অথবা,সামাজিক অসমতার শ্রেণিবিন্যাস আলোচনা কর।
অথবা,সামাজিক অসমতার প্রকারভেদ আলোচনা কর।
অথবা, সামাজিক অসমতার ধরনগুলো বর্ণনা কর।
অথবা, সামাজিক অসমতার ধরনগুলোর বিবরণ দাও।
উত্তর৷ ভূমিকা : সামাজিক অসমতা সমাজবিজ্ঞানের একটি কেন্দ্রীয় প্রত্যয়। এটি সামাজিক স্তরবিন্যাসের রূপভেদ। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই এই অসমতা ক্রমান্বয়ে চলে আসছে। বর্তমানে এমন কোনো সমাজব্যবস্থা দেখা যায় না যেখানে সামাজিক অসমতা নেই। তবে সমাজভেদে এটি একেক রূপে প্রতীয়মান হয়। এর রয়েছে আবার বিভিন্ন ধরন।
জদশ সামাজিক অসমতার ধরন (Types of social inequality) : সামাজিক অসমতা প্রধানত চার ধরনের হয়ে থাকে। যথা :
১. দাসপ্রথা : দাসপ্রথা অসম সম্পর্কের ভিত্তি থেকে গড়ে উঠা সামাজিক ও অর্থনৈতিকব্যবস্থা যা সামাজিক স্ত রবিন্যাসের সবচেয়ে প্রাচীনতম রূপ। এ ব্যবস্থায় সমাজ দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা : ক. দাস এবং খ. দাস মালিক। এ ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি তার জীবনের সবধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে বেঁচে থাকার জন্য অন্য ব্যক্তির একান্ত সম্পত্তিতে পরিণত হতো। দাসের উপর দাস সমাজের অস্তিত্ব নির্ভর করত। দাসদের কোনো ধরনের স্বাধীনতা ছিল না। তারা ছিল দাস প্রভুর একান্ত সম্পত্তি। পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে দাসব্যবস্থা বিকাশ লাভ করেছিল। তবে এর চরম রূপটি দেখা গিয়েছিল প্রাচীন গ্রিস ও রোমে। গ্রিসের সব ক্ষেত্রে দাস ব্যবহৃত হতো। বস্তুত, গ্রিক ও রোমান সমাজে দাসেরা ছিল পশুর মতো নগণ্য। ভারতে দাস ব্যবস্থা ছিল ঠিকই কিন্তু গ্রিক বা রোমান সমাজের মতো ছিল না। এখানে দাসদের মূলত গৃহকর্মে ব্যবহার করা হতো। তাই এখানকার দাস ব্যবস্থাকে বলা হলো Domestic Slavery…
২. জাতিবর্ণ : ধর্মীয় পবিত্রতা ও অপবিত্রতা নির্ভর করে গড়ে উঠা সামাজিক স্তরবিন্যাসই হলো জাতিবর্ণ প্রথা। সমাজবিজ্ঞানী T. B. Bottomore ভারতীয় সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে জাতিবর্ণ প্রথা এর কথা বলেছেন। এ ব্যবস্থায় সমাজ প্রধানত ৪টি স্তরে বিভক্ত ছিল এবং এ একেক স্তরকে/শ্রেণিকে পেশাজীবী শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যথা :
১. ব্রাহ্মণ— পুরোহিত;
২. ক্ষত্রিয়- যোদ্ধা;
৩. বৈশ্য— ব্যবসায়ী;
৪. শূদ্র- কৃষক ও কারিগর ।
প্রতিটি জাতিবর্ণ কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন পালন করে। জাতিবর্ণ পরিবর্তনশীল নয়। ব্যক্তি যে জাতিবর্ণ এ জন্মগ্রহণ করে সেই জাতিবর্ণ এ জীবন অতিবাহিত করতে হয়।
৩. এস্টেট : মধ্যযুগীয় ইউরোপে সমাজের স্তরবিন্যাস বুঝাতে Estate শব্দটি ব্যবহৃত হতো। মধ্যযুগীয় সমাজ ছিল কৃষিভিত্তিক এবং এ পর্যায়কে সামাজিক ঐতিহাসিকেরা Feudalism বা সামন্তবাদ বলে অভিহিত করেছেন। এ পর্যায়ে Lord বা রাজা ছিলেন সমস্ত জমির মালিক। তিনি তার অধীনস্থ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে এ জমিগুলো বণ্টন করে দিতেন। এদেরকে বলা হলো সামন্ত প্রভু (Feudal Lörd)। সামন্ত প্রভু জমিচাষ করার অধিকার পেলে তারা তাদের কৃষকদের দিয়ে উক্ত জমিচাষ করাত। কৃষকদের অবস্থা দাসদের মতোই ছিল। এ পর্যায়ে তাদের অবস্থা ছিল নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর। সামন্তবাদী সমাজে ধর্মীয় শ্রেণির একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। তারা লর্ডের কাছ থেকে অনেক জমি এমনিতেই পেত। এভাবে মধ্যযুগে এক একটি গির্জার অধীনে অনেক ভূখণ্ড ছিল। ইউরোপীয় এস্টেট (Estate System) এ সমাজ তিনটি স্তরে বিভক্ত ছিল। এগুলো হলো :
১. সম্ভ্রান্ত শ্রেণি
(শাসক শ্রেণি)
২. যাজক শ্রেণি
৩. সাধারণ শ্রেণি
(শাসিত শ্রেণি)
প্রথম দুটি Estate সবধরনের সামাজিক সুবিধা ভোগ করত এবং তাদের সমাজে আলাদা আলাদা পদমর্যাদা ছিল। এ শ্রেণি দু’টি শাসনতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করত এবং তাদের ইচ্ছানুযায়ী এই শাসনতন্ত্রের নিয়মনীতি চাপিয়ে দিত সাধারণ মানুষের উপর। Commoners রা বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের কর দিত। তারা কোনো ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করত না বরং মধ্যযুগীয় Estate ব্যবস্থায় এ শ্রেণিটি ছিল তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক।
৪. শ্রেণি ও পদমর্যাদা : আধুনিক সমাজে অসমতা বুঝাতে শ্রেণি ও পদমর্যাদা এ দুটো শব্দ ব্যবহৃত হয়। মার্কস পুঁজিবাদী সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে শ্রেণির কথা বলেছেন। Marx শ্রেণিসংগ্রাম বলতে বুঝিয়েছেন, “A group of individuals who perform same function in the organization of production.” মার্কস উৎপাদনের উপায় (Means of production) এর ভিত্তিতে মানব ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে দুটো শ্রেণির কথা বলেছেন। এ শ্রেণি দুটো
হলো- ১. মালিক, ২. শ্রমিক। Marx শ্রেণির চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেন,
১. শ্রেণি সাধারণত উৎপাদন সংগঠনে একই ধরনের ভূমিকা পালন করে। যেমন : বাংলাদেশের সমাজে প্রধানত দুটো শ্রেণি দেখা যায়— ক. ভূমি মালিক (Land owner), খ. ভূমিহীন (Land less)। প্রত্যেকটি শ্রেণি
উৎপাদন সংগঠনে স্ব-স্ব ভূমিকা পালন করে।
২. মানব ইতিহাসের প্রত্যেকটি পর্যায়ে উৎপাদন মালিকানা এবং অমালিকানার ভিত্তিতে শ্রেণি গড়ে উঠে
৩. শ্রেণিগুলো শ্রেণিস্বার্থ সম্পর্কে সচেতন থাকে।
৪. শ্রেণিগুলো শ্রেণিসংগ্রামে রত।
আধুনিক সমাজে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অসমতা নির্দেশ হলো Status। ব্যক্তির ভূমিকা এবং কাজ দ্বারা তাদের মর্যাদা নির্ধারিত হয়। সমাজে দু’ধরনের মর্যাদা দেখা যায়। যথা : ক. আরোপিত মর্যাদা (Ascribed status) এবং
খ. অর্জিত মর্যাদা (Acheved status).
কিছু কিছু জৈবিক বৈশিষ্ট্য যেমন- অবয়ব, গায়ের রং এবং কিছু কিছু সামাজিক বৈশিষ্ট্য যেমন- বংশগত মর্যাদা বা পারিবারিক ঐতিহ্য এগুলো ব্যক্তির উপর আরোপিত মর্যাদা। এ মর্যাদাগুলো অর্জন করতে গিয়ে ব্যক্তিকে কোনো পরিশ্রম বা ত্যাগ স্বীকার করতে হয় না। অন্যদিকে, সমাজের অধিকাংশ মর্যাদা যেমন- অর্থ, পেশা, শিক্ষা এগুলো ব্যক্তিকে তার কাজ দ্বারা অর্জন করতে হয় এবং এ মর্যাদাগুলো ব্যক্তির উপর সরাসরি আরোপিত হয় না। পদমর্যাদা অনুযায়ী ব্যক্তির নিজস্ব জীবনধারা গড়ে উঠে এবং এর দ্বারাই ব্যক্তির ভূমিকা নির্ধারিত হয়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে Plato এর ভাষায় বলা যায় যে, সমাজে ব্যক্তি বিশেষের প্রবণতার ফলে ভিন্নতার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বুদ্ধি চর্চা করেন, কেউ সাহস প্রদর্শন করেন আবার কেউবা ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্য উৎপাদন কাজে নিয়োজিত থাকেন এবং এভাবেই সামাজিক অসমতার সৃষ্টি।

Leave a Reply