ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাঙালি দর্শনে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রভাব আলোচনা কর।

অথবা, বাঙালি দর্শনের উপর শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনতত্ত্বে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রভাব বর্ণনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনচিন্তায় শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার প্রভাব বর্ণনা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, অন্যান্য অনেক অগ্রসরমান জাতির মত বাঙালির দর্শনচিন্তাও ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে, বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। বাঙালি দর্শন প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক- এ তিন যুগে বিভক্ত। এ তিন যুগে বাঙালি দর্শনচিন্তা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। জগৎ ও জীবনের স্বরূপ ও গূঢ়ার্থ আবিষ্কার এবং যথার্থ মানবোচিত জীবনের অনুসন্ধানসহ মানুষকে নিয়ে মানুষের ভাবনা বাঙালির দর্শনচিন্তায় একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যরূপে দেখা দিয়েছে সকল যুগে।
বাঙালি দর্শনে শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার প্রভাব বা ভূমিকা : শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ।মানবজীবনের কর্তব্য, অকর্তব্য সম্পর্কে এ গ্রন্থে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাই গীতা হিন্দুদের কাছে অমূল্য গ্রন্থ।বাঙালি দর্শন গীতার তত্ত্ব দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হয়েছে। নিম্নে এ প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. মানবাত্মার রহস্য উদ্ঘাটন : যে অমূল্য গ্রন্থটির জন্য ভারতবাসী সমগ্র পৃথিবীর কাছে গর্বিত, সেটি হচ্ছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। মানব প্রকৃতির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গীতায় প্রথমে মানবাত্মার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে।স্বজনের মোহে মোহগ্রস্ত অর্জুনের মোহ দূর করার জন্য গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের এগারো থেকে ত্রিশ পর্যন্ত কুড়িটি শ্লোকের মাধ্যমে জীবাত্মার অমরত্বের উপাদেয় প্রদান করেছেন।
২. আত্মার অবিনাশিতা : আত্মার অবিনাশিতা সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন, “যাদের জন্য শোক করা উচিত নয় তুমি তাদের জন্য শোক করছ অথচ কথা বলছ জ্ঞানীর মত। জ্ঞানী ব্যক্তি জীবিত কিংবা মৃত কোনকিছুতেই শোক করে না।শ্রীকৃষ্ণের মতে, আত্মা অবিনাশী, আর এজন্য আত্মাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়, জীবের আসল সত্তা। এ চিরন্তন সত্য সম্পর্কে অবগত হওয়া পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য শ্রেয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “আমাদের এ দেহ ধ্বংস হয়ে গেলেও আমরা নিত্য আত্মারূপে বিদ্যমান আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব । সুতরাং আত্মা যে অমর সে কথা শ্রীকৃষ্ণের উক্তি থেকেই বুঝা যায় ।
৩. আত্মা আধ্যাত্মিক সত্তা : গীতায় আত্মাকে আধ্যাত্মিক সত্তারূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,“আত্মা কাউকে হত্যা করে না কিংবা কারও দ্বারা নিহতও হন না।” কারণ আত্মা অমর, অজর ও অবিনাশী। আমরা যাকে মৃত বলি তা আসলে আত্মার দেহান্তর মাত্র। মানুষ যেমন ছিন্ন বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মা তেমনি জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহে প্রবেশ করে। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “যিনি আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, অজ ও অব্যয় বলে জানেন, হে পার্থ! তিনি কিরূপে কাউকে হত্যা করেন এবং কাকেইবা হত্যা করান? আত্মা এমনই এক আধ্যাত্মিক সত্তা,মারণাস্ত্র যাকে ছেদন করতে পারে না এবং জলও যাকে সিক্ত করতে পারে না।”
৪. চতুর্বর্ণের ব্যাখ্যা : শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাছে কর্তব্যের আবেদনের মাধ্যমে মানব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় সমাজে গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে চতুর্বর্ণের অস্তিত্ব ছিল । এ চতুবর্ণ হচ্ছে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, শূদ্র ও বৈশ্য
ক. চতুর্বর্ণের গুণ : ব্রাহ্মণদের মধ্যে সত্ত্বগুণের প্রাধান্য থাকে। ক্ষত্রিয়দের উপর রজঃগুণের প্রাধান্য থাকে।বৈশ্যদের ক্ষেত্রেও রজঃগুণের প্রাধান্য থাকে। তবে এদের ক্ষেত্রে রজঃগুণ তমঃগুণের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। শূদ্রদের মধ্যে তমঃগুণের প্রাধান্য বেশি। এদের ক্ষেত্রে তমঃগুণ রজঃগুণের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে।
খ. কর্তব্য নির্দিষ্টকরণ : প্রত্যেক মানুষ গুণগত দিক থেকে সমান নয়। তাই গুণের ভিন্নতার কারণে মানুষের কর্মেরও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। গুণের ভিন্নতার প্রেক্ষিতেই প্রত্যেক মানুষের জন্য কর্তব্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। গীতার মতে, প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত কর্তব্য পালনের মাধ্যমে ব্যক্তিক ও সামাজিক কল্যাণ
সাধিত হয়। আর এর ব্যত্যয় ঘটলেই সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
গ. ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের নির্ধারিত কর্ম : ব্রাহ্মণের জন্য নির্ধারিত কর্তব্য হচ্ছে তারা দেহ ও মনের সংযমের মাধ্যমে পবিত্র জীবনযাপন করবে। তাঁরা হবে সবার চেয়ে জ্ঞানী এবং বিশ্বস্ত । ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকারী যিনি হবেন তিনিই ব্রাহ্মণ । ক্ষত্রিয়রা হচ্ছেন যোদ্ধা। তাঁরা দৃঢ় মনোবলের অধিকারী। দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করাই হবে তাঁদের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা জীবনের প্রতি কোনো মায়া করতে পারবে না।
ঘ. বৈশ্য ও শূদ্রের কর্তব্য : বৈশ্যরা পশুপালন ও উৎপাদন কাজে নিয়োজিত থাকবে এবং ব্যবসায় বাণিজ্য পরিচালনা করবে। আর উচ্চবর্ণের সকল শ্রেণির সেবা করা হচ্ছে শূদ্রের কাজ। গীতার মতে, প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত কর্তব্য পালনের মাধ্যমে মানুষ পূর্ণতা পায়।
৫. কর্তব্যের দৃঢ়তা : অর্জুন বর্ণে ক্ষত্রিয় ছিলেন বলেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রধারণ তাঁর পক্ষে ছিল অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য। কিন্তু অর্জুন যখন তাঁর কর্তব্য কর্ম নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বলেছেন, “তুমি যদি ধর্মযুদ্ধে ব্রতী না হও, তাহলে কর্তব্য ভ্রষ্ট হবে, তোমার কীর্তি নষ্ট হবে, যারা তোমাকে বীর জ্ঞানে সম্মান করত, তারা তোমাকে ধিক্কার দিবে।” অর্জুনকে যুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাছে এমন আবেদন জানালেন, যা গীতাকে বিশ্ববাসীর কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
৬. কর্মের বিশ্লেষণ : কর্মের বিশ্লেষণে শ্রীকৃষ্ণ কর্মকে সকাম এবং নিষ্কাম কর্ম এ দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন। সকাম কর্মে উদ্দেশ্য, অহংবোধ, কাম, ক্রোধ, হিংসা, লোভ ও আত্মতৃপ্তির ইঙ্গিত থাকে বলে এ জাতীয় কর্ম বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিষ্কাম কর্ম হলো যোগীর কর্ম, আদর্শের কর্ম, যা মানুষকে মোক্ষের পথে নিয়ে যায়।
৭. কর্মের মূলকথা : গীতায় প্রচারিত কর্মযোগের মূলকথা হচ্ছে ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে যার যার নির্ধারিত কর্ম করে যাওয়া। ব্যক্তির আমিত্ববোধকে বিসর্জন দিয়ে কামনাহীনভাবে কাজ করে যাওয়াই গীতার মূল শিক্ষা। যিনি শোকে উদ্বিগ্ন হন না, আবার সুখেও যার মোহ নেই, গীতায় তাকে ‘স্থিতধী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ স্থিতধী ব্যক্তিরাই সকল চেতনার আদর্শ।
৮. কর্ম ও জ্ঞানের সমন্বয় : শ্রীকৃষ্ণ কর্ম ও জ্ঞানের বিরোধকে নিরসন করে এ দু’য়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন। এ মায়াময় সংসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যারা আপন কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অজ্ঞানতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে শ্রীকৃষ্ণ তাদেরকে স্বধর্ম পালনের মধ্য দিয়ে সঠিক পথে আসার উপদেশ দিয়েছেন।
৯. ভক্তিযোগের ব্যাখ্যা : গীতায় কর্মযোগের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হলেও জ্ঞানযোগ এবং ভক্তিযোগকেও অস্বীকার করা হয় নি। শ্রীকৃষ্ণ এ তিনটি পথের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন। তাই গীতার নৈতিকতা সমন্বয়ের নৈতিকতা,গীতার আদর্শ সমন্বয়ের আদর্শ এবং এ সমন্বয়কেই গীতায় শ্রেষ্ঠ পথ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাই গীতার শিক্ষা মানবজাতির জন্য সকল শিক্ষার সেরা শিক্ষা।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার শেষে বলা যায় যে, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ ও জ্ঞানযোগের সমন্বয়ই গীতা।গীতায় চতুর্বর্ণের উদ্ভব, বিকাশ এবং মানুষের কর্তব্য সম্পর্কে বিশদভাবে উল্লেখ রয়েছে। এসব বিষয় বাঙালি দর্শন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। তাই বলা যায়, বাঙালি দর্শনে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রভাব অপরিসীম ।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!