মানব সম্পদ উন্নয়নের পিছনে বিদ্যমান বাধাসমূহ কী কী?

অথবা, মানব সম্পদ উন্নয়নের পিছনে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোচনা কর।
অথবা, মানব সম্পদ উন্নয়নের অন্যায় সম্পর্কে বর্ণনা কর।
অথবা, মানব সম্পদ উন্নয়নের অসুবিধাগুলো পর্যালোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
বাংলাদেশের মানব সম্পদ উন্নয়নের বাধা হিসেবে অনেক উপকরণ বিদ্যমান আছে।
১. জনসংখ্যার বিশালায়তন : আমাদের সম্পদ অপেক্ষা জনসংখ্যা এত বেশি যে তাদেরকে সীমিত সম্পদ দিয়ে যথাযথ উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার এদেশের মানব সম্পদ উন্নয়নের গুণগত মানও আশানুরূপ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই মানব সম্পদ অবমূল্যায়িত হচ্ছে। এক বিষয়ে ট্রেনিং নিয়ে অন্য বিষয়ে কাজ করছে। এতে করে দেশের মূল্যবান সম্পদের অপব্যবহার হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এ সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে।
২. আয় বৈষম্য : আয় বৈষম্য যত কম হবে মানুষের জীবনযাত্রার মান ততই উন্নত হবে। মানুষের জীবনযাত্রা উচ্চস্তরের হলে মানব সম্পদ উন্নয়নের পথ সুগম হয়। আয়ের বণ্টন অধিক সমান হলে জনগণের মধ্যে শিক্ষা, সুচিকিৎসা ইত্যাদি গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে মানব উন্নয়ন ঘটে এবং সরকারকে মানব উন্নয়নের জন্য অধিকহারে খরচ করতে
হয় না। বর্তমান দেশের পাঁচ শতাংশ ভাগ্যবানের অধীনে চলে যাচ্ছে ১৯ শতাংশ জাতীয় আয়, আর নিচের দুর্ভাগ্য ৪০ শতাংশের জন্য থাকছে মাত্র ১৭ শতাংশ, যা মানব উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
৩. ধীরগতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন : ধীরগতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানব সম্পদ উন্নয়নের একটি প্রধান বাধা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেলে মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির সাথে সাথে আয় বৃদ্ধি পায়। এতে করে মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান প্রভৃতির জন্য অধিক হারে খরচ করতে পারে। সুতরাং ধীরগতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের
জন্যও মানব সম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
৪. শিক্ষিতের নিম্নহার : মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য কারিগরি শিক্ষাও অধিক প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষিতের হার অধিক কম আবার শিক্ষিতের দক্ষতাও কম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে কর্মক্ষেত্রের কোনো মিল নেই। গণসচেতনতার জন্য কারিগরি শিক্ষা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে না। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও বিভিন্ন বৈষম্য বিদ্যমান।
৫. শিশু শ্রম : আমাদের শিশু শ্রমিকের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এতে করে তাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটছে। প্রকৃত মানব উন্নয়ন ঘটছে না। তারা শিক্ষা হতে বঞ্চিত বলে তাদের দক্ষতাও কম। অবশ্য সরকার আইন করে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ করেছে। তথাপি আইনের বাস্তবায়ন ঠিকমতো ঘটছে না।
৬. ব্যাপক বেকারত্ব : ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত শ্রমিক তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত শ্রমিক বাড়ার সাথে সাথে শিল্পায়ন না হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। গ্রাম অঞ্চল থেকে অধিক হারে লোক আসছে শহরে কাজের আশায়। ফলে শহরে বস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বস্তিবাসীদের স্বাস্থ্যের অবস্থা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এতে করে মানব সম্পদের উন্নয়ন হচ্ছে না।
৭. স্বাস্থ্যহীনতা : সুষম খাদ্য গ্রহণ, উপযুক্ত বাসস্থান ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ প্রভৃতি স্বাস্থ্যরক্ষার মূল উপাদান। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি পালনের এসব উপাদানের কোনোটিই এদেশে সহজলভ্য নয়। আবার আমাদের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু ২২৫ টাকা ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয়েছে। তাও আবার সবার কাছে ঠিকমতো পৌঁছায় না। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ দুর্বল, ভগ্নস্বাস্থ্য ও কর্মবিমুখ। তাই এ স্বাস্থ্যহীন মানবগোষ্ঠী দ্বারা মানব উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
৮. গ্রামাঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থা : বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে। কিন্তু গ্রাম এলাকার অধিকাংশ লোক দারিদ্র্য, নিরক্ষর ও আধুনিক সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত। মানব সম্পদ উন্নয়ন করতে হলে এদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কৃষিনির্ভর ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পের প্রসার ঘটাতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে গ্রামাঞ্চলে তেমন ব্যাপক বিনিয়োগ ঘটছে না। ফলে মানব উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
৯. নৈতিকতার অভাব : দেশের অধিকাংশ মানুষের চরম নৈতিক অবনতির জন্য আমাদের সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। উন্নত দেশে নৈতিক চরিত্রের অধিকারী মানুষ তাদের প্রতি নিষ্ঠাবান হয়। আমাদের দেশে তার একান্ত অভাব পরিলক্ষিত হয়।
১০. স্বল্প আয়ুষ্কাল : উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেশের গড় আয়ুষ্কাল উন্নত দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। যেখানে জাপানের গড় আয়ুষ্কাল ৭৯ বছর । সেখানে বাংলাদেশের মাত্র ৬৮ বছর। এটি মানব সম্পদ উন্নয়নের একটি অন্যতম বাধা।
উপসংহার : উপর্যুক্ত বাধাগুলো দূর করতে পারলে আমরা বাংলাদেশের মানবকে সম্পদে রূপান্তরিত করতে পারবো।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079
or 01773270077

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*