বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চরিত্র ও কারণসমূহ আলোচনা কর ।

অথবা, বাংলাদেশে বহুসংখ্যক রাজনৈতিক দলের উদ্ভবের কারণগুলো ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণ আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণ সম্পর্কে বর্ণনা কর।
উত্তরা৷ ভূমিকা :
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিচালনায় রাজনৈতিক দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো দেশের সরকার রাজনৈতিক দলের উপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। মূলত রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই সরকার বৈধতা অর্জন করে। তাই প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাতে রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি ও কার্যক্রম লক্ষ করা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেক দেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দল তাদের সফল ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয় না। বাংলাদেশে বর্তমানে বহু রাজনৈতিক দল রয়েছে। তবে এ রাজনৈতিক দলগুলো নতুন নতুন আদর্শ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেনি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে ভেঙে বহু ভাগে বিভক্ত করেছে। এজন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংসতা বিদ্যমান রয়েছে।
রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল : রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বহু দল গঠনের পিছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. ঐতিহাসিক কারণ : বর্তমান হলো অতীতের ফলশ্রুতি। বাংলাদেশে আজ যে চরম দলীয় কোন্দল ও সহিংসতা বিদ্যমান তার কারণ এর অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য। পাকিস্তান আমলেও ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগে উপদলীয় কোন্দল ছিল অত্যন্ত প্রকট। মুসলিম লীগের মধ্যে ৩টি উপদল ছিল- মুসলিম লীগ (নাজিমউদ্দিন) মুসলিম লীগ ফজলুল হক, মুসলিম লীগ সোহরাওয়ার্দী। মূলত মুসলিম লীগের এহেন কোন্দলের ফলশ্রুতি আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং তার থেকে পরবর্তীতে
স্বাধীনতা উত্তর শত শত দলের উৎপত্তি হয়েছে। পাকিস্তানে উপদলীয় কোন্দলের প্রশিক্ষণ বাংলাদেশেও কার্যকর থাকায় আজ তা মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
শ্রেণীস্বাথের সংঘাত : শ্রেণীস্বার্থের সংঘাতই বাংলাদেশের দলগুলোর মধ্যকার উপলীয় কোন্দলের প্রধান কারণ। স্বাধীনতার পূর্বে মুসলিম লীগের তিনটি উপদল লক্ষ করা যায়। যথা : (ক) নাজিমউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন উপদল যা পাকিস্ত কানের সামান্ত প্রভু এবং জোতদারদের স্বার্থরক্ষা করে চলেছে, (খ) ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন উপদল যা গ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকদের সমর্থক ছিল এবং কৃষকদের সার্বিক মুক্তির কথা বলত। বর্তমানে ডানপন্থি ও বামপন্থি দল রয়েছে যারা শ্রেণী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।
৩. সমযোগ্যতাসম্পন্ন একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি : দলের মধ্যে সমযোগ্যতা বা নেতৃত্বসম্পন্ন একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতিও দলের মধ্যে কোন্দলের সৃষ্টি করে। এ কোন্দলে যিনি টিকে থাকেন তিনিই নেতা হিসেবে বহাল থাকেন। এ কারণে বহু রাজনৈতিক দল বিভক্ত হয় ও নতুন দলের জন্ম হয়।
৪. সীমাহীন দরিদ্রতা : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উপদলীয় কোন্দলের জন্য জনগণের সীমাহীন দরিদ্রতাকে বিশেষভাবে দায়ী করা যায়। এ দেশের জনগণ দরিদ্রতার কারণে যে দিকে সুযোগ সুবিধা বেশি পায় সেদিকে ধাবিত হয়। ফলে দলের ভিতরে কোন্দল শুরু হয়।
৫. পদ বা নেতৃত্বের লোভ : পদ বা নেতৃত্বের লোভে দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সৃষ্টি হয়। বেশিরভাগ নেতা ও কর্মী যদি পদের জন্য লালায়িত হয় এবং দায়িত্ব লাভের ব্যাপারে নিজেদেরকে সর্বাপেক্ষা যোগ্য মনে করেন; তবে তাদের মধ্যে নেতৃত্বের লড়াই শুরু হয়। ফলে দলের মধ্যে কোন্দলের সূত্রপাত ঘটে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নেতাভিত্তিক এবং তাদের পছন্দমতো প্যানেলকে জয়যুক্ত করার জন্য তারা উপদলীয় কোন্দলে লিপ্ত হয়।
৬. যোগ্য নেতৃত্বের অভাব : রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে অযোগ্যতাও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোন্দলের সৃষ্টি করে থাকে এবং বহু রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ঘটতে পারে। বাংলাদেশে যোগ্যতাসম্পন্ন নেতার যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই কোনো দল সুষ্ঠু নেতৃত্ব প্রদান করতে সক্ষম হয়নি। যদিও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ্য নেতৃত্ব দান করেছিল কিন্তু পরবর্তী কালে তাদের নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দেয় । ফলে এ দল ভেঙে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়।
৭. সামরিক হস্তক্ষেপ : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে কয়েকবার। সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় অনেকদিন চলতে থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দেয় এবং নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয় ।
৮. ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠন : ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠনকে উপদলীয় কোন্দলের অপর একটি বিশেষ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় । রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এখনও স্থিতিশীল পর্যায়ে না পৌঁছানোর কারণে এখানে নতুন নতুন দলের সৃষ্টি হয়। এসব দলে মূলত একজন নেতাই থাকেন এবং তারই আহ্বানে অন্যরা এসে দলে যোগ দান করেন। ফলে দল হয়ে ওঠে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। বাংলাদেশে কয়েকটি আদর্শগত দল ছাড়া বাকি দলগুলোর ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। মূল নেতার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারিয়ে উপদলগুলো গড়ে ওঠে এবং স্বার্থের সংঘাতে লিপ্ত হয়।
৯. আদর্শগত বিরোধ : আদর্শগত কারণেও বাংলাদেশে বহু নতুন রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়েছে এবং উপদলীয় কোন্দল দেখা দিয়েছে । প্রত্যেক দল একটি নিজস্ব আদর্শ অনুযায়ী চলে। কিন্তু দল যদি এ আদর্শ হতে বিচ্যুত হয় তাহলে সকলে তা মেনে নিতে চাই । ফলে সৃষ্টি হয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল । বাংলাদেশের বামপন্থি দলগুলো আদর্শগত কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আবার আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে অনেকে নতুন নতুন দল সৃষ্টি করেছে। মূলত আদর্শগত বিরোধের কারণেই বাংলাদেশে বহু রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয় ও উপদলীয় কোন্দল দেখা দেয় ।
১০. প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের অভাব : প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের অভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় । এখানে রাজনৈতিক দলগুলো আজও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের দ্বারা উন্নত হতে পারেনি। সুষ্ঠ ও বলিষ্ঠ দিয়ে সৃষ্টি হয় । নেতৃত্ব, স্বচ্ছ চিন্তাধারা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানসিকতা, দেশপ্রেম প্রভৃতি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য নীতি
১১. বিদেশি শক্তির প্রভাব : তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ বৃহত্তর শক্তিগুলোর হাতে কুক্ষিগত রয়েছে এবং এসব শক্তিগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। তাই তারা একাধিক রাজনৈতিক দল এ টিম, বি. টিম, সি. টিম হিসেবে গড়ে তোলে; যাতে করে একটি রাজনৈতিক দল তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে না পারলেও অপর একটি দল সে স্থানটি পূরণ করতে পারে।
১২. ব্যক্তি নির্ভরশীলতা : ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তির ইচ্ছামতো পরিচালিত হয়। ফলে দলের যেসব সদস্য এটা পছন্দ করতে পারে না তারা দলের মধ্যে এর সমালোচনা করে এবং শুরু হয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেক নেতাকর্মী ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলের প্রতি আস্থা না রাখতে পেরে দলত্যাগ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়ায় এদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল অত্যন্ত প্রকট।
১৩. আন্তর্জাতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আন্তর্জাতিক দলগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপন করে তাদের কর্মসূচি নির্ধারণ ও পরিচালনা করে থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যখন দলের মধ্যে। কোন্দলের সৃষ্টি হয়, তখন তার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিতে
যখন কোনরূপ কোন্দল দেখা যায়, তখন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে এর প্রভাব পড়ে।
১৪. বিদেশি শক্তির প্রভাব : বিদেশি শক্তির প্রভাবের কারণেও অনেক সময় রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সৃষ্টি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ নীতিতে বৃহত্তর শক্তিগুলোর হাত আছে এবং এসব শক্তিগুলো তাদের স্বার্থে রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তোলে। আবার এসব ব্যক্তিবর্গের চক্রান্তে দলের মধ্যে ভাঙন ঘটে |
এবং নতুন দলের উদ্ভব হয়।
১৫. শিক্ষার অভাব : শিক্ষার অভাব যেমন একটি দেশকে উন্নয়নের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে, তেমনি কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে তুচ্ছ বিষয়ে কোন্দল সৃষ্টি করে থাকে। এসব কাঠামো সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা অত্যন্ত কম। সুষ্ঠু ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, স্বার্থহীনতা প্রভৃতি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। কিন্তু শিক্ষার অভাবে বাংলাদেশে আজও এসব গড়ে ওঠেনি।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটাই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলের উপস্থিতি অতি সহজে লক্ষ করা যায়। বস্তুত এ কোন্দলই আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে এক অশনি সংকেত। আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, নেতাদের মনোভাব, আন্তর্জাতিক প্রভাব এদেশের বহুদল উপস্থিতির জন্য দায়ী। এদেশের রাজনৈতিক চরিত্র দেশ নেতার মনোভাব নিয়ে গড়ে ওঠেনি। ব্যক্তিস্বার্থ ও পদমর্যাদা লাভের প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিধায় আমরা বহু দলের অস্তিত্ব দেখি।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079
or 01773270077

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*