ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীদের অবদান সম্পর্কে আলোচনা কর।

অথবা, স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীদের কার্যক্রম আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
অথবা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান বর্ণনা কর।
উত্তর ভূমিকা :
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনায় নারীর গৌরবৌজ্জ্বল ভূমিকা খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, গেরিলা নেত্রী ও সহযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীরা একদিকে যেমন আহতদের সেবা করেছেন, মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, ধর্ষিতা হয়েছেন। অপরদিকে গোপনে অস্ত্র বহন করেছেন, গেরিলা ট্রেনিংসহ অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেছে, যুদ্ধে আহত হয়েছেন, অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন । মুক্তিযুদ্ধে তাঁরা সাহস, কৃতিত্ব ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান : ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান অসামান্য ও অতুলনীয়। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো :
ক. প্রবাসী সরকারের নারী : পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ জনগণের উপর পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫ মার্চের কালো রাত্রির হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান পরিবর্তিত হয় এবং জাতির এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ রণকৌশল নির্ধারণের জন্য একত্রিত হতে চেষ্টা করেন এবং তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ এর ১০ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্ধারিত সদস্যদের সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদনাথ তলায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। এই অনুষ্ঠানে সারা দেশের নারী সমাজের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন বেগম নাজিরা ইসলাম। এছাড়া প্রশাসনিক কাঠামোতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তার শাখাগুলোতে যেসব নারী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- অর্থ মন্ত্রণালয়ে মধুরানী সাহা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ডা. তাহেরা খাতুন, আক্তার জেবিন প্রমুখ। প্রবাসী সরকারকে সহযোগিতার জন্য ১০ জুলাই আগরতলায় ১০ সদস্য বিশিষ্ট আওয়ামী মহিলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হয়। এই কমিটির সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদিকা, সাংগঠনিক সম্পাদিকা, কোষাধ্যক্ষ, নির্বাহী সদস্য সবাই ছিলেন নারী এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল নাসিং প্রশিক্ষণ, গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, হাসপাতাল পর্যবেক্ষণ, রিলিফ ওয়ার্ড এবং মাতৃ ও শিশু কল্যাণ নিশ্চিত করা। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের নারীদের অবদান ছিল অনন্য।
খ. অস্ত্রহাতে প্রশিক্ষণ : নারী সমাজের সদস্য প্রাণশক্তিকে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত করার জন্য তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, ত্রাণমন্ত্রী কামরুজ্জামান হেনা ও জাতীয় পরিষদ সদস্য সাজেদা চৌধুরীর প্রচেষ্টায় মুক্তিযোদ্ধা নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নারী মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নেন এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আবার কেউ সেবার কাজে নিয়োজিত হন, কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিল সংগ্রহে ভূমিকা পালন করেন, কেউ জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। এভাবে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
গ. প্রত্যক্ষ যুদ্ধে নারীর ভূমিকা : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সকল নারী প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন খালেদা খানম, তারামন বিবি, রিজিয়া চৌধুরী, মমতাজ বেগম প্রমুখ। এঁদের মধ্যে খালেদা খানম মাদারিপুর ও শরিয়তপুর এলাকায় কাজ করেন। তিনি নিজে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সাথে সাথে মেয়েদেরও যুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ছিল স্থানীয় কয়েকজন নেতার সাথে থানা আক্রমণ। এছাড়াও যেসকল নারী মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলেন বিথিকা ও শিশির। তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অপারেশন হলো পাকিস্তানি বাহিনীর লঞ্চে আক্রমণ। তাঁরা জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে সাঁতার কেটে কচুরীপানার মধ্যে থেকে লঞ্চের কাছে গিয়ে গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। অপরদিকে তাঁরামন বিবি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম । দিনরাত যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে নাড়াচাড়া ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেরণা জাগায়। অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে সরাসরি কয়েকটি যুদ্ধে তিনি সশস্ত্র অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট চরনেওয়াজী স্কুলের নিকট পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি যুদ্ধে তিনি সাহসিকতার সাথে অংশ নিয়ে ব্যাপক অবদান রাখেন।
ঘ. মুক্তিযুদ্ধে আশ্রয়দাত্রী ও অস্ত্রশস্ত্র সংরক্ষণকারী রূপে নারীরা : মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান ও তাদের অস্ত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নারী সমাজ অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেন। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজের শোবার ঘরে, বাথরুমে গোসলখানায় লুকিয়ে রেখে পাক সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করেন। কখনো কখনো মুক্তিযোদ্ধাকে স্বামী/নিকট আত্মীয় বলে পরিচয় দিয়ে ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা করছেন। তাদের মুখে খাবার তুলে দিয়ে নিজেরা অভুক্ত থেকেছেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের রেখে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র চালের পাত্রে, মুরগির খোঁয়াড়ে, বিছানার নিচে, মাটির নিচে, আলমারিতে লুকিয়ে রাখতেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট তুলে দিতেন। এভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীরা অবদান রেখেছেন।
ঙ. সেবা প্রদানে নারী : মুক্তিযুদ্ধের সময় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা প্রদান করে নারীরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের তাৎক্ষণিক সেবা প্রদান করার জন্য ‘বাংলাদেশ ফোর্সেস হাসপাতাল’ নামে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়। এখানে মহিলা ডাক্তারদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নারীরা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা প্রদান করেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
চ. তথ্য আদান-প্রদানে নারীদের ভূমিকা : মুক্তিযুদ্ধের সময় তথ্যের আদান-প্রদান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং কাজটি ঝুঁকিপূর্ণও বটে। এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অনেক সাহসী নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গোপনে লিফলেট, পত্রিকা ছাপানো, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছানো ছিল জরুরি। এসব ছাপানো ও বিতরণের কাজ পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বুদ্ধিজীবীদের চিঠিপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেয়ার কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন নারীরা
ছ. কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনে নারী : মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী বাঙালি নারী সাজ ও দেশি- বিদেশি নারী সংগঠনের নেত্রীকর্মীরা এগিয়ে এসেছিলেন। ১৯৭১ সালে ভারতের নারী ফেডারেশনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদিকা মালেকা বেগম, মতিয়া চৌধুরী, মমতাজ বেগম (কসবা) মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, নারী-নির্যাতন, পাশবিকতা ইত্যাদি বিষয়ে সারা ভারতে প্রচার আন্দোলন করেছিলেন। এভাবে নারীসমাজে মুক্তিযুদ্ধে অতুলনীয় অবদান রাখেন।
জ. স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে নারীদের ভূমিকা : মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনগণের অন্যতম প্রেরণার উৎস ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে আস্থা অর্জন করেছিল এবং এর সাথে সংশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ শব্দ সৈনিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। বেতার কেন্দ্র সংবাদ পাঠিকা, লেখিকা, সংগীত শিল্পী
হিসেবে বিশিষ্ট মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিরদি মুভি-শার অনুপ্রেরণা যোগাতেন। এভাবে তারা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন।
ঝ. গেরিলা যুদ্ধে নারী : মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনাদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিহত করার জন্য যে গেরিলা বাহিনী ঠন করা হয় সেখানে নারীরা অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারী-পুরুষ এক সাথে অংশ নিয়েছিল। পুরুষের সহযোদ্ধা হিসেবে নারীর ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহস, নির্ভীকতা বাংলাদেশে স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হার দখল করে আছে। নারীরা শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন নি তাঁরা সকল যোদ্ধাদের পরম মমতায় আগলে রেখেছেন, সাহস যুগিয়েছেন। নিজেদের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশি নারীরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং এভাবেই অতুলনীয় অবদান রেখেছেন।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!