অথবা, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আকর্ষণ-বিকর্ষণ তত্ত্ব আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের আলোকে আকর্ষণ-বিকর্ষণ অভিগমন তত্ত্ব পর্যালোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানান্তর গমনের আকর্ষণ ও বিকর্ষণ বিষয় মূল্যায়ন কর।
উত্তর৷ ভূমিকা : ‘স্থানান্তর’ প্রত্যয়টি সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্যয়। মানুষ তাদের প্রয়োজনে একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হয়। মানুষ অনেক প্রকৃতির প্রতিকূল পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে স্থানান্তরিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, মানুষ অনেক সময় নদীভাঙন দ্বারা আক্রান্ত হয়ে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মানুষের স্থানান্তরের পিছনে কোন না কোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক কারণসহ বিভিন্ন কারণ স্বকীয় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আকর্ষণ-বিকরণ তত্ত্ব : অধিকাংশ সামাজিক জনবিজ্ঞানীরা আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বিবিভাজন ধারণার সাহায্যে স্থানান্তরের নির্ধারণ বিশ্লেষণ করে থাকেন।কার্যক্রম মূল বাসস্থানের সাথে জড়িত এবং আকর্ষণজনিত ঘটনাবলি গন্তব্যস্থানের সঙ্গে যুক্ত। জীবনের অদৃষ্ট ভাগ্যের অনুসন্ধান করার জন্যই মানুষ স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। এ স্থানান্তরে আকর্ষণজনিত (Pull) উপাদান প্রভাব বিস্তার পারে আবার বিকর্ষণজনিত উপাদানও প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অভিগমনকারী যখন মনে করে যে, গন্তব্যস্থান তার আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়ক হবে তখন সে ঐ স্থানের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। বিপরীতক্রমে অভিগমনকারী যখন মনে করে। যে, বর্তমান বাসস্থান তার প্রয়োজন মিটাতে অক্ষম অথবা বাসস্থান অনভিপ্রেত তখন সে ঐ স্থান ত্যাগ করে, অন্য কোন স্থানে স্থানান্তরিত হতে পারে। অর্থাৎ বলা যায়, বর্তমান বাসস্থানের বিকর্ষণজনিত উপাদান এবং গন্তব্যস্থানের আকর্ষণজনিত প্রভাবের কারণে কোন ব্যক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং সে স্থানান্তরিত হয় । বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে Lee এর ‘আকর্ষণ-বিকর্ষণ’ মতবাদ অধিক মাত্রায় প্রভাবিত। কেননা বাংলাদেশের মানুষ আকর্ষণ-বিকর্ষণ উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। Everett S. Lee স্থানান্তরের ক্ষেত্রে যেসব আকর্ষণ-বিকর্ষণ উপাদানের কথা বলেছেন সেগুলো নিম্নরূপ :
ক. স্থানান্তরের বিকর্ষণজনিত উপাদান (Push factors of migration) : বিকর্ষণজনিত যেসব উপাদানের কারণে মানুষ বাসস্থান ত্যাগ করে, সেসব উপাদানগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. প্রাকৃতিক কারণে অপসারণ : বন্যা, খরা, মহামারি, দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প ইত্যাদি কারণে মানুষ একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হয়। যেমন- বাংলাদেশে যেসব স্থানে নদীর ভাঙন হয় এবং প্রতি বছরই বন্যা কবলিত হয় সেখান থেকে মানুষ শহরে এবং অন্যান্য গ্রামে স্থানান্তরিত হয়।
২. জাতীয় সম্পদ ক্রমহ্রাসমান : লোকসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর চাপ পড়ছে। মানুষ আবাদি জমি কেটে বসতবাড়ি তৈরি করছে। ফলে কৃষিচাষযোগ্য জমি কমে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় শ্রমশক্তির পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হয় না। উদ্বৃত্ত শ্রমিকদের বিকল্প কোন শ্রমের ব্যবস্থা না থাকায় কাজের সন্ধানে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে।
৩. নির্যাতন নিপীড়নমূলক ঘটনা : রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় কারণে মানুষ নির্যাতনের শিকার হলে বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তারা পুরাতন বাসস্থান ত্যাগ করে নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হতে উৎসাহী হয়। আবার ভাষা, বর্ণ, সম্প্রদায়ের কারণেও মানুষ এরূপ নির্যাতনের শিকার হতে পারে। বাংলাদেশে কোনো কোনো স্থানে সংখ্যালঘুদের স্থানান্ত
রের বেলায় এ প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ।
৪. নিয়োগ ক্ষেত্রে বিপর্যয় : নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কাজের অভাব, নতুন উৎপাদন কৌশলের প্রবর্তন, সামাজিক, রাজনৈতিক কারণে নিয়োগ থেকে বরখাস্ত ইত্যাদি কারণে কোন লোক নিয়োগ ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। ফলে সে বাধ্য হয়ে পূর্বের বাসস্থান ত্যাগ করে নতুন বসতি স্থাপনের লক্ষ্যে স্থানান্তরিত হয়। বাংলাদেশে স্থানান্তরের এরূপ উপাদান ব্যাপক মাত্রায় প্রভাবিত করে।
৫. বিচ্ছিন্নতাবোধ : আচার আচরণ, রীতিনীতি, প্রথা, মত, বিশ্বাস ইত্যাদির জন্য কোনো মানুষ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে হয়ে গেলে সে পূর্বের বাসস্থান ত্যাগ করে নতুন বসতির লক্ষ্যে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলের অনেক লোক এ ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধে ভোগে এবং শহরে স্থানান্তরিত হয়।
৬. বিশৃঙ্খল পরিবেশ : বাংলাদেশে অনেক অঞ্চলে বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজমান। এসব অঞ্চলের বাবা-মা তাদের সন্তানদের বিশৃঙ্খল পরিবেশ থেকে মুক্ত রাখতে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে।
খ. স্থানান্তরের আকর্ষণজনিত উপাদানসমূহ (Pull factors of migration ) : স্থানান্তরের আকর্ষণজনিত উপাদানসমূহ গন্তব্যস্থলের সাথে যুক্ত। যেসব প্রভাবের জন্য আকর্ষণজনিত স্থানান্তর হয় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. অধিক আয় উপার্জনের সুযোগ সুবিধা : কোনো স্থানে অধিক আয় উপার্জনের সম্ভাবনা থাকলে মানুষ ঐ স্থানে স্থানান্তরিত হতে আকর্ষিত হয়। অধিক আয় উপার্জন মানুষকে উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে। তাই অধিক আয়ের আশায় মানুষ নতুন স্থানে স্থানান্তরিত হয়।
২. বাঞ্ছিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ : কোনো ব্যক্তির আশানুরূপ শিক্ষা যদি অন্য কোনো স্থানে সহজ হয় তাহলে সে ঐ স্থানের প্রতি আকর্ষিত হয়ে থাকে। কারণ শিক্ষাগত সুযোগ সুবিধার দরুন কোনো ব্যক্তির পেশাগত উন্নতি লাভের সুযোগ থাকে । বাংলাদেশে এ স্থানান্তর সাধারণত পরিলক্ষিত হয় গ্রাম থেকে শহরে বা ছোট শহর থেকে বড় শহরে।
৩. অনুকূল পরিবেশ : আবহাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির অনুকূল পরিবেশ মানুষকে স্থানান্তরে আকর্ষিত করে থাকে । মনোরম
আবহাওয়া বা জলবায়ু স্বাস্থ্য রক্ষার উপায়। বাংলাদেশের মানুষ স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এরূপ মনোরম পরিবেশে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে।
৪. উন্নততর নিয়োগের সুযোগ : এটি অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যেসব স্থানে অতিরিক্ত নিয়োগের সুযোগ সুবিধা বিরাজমান সেসব স্থানে মানুষ স্থানান্তরিত হতে আকর্ষিত হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের নিয়োগ লাভের আশায় মানুষ গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরিত হয়। কারণ শহরে উন্নততর নিয়োগের সুযোগ বেশি রয়েছে।
৫. নির্ভরশীলতা : স্বামী-স্ত্রী নৈকট্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের উপার্জনশীল সদস্যের কাছে থাকার ইচ্ছা ইত্যাদি স্থানান্তর উৎসাহী করতে পারে। বাংলাদেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
৬. বিনিয়োগের সুযোগ সুবিধা : দেশের যে স্থানে বিনিয়োগ করার সুযোগ বেশি রয়েছে সেখানে উদ্বৃত্ত আয়ের লোকেরা স্থানান্তরে উৎসাহী হয়। কারণ এসব স্থানে বিনিয়োগ করলে প্রচুর আয়ের সম্ভাবনা থাকে।
৭. অনুকূল সাংস্কৃতিক পরিবেশ : অনুকূল সাংস্কৃতিক পরিবেশ মানুষের মননশীলতা বাড়িয়ে থাকে। তাই সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড এবং এসব ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ কোন লোককে স্থানান্তরিত হতে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনার মত মেট্রোপলিটন শহরে অন্যস্থান থেকে সাংস্কৃতিক কর্মীরা স্থানান্তরিত হয়।
৮. শিল্পনগরী : যেসব স্থানে নতুন নতুন শিল্পনগরী গড়ে উঠে সেসব স্থানে শ্রমিকরা স্থানান্তরিত হতে আকর্ষিত হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে বিসিক শিল্পনগরী, আদমজি পাটকল, ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ ইত্যাদি স্থানে বিভিন্ন শিল্প নগরী গড়ে উঠায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসব এলাকায় স্থানান্তরিত হয়।
৯. রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা : দেশের যে স্থানে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিরাজ করে অন্যস্থান থেকে সে স্থানে জীবনযাপনের লক্ষ্যে স্থানান্তরিত হয়। বাংলাদেশে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান থেকে লোকজন দেশের অন্যস্থানে এ কারণে স্থানান্তরিত হচ্ছে। আবার বাংলাদেশে গোলযোগপূর্ণ কিছু শহর থেকে গ্রামে স্থানান্তর এরই ফলপ্রকাশ।
আকর্ষণ-বিকর্ষণ অনুসিদ্ধান্ত : স্থানান্তরের কারণের মধ্যেও এমন কতকগুলো উপাদান রয়েছে, একই সাথে আকর্ষণজনিত না বিকর্ষণজনিত সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির চাহিদা, রুচি, পছন্দের উপর। নিম্নে কিছু প্রভাবের উল্লেখ করা হলো যা আকর্ষণ ও বিকর্ষণজনিত।
১. বাসস্থান নির্বাচনে আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতি যেমন অনেককে প্রভাবিত করে তেমনি অনেকে আবার আত্মীয় থেকে দূরে থাকাকেই বেশি পছন্দ করে।
২. শিল্পের উন্নতির ফলে শ্রমিকরা যেমন শিল্পের কাছাকাছি বাস করতে চায় তেমনি এমন অনেক লোক রয়েছে যারা অধিক উন্নত জীবনযাত্রায় বসবাসের জন্য শিল্পস্থান ছেড়ে আবাসিক এলাকায় বাড়ি তৈরি করে। এখানে শিল্প এলাকায় বসবাস তাদের বিকর্ষিত করে।
৩. কৃষিক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন অনেক লোককে আকর্ষিত করে তেমনি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে বহু কৃষি শ্রমিককে কাজের সন্ধানে সেখান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় আকর্ষণ-বিকর্ষণজনিত বিভিন্ন উপাদানের কারণে মানুষ স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানান্তর এককভাবে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ উপাদানের কারণে সংঘটিত হয় না। প্রতিটি স্থানান্তরের ক্ষেত্রেই উভয় ধরনের উপাদান সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের
ক্ষেত্রে আকর্ষণ-বিকর্ষণজনিত উপাদান অধিক মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়।

Leave a Reply