অথবা, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির পটভূমি উল্লেখ কর।
অথবা, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির পটভূমি তুলে ধর।
উত্তর।। ভূমিকা : পরিবার পরিকল্পনার পথিকৃৎ হলেন আমেরিকার মার্গারেট সেংগার। ১৯১৬ সালের ১৬ অক্টোবর মার্গারেট সেংগার ও তার বোন এথেলবিরনে এবং ফানিয়াসিডেল নামক সমাজকর্মীদ্বয় আমেরিকার ব্রুকলিনের বাউসভিলে এলাকায় সর্বপ্রথম একটি ক্লিনিক চালু করেন। এর মাধ্যমেই পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকতা লাভ করে।এর ক’বছর পর ১৯২১ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে সর্বপ্রথম ‘Birth Control Conference’ অনুষ্ঠিত হয়।Birth Control League’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরের বছর আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের টাউনি হল ক্লাবে একটি জনসভার আয়োজন করা হয়। উক্ত জনসভায় মিসেস সেংগার ও মিস মেরি উইন্ডসর জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে একটি জোরালো বক্তব্য পেশ করেন। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯২৩ সালে মার্গারেট সেংগার ‘Brith Control Clinical Research Bureau’ নামে আমেরিকায় প্রথম জন্ম নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক স্থায়ী ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে সরকারিভাবে জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মসূচি চালু হয় মহীশূরে। ১৯৩০ সালের ১১ জুন মহীশূরে জন্ম নিয়ন্ত্রণ ক্লিনিক চালু হয়। আমাদের সর্বপ্রথম বেসরকারি পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা বা জন্ম নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মসূচি চালু হয় পঞ্চাশের দশকে।
বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা সমিতির পটভূমি : ১৯৫৩ সালের ২ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ড. হুমায়রা সাঈদের নেতৃত্বে এবং এদেশের কতিপয় বরেণ্য সমাজসেবীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় পরিবার পরিকল্পনা সমিতি গড়ে উঠে। ড. হুমায়রা সাঈদ ছাড়াও যেসব বরেণ্য সমাজসেবীগণ এ সমিতি গঠনে এগিয়ে আসেন তারা হলেন জাতীয় অধ্যাপক ও বারডেম এর প্রতিষ্ঠাতা ড. মোঃ ইব্রাহিম, ড. হামিদা মালিক, বেগম রইসুন্নেছা হক, মোঃ নাসিম ও আলমগীর এম. এ. কবীর। উল্লেখ্য, ড. হুমায়রা সাঈদ মায়েদের ঘন ঘন গর্ভধারণের কারণে তাদের ও তাদের শিশুদের স্বাস্থ্যহীনতা ও পুষ্টিহীনতার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এ কারণে ড. সাঈদ মা ও শিশুদের পুষ্টিহীনতা রোধ ও স্বাস্থ্য বিষয়ে মায়েদের উপদেশ দেয়ার লক্ষ্যে সমিতিটি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। এ সমিতি ১ (এক) বছরের মধ্যেই ১৯৪৫ সালে ‘International Planned Parenthood Federation’- এর প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করে এবং সমিতিটি এর কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা লাভে ধন্য হয়। ১৯৫৬ সালে ড. হুমায়রা সাঈদ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর প্রখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ড. হামিদা মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৫৭ সালে সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জনাব আলমগীর এম. এ. কবীর সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।প্রাথমিক পর্যায়ে সমিতি ঘরোয়াভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পরিচালনা করে। এছাড়া
ক্লিনিকভিত্তিক পুরুষ বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকে। জেলা ও মহকুমা সদরে সরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে এ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। ১৯৬৮ সালে ঢাকায় International Planned Parenthood Federation-IPPF এর সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।এতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে অনেকগুলো দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। তৎকালীন পরিবার পরিকল্পনা সমিতি এতে অংশগ্রহণ করে।পরিবার পরিকল্পনা সমিতি ১৯৬৪ সালের ১৫ মে জাতীয়ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেজিস্ট্রেশন লাভ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সমিতির নাম পরিবর্তন করা হয়। সমিতির নতুন নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি।’ ১৯৭৫ সালের মধ্যে এ সমিতি ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, খুলনা, রংপুর এ ৬টি জেলায় তার শাখা স্থাপন করে। এর ফলে সমিতির কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। এ বছরেই এ সমিতি ‘International Planned Parenthood Federation’ এর সহযোগী সদস্যের মর্যাদা লাভ করে। এরপর ১৯৭৭ সালে ‘বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি’ ‘International Planned Parenthood Federation’ এর পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভে ধন্য হয়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গবেষণা ও জরিপ কার্যাবলি পরিচালনা করে থাকে। তাছাড়া লক্ষ্য দলভুক্তদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ছাড়াও জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা সমিতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

Leave a Reply