বাংলাদেশের শিল্পায়নে প্রধান সমস্যাগুলো কী?

অথবা, বাংলাদেশের শিল্পায়নের সমস্যাবলিসমূহ আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের শিল্পায়নে প্রধান অন্তরায়গুলো আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের শিল্পায়নে প্রধান প্রতিবন্ধকতাসমূহ কী? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় অদ্যাবধি অনুন্নত। শিল্পায়নের মাধ্যমে একটি দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রগতি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সম্ভব। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রসমূহের দিকে লক্ষ্য করলে এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। এসব উন্নত রাষ্ট্রসমূহে জাতীয় আয়ের শতকরা ৫০-৬০ ভাগ আসে শিল্পক্ষেত্র হতে অধ্য অনুন্নত দেশসমূহে এর পরিমাণ শতকরা ৫ হতে ১৫ ভাগ মাত্র। এ কারণে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্পের উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করছে। বাংলাদেশের জাতীয় আয়ে শিল্পের অবদান
শতকরা মাত্র ৮ ভাগ। শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধির হারও অত্যন্ত মন্থর। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আমাদের শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ৩-৪ শতাংশ মাত্র। বাংলাদেশে যথেষ্ট কাঁচামালসহ প্রাকৃতিক সম্পদ, সস্তা শ্রমিক প্রভৃতি রয়েছে। তবুও এদেশে শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি।
বাংলাদেশের শিল্পায়নের সমস্যাবলি : বাংলাদেশের শিল্প অনগ্রসরতার কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো :
১. অবকাঠামোর অভাব : শিল্পোন্নয়নের জন্য রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সরবরাহ, গ্যাস সরবরাহ, টেলিফোন সংযোগ ইত্যাদি অপরিহার্য। কিন্তু এসবের কোনটিই আমাদের দেশে উন্নত নয়। অনেকক্ষেত্রে বিদ্যুৎ শক্তির অভাবে আমাদের শিল্পোন্নয়ন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
২. মূলধনের অভাব : মূলধনের অভাব বাংলাদেশে শিল্প অনগ্রসরতার অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক দরিদ্র। তাদের মাথাপিছু আয় কম হওয়ার দরুন সঞ্চয়ের পরিমাণও কম । ১৯৯৬-৯৭ সাল নাগাদ দেশজ সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল দেশের মোট জি.ডি.পি’র শতকরা ৭.৫১ ভাগ। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের স্বল্পতার জন্য উদ্যোক্তারা শিল্পের প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করতে পারে না। মূলধনের স্বল্পতা বাংলাদেশের শিল্পক্ষেত্রে অনগ্রসরতার জন্য অনেকাংশে দায়ী।
৩. খনিজ সম্পদের অভাব : দেশের দ্রুত শিল্পায়নের জন্য খনিজ সম্পদ একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ নয়। লৌহ, কয়লা, পেট্রোলিয়াম ইত্যাদি মূল্যবান খনিজ সম্পদের অভাবে বাংলাদেশের শিল্পখাতে অগ্রগতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
৪. বৈদেশিক মুদ্রার অভাব : শিল্পোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমাদেরকে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তদুপরি, খাদ্যঘাটতি পূরণ করতেও আমাদের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে বিদেশ থেকে শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে অসুবিধার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে আমাদের শিল্পোন্নয়নের গতি ব্যাহত হয়।
৫. দক্ষ শ্রমিকের অভাব : বাংলাদেশ জনবহুল হলেও এদেশের জনসাধারণের অধিকাংশ অশিক্ষিত বলে এখানে দক্ষ শ্রমিকের নিতান্ত অভাব রয়েছে। ফলে শ্রম কুশলতার অভাবে আমাদের শিল্পোন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।
৬. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব : দেশের দ্রুত শিল্পায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলত৷৷ কিন্তু, অন্যান্য অনুন্নত দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতা বিদ্যমান। একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী সরকার ও দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর অভাবে বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
৭. শিল্প ঋণের অভাব : সহজ শর্তে পর্যাপ্ত ঋণের যোগান শিল্পোন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু, আমাদের দেশে শিল্প ঋণের একান্ত অভাব রয়েছে। এছাড়া, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি এদেশে শিল্প ঋণকে প্রায়
দুষ্প্রাপ্য করে তুলছে।
৮. দক্ষ উদ্যোক্তার অভাব : বাংলাদেশের শিল্পে পশ্চাৎপদতার আর একটি কারণ হলো দক্ষ উদ্যোক্তার সব। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বাঙালিরা শিল্পকারখানা গড়ে তোলার সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত ছিল। এজন্য বর্তমানে বাংলাদেশে কলকারখানা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ঝুঁকি ও উদ্যোগ গ্রহণকারী দক্ষ সংগঠনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
৯. কারিগরি জ্ঞানের অভাব : শিল্পোন্নয়ন কারিগরি জ্ঞানের সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষার অভাবে দক্ষ কারিগরের সংখ্যা খুবই নগণ্য। ফলে শিল্পোন্নয়নের জন্য অনেক সময় আমাদেরকে বিদেশি কারিগরের উপর নির্ভরশীল হতে হয়।
১০. শ্রমিক অসন্তোষ : শিল্পশান্তি শিল্পোন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু, আমাদের শিল্পাঙ্গনে শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহৃত রয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আমাদের উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
১১. সঠিক শিল্পনীতির অভাব : বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে সঠিক শিল্পনীতির মাধ্যমে শিল্পক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করা আবশ্যক। কিন্তু, স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের শিল্পনীতিতে বারবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। শিল্পনীতিতে ধারাবাহিকতার অভাবে আমাদের শিল্পখাত কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি।
১২. কাঁচামালের রপ্তানি : বাংলাদেশে স্বাধীনতার আগে উৎপাদিত বিভিন্ন কাঁচামাল রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হতো। স্বাধীনতার পরেও শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে এসব কাঁচামাল ব্যবহারের চেষ্টা না করে সেগুলোকে আগের মতোই বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
১৩. যন্ত্রপাতির অভাব : ভারী শিল্পের অভাবে দেশে শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির একান্ত অভাব রয়েছে। যন্ত্রপাতির অভাবে আমাদের শিল্পোন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
১৪. সুষ্ঠু পরিচালনার অভাব : আমাদের বৃহদায়তন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই সরকারি মালিকানাধীনে রয়েছে। কিন্তু, সুষ্ঠু পরিচালনার অভাবে বর্তমানে প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকেই লোকসান দিতে হচ্ছে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, উপরে বর্ণিত সমস্যাসমূহ দূর করা না গেলে বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন সম্ভব নয়। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি বিলম্বে আবির্ভূত দেশ। বর্তমান বিশ্বে উন্নত দেশসমূহের সাথে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। এ ক্ষুদ্র নতুন দেশটির শিল্পোন্নয়ন অপেক্ষাকৃত কঠিন কাজ।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%9a%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87/
পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079
or 01773270077

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*