অথবা, সরকারের সাথে রাষ্ট্রের যেসব পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় সেগুলো আলোচনা কর।
অথবা, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যগুলো আলোচনা কর।
অথবা, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে কী কী পার্থক্য বিদ্যমান? বর্ণনা কর।
অথবা, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যগুলো লিখ এবং এগুলোর বিবরণ দাও।
উত্তর৷ ভূমিকা : মানুষের সংঘবদ্ধ জীবনের চরম অভিব্যক্তি হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থা। রাষ্ট্র হচ্ছে সমাজের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যা সমাজভুক্ত মানুষের সমগ্র জীবন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা সকলেই রাষ্ট্রের সদস্য। কোনো মানুষই রাষ্ট্র ছাড়া বসবাস করতে পারে না। তাই এরিস্টটল যথার্থই বলেছেন যে, “মানুষ জন্মগতভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব।” রাষ্ট্রের মধ্যেই মানুষ জন্মগ্রহণ করে লালিতপালিত হয় ও মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং, রাষ্ট্রের গুরুত্ব সম্পর্কে Mackenzie বলেছেন, “If it is an organism, it is at least an organism of
organism, each one of which has a life of its own.”
রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য : রাষ্ট্র একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। রাষ্ট্রের রয়েছে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ব্যবস্থা, সার্বভৌমত্ব ও স্থায়ীভাবে বসবাসরত জনসমষ্টি। অন্যদিকে, রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম উপাদান হচ্ছে সরকার। সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ইচ্ছা, আদর্শ, উদ্দেশ্য, প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়। সরকার গঠিত হয় আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগের মাধ্যমে। নীচে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্যসমূহ আলোচনা করা হলো
১. অস্তিত্ব : রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা। এর বিভিন্ন উপাদান বাস্তব থাকলেও রাষ্ট্র নিজে একটি কাল্পনিক অস্তিত্ব। রাষ্ট্রকে দেখা যায় না, তবে ধারণা করা যায়। অন্যদিকে, সরকার একটি বাস্তব প্রতিষ্ঠান এবং এটি রাষ্ট্রের পরিচালনাকারী উপাদান, তবে সরকারকে দেখা যায়।
২. স্থায়িত্ব : রাষ্ট্র একটি স্থায়ী ও শাশ্বত প্রতিষ্ঠান। পক্ষান্তরে, সরকার পরিবর্তনশীল। যেখানে রাষ্ট্র একটি স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান, সেখানে সরকার ঘন ঘন পরিবর্তিত হতে পারে। সরকারের পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব অটুট থাকে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে : রাষ্ট্র একটি বৃহৎ ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান। অপরপক্ষে, সরকার রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন মাত্র।
৪. উপাদান ও প্রকারভেদ : রাষ্ট্র গঠিত হয় চারটি অপরিহার্য উপাদান নিয়ে; যেমন- নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি, সার্বভৌমত্ব ও সরকার । অন্যদিকে, সরকার এ চারটি উপাদানের একটি মাত্র। সরকারের উপাদান হলো আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ প্রভৃতি। সরকার বিভিন্ন প্রকার হতে পারে; যেমন- রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, সামরিক সরকার, একনায়কতন্ত্র প্রভৃতি।
৫. গঠনগত পার্থক্য : রাষ্ট্র গঠিত হয় একটি ভূখণ্ডের অন্তর্গত সমগ্র জনসমষ্টিকে নিয়ে। অন্যদিকে, সরকার বিশাল জনসমষ্টির একটি অংশ মাত্র; যারা শাসকগোষ্ঠী এবং নির্বাহী কর্মকর্তা, কর্মচারী।
৬. সরকার রাষ্ট্র নয় : রাষ্ট্র একটি স্বাধীন ও সামগ্রিক প্রতিষ্ঠান। পক্ষান্তরে, সরকার রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্রের মুখপত্র মাত্র। সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়।
৭. রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সরকার দ্বারা : রাষ্ট্র হচ্ছে একটি চেতনা ধারণা ও জাতীয়তাবোধের সমন্বয়, যা সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়। Prof. Gernar এর মতে, “রাষ্ট্র যদি হয় জীবদেহ তবে সরকার হলো এর মস্তিষ্ক স্বরূপ।” জীবদেহের মতোই সরকার নামক মস্তিষ্কের নির্দেশে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়।
৮. সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে : একটি দেশের বা স্বাধীন জাতির সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলো রাষ্ট্র। অপরপক্ষে, সরকার সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী নয়, পরিচালক মাত্র।
৯. উৎস ও রক্ষক : রাষ্ট্র স্বীয় পরিমণ্ডলে প্রবর্তিত আইন, সাংবিধানিক রীতিনীতি ইত্যাদির আধার। অন্যদিকে, সরকার এসবের রক্ষক ও প্রবর্তনকারী বা নির্বাহী মাত্র।
১০. ভৌগোলিক ধারণার দিক থেকে : রাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে স্থিত একটি প্রতিষ্ঠান। পক্ষান্তরে, সরকার ভৌগোলিক নয়। সরকার রাষ্ট্রের বাইরে থেকেও কার্য পরিচালনা করতে পারে। যেমন- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে কলকাতায় স্থাপিত বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকারের কথা বলা যায় কিংবা জাতিসংঘের অধীনে থাকা পূর্ব তিমুরের কথা উল্লেখ করা যায়।
১১. ক্ষমতার ধারণা : রাষ্ট্র সার্বভৌম, তাই এর ক্ষমতা অসীম এবং কখনো সুনির্ধারিত নয়। পক্ষান্তরে, সরকার রাষ্ট্র প্রদত্ত সীমিত ক্ষমতার অধিকারী। রাষ্ট্রের ক্ষমতা সরকার দ্বারা পরিচালনা করা হয় মাত্র।
১২. দায়দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা : জনগণের বিভিন্ন অধিকার ও অভিযোগের ব্যাপারে রাষ্ট্র জনগণের অভিভাবক ও জনগণের নিকট দায়ী। অন্যদিকে, এ বিষয়ে সরকার সরাসরিভাবে রাষ্ট্রের নিকট দায়ী।
১৩. State of Mind : রাষ্ট্রে জনগণের সমজাতীয়বোধের কারণে একটি রাজনৈতিক সমষ্টি রাষ্ট্রীয়বোধ (State of Mind) এর সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, রাষ্ট্রে জনগণের এ রাষ্ট্রীয়বোধ বা আদর্শগত প্রবাহ (Manifestation of Certain ideological current) এর কারণে জনগণ একটি বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং একটি নির্দিষ্ট দলীয় সরকারকে সমর্থন দেয়। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে জনগণের রাষ্ট্রীয়বোধ সামগ্রিক এবং সরকারের প্রতি সমর্থন আংশিক।
- Robert A. Dahl এর বিশ্লেষণ : রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জনসমষ্টিকে বিশ্লেষণ করে Robert A. Dahl তাঁর ‘Modern Political Analysis’ গ্রন্থে রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি এ Analysis টির নাম দিয়েছেন “Political Strata”। নিচে তাঁর বিশ্লেষণের Figure টি তুলে ধরা হলো :
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে
সত্য। তবে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না, তেমনি সরকার ছাড়া রাষ্ট্রের
অস্তিত্ব বজায় থাকে না। কেননা, রাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থিত জনগণের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, আশা-আকাঙ্ক্ষা, উন্নয়ন সবকিছুই সরকারের
মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। তাই পরিশেষে একথা বলা যুক্তিসঙ্গত যে, রাষ্ট্র ও সরকার একে অপরের পরিপূরক।

Leave a Reply