর সমষ্টির জনগণ অনেক সময় বিভিন্ন সমস্যা ও প্রয়োজন সম্পর্কে উদাসীন থাকেন।ফলে সমস্যা সমাধানে তারা উদ্যোগ গ্রহণ করে না, কর্মী এক্ষেত্রে সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করেন এবং সমস্যার ব্যাপকতা তাদের সামনে তুলে ধরেন। নিজে সমস্যার সমাধান দেন না বরং সমাধান কৌশল নির্ণয় ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, তথ্য, উপদেশ এবং নির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা করেন।
৫. সক্ষমকারীর ভূমিকা পালন : শহর সমষ্টি যখন তাদের নিজেদের প্রচেষ্টায় তাদের অবস্থার উন্নয়নে অক্ষম বা অপরাগ হয় তখনই সমাজকর্মী তাদেরকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সক্ষম করে তোলেন। সমষ্টির ক্ষেত্রে কর্মী তার জ্ঞান দক্ষতা,অভিজ্ঞতা দিয়ে তা করার চেষ্টা করেন। তিনি তাদের নিজেদের সম্পর্কে চিন্তা করতে, সমস্যা ও সম্পদ সম্পর্কে জানতে,সমাধানের উপায় বের করতে, কর্মচাঞ্চল্য ও আত্মপ্রত্যয় দৃঢ়তর করতে প্রয়াসী হন। অবিরাম প্রচেষ্টায় শহর সমষ্টির জনগণকে সক্ষম করে তোলা তার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এছাড়াও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণার্থী শহর সমষ্টির উন্নয়নে যে কাজ করেন সেগুলো হলো :
১. নেতৃত্ব প্রদান, ২. সংযোগ রক্ষাকারীর ভূমিকা পালন, ৩.পরিবর্তনকারীর বাহক, ৪. প্রশাসনিক দায়িত্বপালন, ৫.সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন, ৬. দায়িত্ব ও কর্তব্য উপলব্ধিতে সহায়তাকরণ, ৭.পেশার মানোন্নয়নে সচেষ্ট হওয়া, ৮.সমস্যা নির্ণয়কারীর ভূমিকা, ৯.পরিকল্পনা প্রণয়ন,১০. নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি, ১১. প্রশিক্ষণ দান, ১২.গতিশীল ভূমিকা পালন,১৩. পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন, ১৪.শিক্ষকের ভূমিকা পালন, ১৫.মূল্যায়ন।
খ. গ্রামীণ সমষ্টিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণার্থীর ভূমিকা : গ্রামীণ সমষ্টিতে মাঠকর্মী একজন সমাজকর্মী হিসাবে নিম্নোক্ত কাজে সহায়তা করে থাকে ।
১. পথ প্রদর্শকের ভূমিকা : গ্রামীণ সমষ্টির সত্যিকার কল্যাণের জন্য অনেক চড়াই উৎরাই পাড়ি দিতে হয়।সেই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথে সমাজকর্মী গাইড বা পথ প্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করে থাকে।কখন কোথায় কিভাবে গ্রামীণ সমষ্টির আর্থসামাজিক ও নৈতিক সম্ভবপর হবে সমষ্টি সে দিকনির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করেন।
২. পরিবর্তনের বাহক : জনসমষ্টির উন্নয়ন পদ্ধতিকে গ্রামীণ সমষ্টির পরিকল্পিত পরিবর্তনের বাহন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সমষ্টি সমাজকর্মী সেই বাহনে বাহকের ভূমিকা পালন করে থাকে। ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও গণমাধ্যমসমূহ ব্যবহার করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের মনমানসিকতা ও চিন্তা ধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়নে ভূমিকা পালন করে।
৩. নেতার ভূমিকা : সমাজকর্মী সরাসরি গ্রামীণ সমষ্টির নেতা না হলেও তাকে নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়।বস্তুত তিনি গোটাসমষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকেন। তার নেতৃত্বেই সমষ্টির জনগণ তাদের অবস্থার পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ হন।সমষ্টির যারা নেতা তারাও তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল থেকে স্ব স্ব ভূমিকা পালন করে গ্রামীণ সমষ্টি অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুশীলন ও নেতৃত্বের বিকাশ সাধন তার কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত।
৪. শিক্ষকের ভূমিকা : সমাজকর্মী শিক্ষকের মতো গ্রামীণ সমষ্টিতে জ্ঞান বিতরণের ভূমিকা পালন করে থাকেন।নিঃসন্দেহে একজন শিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং পেশাদার ব্যক্তি। পক্ষান্তরে, সমষ্টির জনগণ বেশিরভাগই অজ্ঞ,নিরক্ষর ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন।আধুনিক ধ্যান-ধারণা, উন্নত প্রযুক্তি সম্পর্কে তারা মোটেই ওয়াকিবহাল নন।ফলে কর্মীকে নতুন ধ্যান-ধারণা দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞানদান তথা শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে হয়।
৫. সংগঠনের ভূমিকা : গ্রামীণ সমষ্টির কল্যাণ সাধনে ব্যক্তি, দল, অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংস্থা জড়িত থাকে।সংশ্লিষ্ট সকল দিক বা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কার্যত সার্বিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভবপর হয়ে উঠে।ফলে সফলতাকে নিশ্চিত করার স্বার্থে সকল অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান, সংস্থাকে সুসংগঠিত করা অত্যাবশ্যক হয়ে দেখা দেয়। সমাজকর্মী একজন যোগ্য সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলেন।
৬. সাহায্যকারীর ভূমিকা : একজন সাহায্যকারীর ভূমিকাও কর্মীকে পালন করতে হয় । আধুনিক সমাজকর্মীগণ মানুষের সমস্যা সমাধানে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে থাকেন। এর মূল লক্ষ্য হলো জনগণকে তাদের সমস্যার সমাধানে নিজেদের সচেষ্ট করে তোলা। সমাজকর্মী গ্রামীণ সমষ্টির সার্বিক কল্যাণ সাধনে তেমনি সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করেন।
৭. বিশেষজ্ঞের ভূমিকা : সমাজকর্মী বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার অধিকারী । অনেকক্ষেত্রে গ্রামীণ সমষ্টির খুঁটিনাটি সকল বিষয় সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল থাকেন। ফলে সমষ্টির প্রয়োজন এবং সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও কর্মসূচি প্রণয়ন থেকে শুরু করে মূল্যায়ন পর্যন্ত তিনি একজন বিশেষজ্ঞের ভূমিকা পালন করেন।
৮. শিক্ষকের ভূমিকা : কর্মসূচিকে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য নেতা, কর্মী, কর্মচারী, সদস্য, পেশাদারী প্রত্যেককে স্ব স্ব ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করা অপরিহার্য।এই অপরিহার্যতার কথা বিবেচনা করেই সমষ্টি সমাজকর্মী প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলেন।
৯. গবেষকের ভূমিকা : গ্রামীণ সমষ্টির লোকসংখ্যা, তাদের প্রকৃতি, জীবন ও সংস্কৃতি, সমস্যা ও প্রয়োজন, সম্পদ আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য কর্মীকে গবেষণার আশ্রয় নিতে হয়।কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নেও তাকে গবেষণার মাধ্যমে এগুতে হয়।এছাড়াও ব্যবহারিক শিক্ষার্থী গ্রামীণ সমষ্টিতে যে সমস্ত ভূমিকা পালন করে সেগুলো হলো :
১. পরিকল্পনাকারীর ভূমিকা, ২. যোগাযোগ রক্ষাকারীর ভূমিকা, ৩.তত্ত্বাবধায়কের বা প্রশাসকের ভূমিকা, ৪. দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীর ভূমিকা, ৫. সমন্বয় সাধনকারীর ভূমিকা, ৬. মটিভেটর. ৭.পরামর্শদাতা, ৮. নীতি নির্ধারক, ৯. মূল্যায়নকারীর ভূমিকা ইত্যাদি।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে, সমাজকর্মী হিসেবে মাঠকর্মীর ভূমিকা অত্যন্ত জটিল এবং ব্যাপক।ফলে খুবই সতর্কতা, দক্ষতা ও কৌশলের সাথে তার শহর ও গ্রামীণ উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে হয়।কর্মীর বিচক্ষণতার অভাব বা অসতর্কতা গ্রামীণ সমষ্টির ও শহর সমষ্টির ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।তাই সমষ্টি উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠকর্মীর এসব কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

Leave a Reply