স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ব্যাখ্যা কর ।

অথবা, স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীদের অবদান আলোচনা কর।
অথবা, স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীদের অবদান লিখ।
অথবা, স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে তুমি কি জান তা তুলে ধর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
সমাজে, পরিবারে ও রাষ্ট্রে নারীর যে অসম, নির্যাতিত, অবদমিত অবস্থা ও অবস্থান তার অবসান ঘটিয়ে নারীকে পরিপূর্ণ মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই নারী আন্দোলনের সূচনা বিশ্বে এবং বাংলাদেশে। তৃতীয় বিশ্বের নারী আন্দোলন কোন আরোপিত ঘটনা নয়। এর আছে নিজস্ব ইতিহাস। বাংলাদেশের নারী আন্দোলন হয়েছে প্রধানত সাংগঠনিকভাবে; কখনো কখনো ব্যক্তি উদ্যোগে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও সংগঠন একীভূত হয়ে আন্দোলন করার ফলে নারী আন্দোলন করার ফলে নারী আন্দোলন পেয়েছে তীব্র গতি। তবে বাংলাদেশের নারীর আন্দোলনের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়।
স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা : স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের | রাজনৈতিক দলের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ নারীকে আত্ম-বিশ্বাসী করে । জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমশই বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই বিভিন্ন বাংলাদেশের মূল সংবিধানে নারী-পুরুষ সমানাধিকারের কথা বলা থাকায়, নারীর অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে এবং তোলে এবং সেটাই পরে তাদেরকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সাহস যোগায়। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সালের
রাজনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি পায় । এদেশের নারী সমাজের জোর দাবির মুখে যুদ্ধে লাঞ্চিত ও নির্যাতিত নারীদের বিশেষত বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগের কথিত ‘বীরাঙ্গনা’দের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এ লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে দুস্থ ও শিশুদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন সংস্থা’ বা বাংলাদেশ উইমেন রিহ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন’ (Bangladesh Women Rihabilitation Organization (BWRO)। ১৯৭৪ সালে নারী পুনর্বাসনের সপক্ষে আইন প্রণীত হয়। ১৯৭৫ সালে ‘নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ গঠিত হয়। এই ফাউন্ডেশনের অন্যতম কাজ ছিল নির্যাতিত নারীদের ধর্ষণজাত সন্তান সংগ্রহ, লালন-পালন এবং বিদেশে দত্তক হিসেবে প্রদান করা। ‘নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এর সাথে যুক্ত ছিলেন বেগম সাজেদা চৌধুরী, বাসন্তী ঠাকুরতা, নওশেরা আহমেদ, মালেকা খান, বেগম বদরুন্নেসা প্রমুখ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় ‘আপওয়া’ (APWA) ‘বাংলাদেশ মহিলা সমিতি’ (Bangladesh Mahila Samittee. BMS) নামে রূপ লাভ করে। ‘বাংলাদেশ মহিলা সমিতি’ নারীদের মুক্তি, শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর সমান সুযোগ সুবিধা, নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও চাকরি ক্ষেত্রে নারীর সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হয়। ১৯৭৬ সালে সরকার ‘বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থা’ (Bangladesh Jatiya Mahila Sangstha-BJMS) গঠন করে। এই সংস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীদের জন্য ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, নারীদের চাকরির সুবিধা প্রদান,
নারীদেরকে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং একটি সমন্বিত অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে নারীদের জাতীয় উন্নয়নে যুক্ত করা। ১৯৭৮ সালে নারী উন্নয়নের এজেন্ডা নিয়ে ‘মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৮২ সালে এ মন্ত্রণালয়ই ‘সমাজকল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে এ মন্ত্রণালয়টির কার্যাবলি ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যস্ত করে এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ । বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নারী উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গৃহীত হয়ে থাকে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ১৯৭৫ সালকে আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ এবং ১৯৭৬-৮৫ সালকে আন্তর্জাতিক নারী দশক হিসেবে ঘোষণা দেয়ার ফলে, বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠে। নারী দশক পালনের সময় বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক ধরনের গতিশীলতা আসে। এ সময় নারীপক্ষ, রূপান্তর, নারী প্রগতি সংঘ, নারী সংহতি এ রকম অনেক ছোট বড় নারী সংগঠন গড়ে উঠে। যারা শ্রেণি সম্পর্কের পাশাপাশি এ সমাজে বিদ্যমান পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠে। নারী সংগঠনগুলো এ সময় সমাজে, পরিবারে, রাষ্ট্রে সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশেষ ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন পরিচালনা করে। এসব ইস্যুগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-
১, এসিড নিক্ষেপ বিরোধী আন্দোলন।
২. যৌতুক বিরোধী আন্দোলন।
৩. নারীনির্যাতন বিরোধী আন্দোলন।
৪. রাষ্ট্রধর্ম বিল বিরোধী আন্দোলন।
৫. ইউনিফরম ফ্যামিলি কোড এর সপক্ষে আন্দোলন ইত্যাদি ।
এ সময়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিয়মিত সভা সমিতি অনুষ্ঠিত হতে থাকে। গবেষণা সংস্থা ‘উইমেন ফর উইমেন’ (Women for Women) প্রতিবছর বিশেষ ইস্যু নিয়ে বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সুপারিশমালা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এভাবেই নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করে আন্দোলনকে গতিশীল করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ ১৯৮৪ সাল থেকে সিডও (CEDAW) সনদে সরকারের পূর্ণ সম্মতির দাবিতে প্রথম আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৫ সালে নারীনির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য ‘প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করে এ পরিষদ। তাছাড়া এ সংগঠন ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোডের দাবিতে সর্বপ্রথম আন্দোলন শুরু করে। তাই বলা যায়, ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’ হচ্ছে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের অগ্রণী সংগঠন।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শেষের দুই শতকে এ দেশের নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ইতিবাচক পরিবর্তন সূচীত হয়েছে। এদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী ইশতেহারে নারীরা যেমন স্থান
পেয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নারী অধিকার গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘকালের নারী আন্দোলনের ঐতিহ্য, বিভিন্ন লড়াই, সংগ্রামে নারী সমাজের অংশগ্রহণ, নারী সমাজের সম্মিলিত দাবিদাওয়া ও সমর্থনের ফলে এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!