অথবা, বেনজীর ভুট্টোর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আলোচনা কর।
অথবা, বেনজীর ভুট্টোর রাজনৈতিক জীবনের বিবরণ দাও।
অথবা, পাকিস্তানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোর পরিচয় দাও। তার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে যা জান লিখ।
উত্তর৷ ভূমিকা : মুসলিম বিশ্বের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন বেনজীর ভুট্টো। তিনি হলেন ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর থেকে তিনি সবসময় দেশের প্রতিটি স্তরে গণতন্ত্রের সুবাতাস পৌছে দেবার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি তাঁর পিতার আদর্শ অনুসরণ করে চলেন এবং পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন। পাকিস্তানের মতো একটি রক্ষণশীল দেশে একজন নারী হিসেবে বহু বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন। ক্ষমতায় থাকাকালীন দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য তিনি বহুমুখী আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদান
রয়েছে।
সংক্ষিপ্ত জীবনী : পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলার নওসেরা গ্রামে ১৯৫৩ সালের ২১ জুন বেনজীর ভুট্টো জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং মা নুসরাত ভুট্টো। তাঁর বাবা ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট। তাঁর বাবার গড়া দল পিপিপি’র সভাপতি ছিলেন তাঁর মা। বেনজীর ভুট্টো তাঁর স্কুল জীবন শেষ করেন
এক খ্রিস্টান মিশনারী স্কুল থেকে। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এরপর তিনি ভর্তি হন ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেও তিনি কৃতিত্বের সাথে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি আবার পাকিস্তানে ফিরে আসেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেনজীর ভুট্টো : নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : ১৯৮৮ সালের ১৭ আগস্ট তারিখে এক বিমান দুর্ঘটনায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক নিহত হলে নতুনভাবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হয়। পাকিস্তান যে স্বৈরশাসনের কবলে দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ছিল, স্বৈরশাসক জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর তা বিতাড়িত হয়ে গণতন্ত্র নতুনভাবে
জীবন ফিরে পেল। আর এক্ষেত্রে বেনজীর ভুট্টোর অবদান ছিল সর্বাধিক। কারণ ঐ সময়ে তাঁর পিতার আদর্শকে পুঁজি করে তিনি বিস্ময়করভাবে রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর আগমনের মধ্য দিয়েই পাকিস্তানে জেনারেল জিয়া প্রবর্তিত যুগের বিদায় ঘটে এবং পাকিস্তানে পুনরায় গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়। পাকিস্তান ফিরে পেয়েছিল গণতন্ত্রের বিশ্বনন্দিত রূপ এবং তাঁর প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধাবোধ। ফলে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হয়।দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বেনজীর দেশের সর্বস্তরে সুষ্ঠুরূপে গণতন্ত্র পৌঁছে দেবার চেষ্টা করেছেন। ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ উপাধিটি এ কারণেই তাকে দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে দেশটিতে পুনরায় সামরিক শাসন চালু হলে বেনজীর ভুট্টোকে নির্বাসনে দেয়া হয়।
২. সার্ক চেয়ারপারসন : দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সংক্ষেপে SAARC (সার্ক)-এর চেয়ারপার্সন হিসেবে বেনজীর ভুট্টো নির্বাচিত হন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সফলভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যান। চতুর্থ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইসলামাবাদে এবং এর উদ্বোধক ছিলেন বেনজীর ভুট্টো। এ সম্মেলনে তিনি দক্ষিণ এশিয়াকে যুদ্ধের আশঙ্কামুক্ত শান্তি ও সমৃদ্ধির অঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্যে সমন্বিত নীতি গ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন সার্ক নেতৃবৃন্দের প্রতি।
৩. বৈদেশিক নীতি : তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন ১৯৮৮ সালের ২ ডিসেম্বর। এরপর তিনি তাঁর প্রথম নীতিনির্ধারণী ভাষণে ঘোষণা করেন যে, “তিনি দেশের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের প্রসার ঘটাবেন। পররাষ্ট্র নীতির ব্যাপারে তিনি তাঁর প্রয়াত পিতার নির্ধারিত পথ অনুসরণ করবেন। ভারতের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবেন। আফগানিস্তানের সাথে পর্যবেক্ষণমূলক
সম্পর্ক বজায় রাখবেন। আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তুলবেন।” [রাজনীতি ও উন্নয়নে নারী; ড
মোঃ আবদুল ওদুদ ভূঁইয়া,। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি এভাবেই গড়ে উঠেছিল ।
৪. নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা : অবহেলিত নারীসমাজের কথা চিন্তা করে তিনি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সবসময়ই করে গেছেন। কারণ তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মায়ের নিঃসঙ্গ কষ্টের জীবন স্বচক্ষে দেখেছেন। তাঁর কষ্ট হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন। আর এ কারণেই তিনি সমগ্র নারী জাতির কষ্টও অনুভব করতে পারেন। যার কারণে একজন নারী নেত্রী হিসেবে তিনি নারীদের কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন।
৫. অর্থনৈতিক অগ্রগতি : তিনি তাঁর শাসনামলে দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি একটি কমিশন গঠন করেন সার্ক দেশগুলোর বাণিজ্য, উৎপাদন ও অন্যান্য বিনিময় সম্পর্ক পরীক্ষা করে দেখার জন্য। দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় কিভাবে বাড়বে, কৃষি ও শিল্পের উন্নতি কিভাবে হবে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করার উপায় কি, এসব বিষয়ে তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। একথা অনস্বীকার্য যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার অক্লান্ত পরিশ্রম অবশ্যই সাফল্যের দাবি রাখে।
৬. শিক্ষাক্ষেত্রে : জাতিকে নিরক্ষরতা মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি তাঁর বাবার রেখে যাওয়া শিক্ষা নীতিকেই সংস্কার করে কাজে লাগান এবং শিক্ষাবিস্তারের লক্ষ্যে আরো বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি নিজে ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত, তাই তিনি এ বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, শিক্ষা ছাড়া দেশ ও জাতির উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। তাই তিনি শিক্ষাবিস্তারের লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, বেনজীর ভুট্টো রাজনৈতিক জীবনে তাঁর পিতার আদর্শকে অনুসরণ করেছিলেন। তিনি রাজনৈতিক পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেন এবং জন্ম থেকেই বাবার রাজনৈতিক জীবন স্বচক্ষে দেখে সেখান থেকেই ধীরে ধীরে রাজনীতি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। এ লব্ধ জ্ঞান দ্বারাই পিতার মৃত্যুর পর বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে পিতার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নিয়ে দু’বার দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন। দেশ ও জাতির উন্নতির লক্ষ্যে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। ‘Daughter of the east’ হিসেবে খ্যাত মুসলিম বিশ্বের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোর নাম ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ডটার অব দ্যা ইস্ট নামে খ্যাত পাকিস্তানের এই মহীয়সী নারী নেত্রী ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে আততায়ীর হাতে বোমা হামলায় নিহত হন।

Leave a Reply