অথবা, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের প্রভাব বর্ণনা কর।
অথবা, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের প্রভাব কী কী? বর্ণনা কর।
অথবা, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের প্রভাব বিশ্লেষণ কর।
অথবা, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের প্রভাব ব্যাখ্যা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা : শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সরকারি ও ব্রিটিশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চাকরি, ওকালতি, চিকিৎসা, শিক্ষকতা ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত হয়। পরবর্তীতে এ মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলার সমাজে অনুপস্থিত জমিদার হিসেবে একটি স্থায়ী শাসক শ্রেণির ভূমিকা গ্রহণ করে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের প্রভাব : মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিকাশের ফলে সমাজে পরিবর্তন এসেছে। নিম্নে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের প্রভাব আলোচনা করা হলো :
১. শক্তিশালী মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ : ব্রিটিশ শাসনামলে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি মূলত হিন্দু সাম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। কারণ তারা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে ইংরেজদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণে সমর্থ হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানরা ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে বেশ বিলম্বে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। যার ফলে
মুসলমানদের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব বিলম্বে ঘটে। উনিশ শতকের শেষের দিকে মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়। সমাজে নিম্নমধ্যবিত্তের কিছুটা আর্থিক উন্নতি হওয়ায় অনেক মুসলিম পরিবার আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসে। ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কালকে মধ্যবিত্ত মুসলিম বাংলাভাষি মুসলমান শ্রেণির আত্মপ্রতিষ্ঠা ও প্রসারণের কাল বলা চলে এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পরই বাংলাদেশে একটি শিক্ষিত শক্তিশালী মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠে।পরবর্তীতে এ শ্রেণিটি পাকিস্তান আমলে মাতৃভাষা বাংলা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং বাঙালি জাতীয়তা আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করে।
২. বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি : ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ও ইংরেজি সংস্কৃতি ও ভাবধারার অনুসারী মধ্যবিত্ত সমাজের প্রভাব পড়ে তৎকালীন বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতিতে। এর ফলে বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতির লক্ষণীয় পরিবর্তন আসে। এ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে অবদান রাখেন সে যুগের সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক ও সমাজ সংস্কারকগণ।
৩. হিন্দু সমাজে পরিবর্তন : শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক প্রচেষ্টার ফলে হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত ভয়ঙ্কর সতীদাহ প্রথাটি ব্রিটিশ শাসকবর্গের সহায়তায় আইন করে রদ করা হয়। এছাড়াও হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন কার্যকরী হওয়ার পিছনেও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রভাব রয়েছে।
৪. বাংলা সাহিত্যের বিকাশ : বাংলা সাহিত্যের বিকাশে প্রধান ভূমিকা ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের। মধ্যবিত্ত সমাজের অনেক কবি ও সাহিত্যিক তাঁদের কাব্য সামগ্রী দ্বারা বাংলা সাহিত্যকে অনেক সমৃদ্ধ করেছেন। এদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্ৰ চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মীর মোশাররফ হোসেন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
৫. স্বাধীনতা আন্দোলন : পাক-ভারত উপমহাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিশেষ অবদান লক্ষ করা যায়। উনিশ শতকের শেষ ভাগে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে সামাজিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা এবং আঞ্চলিক উন্নতির জন্য মধ্যবিত্ত সমাজ নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। এটি পরে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর সারাদেশে এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়। তৎকালীন শাসকবর্গের শাসনকাজে অনভিজ্ঞতা, অপরিমেয় দুর্নীতি, ব্যর্থতা, দলীয়করণ প্রভৃতি কারণে বাংলাভাষি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে বহু মধ্যবিত্ত পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে নিরস্ব হয়ে পড়ে। অসম অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে বাংলাদেশে সত্তর দশকের মধ্যেই এর পূর্বের দু’দশকের গড়ে উঠা মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি অংশে হয়ে যায় উচ্চবিত্ত, কোটিপতি, অন্য অংশ চলে আসে নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের স্তরে। মাঝের একটি অংশ প্রাণপনে মধ্যবিত্ত থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেজন্য মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতি বছর যোগ হচ্ছে নতুন নতুন লোক।

Leave a Reply