Answer

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘নয়নচারা’ গল্পের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নিজের ভাষায় লেখ।

অথবা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ বিরচিত ‘নয়নচারা’ গল্পের বিষয়বস্তু নিজের ভাষায় লেখ।
উত্তর৷ ভূমিকা :
ত্রিশোত্তর বাংলা সাহিত্যে যেসব মুসলিম সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্যচর্চায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের স্বাক্ষর রেখেছেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি সমকালীন নগ্ন বাস্তবতাকে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর গল্প-উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন। দুর্যোগ কবলিত বাংলাদেশের বানভাসি মানুষদের যন্ত্রণাকাতর খণ্ডচিত্র নিয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ‘নয়নচারা’ গল্পটি লিখেছেন। গল্পের কাহিনিতে গ্রামবাংলার সহজসরল মানুষের আচরণ এবং শহুরে মানুষের মানসিকতার মধ্যে যে
বৈপরীত্য বিদ্যমান তা তিনি নগ্নভাবে প্রদর্শন করেছেন।
নয়নচারা’র কাহিনি : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বিরচিত ‘নয়নচারা’ গল্পে মূলত তেমন কোন কাহিনি নেই। এটি একটি বক্তব্যপ্রধান গল্প। ময়ূরাক্ষী নদী তীরের একদল বন্যাপীড়িত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে শহরের ফুটপাতে। আকাশের ছাদের নিচে তারা অভুক্ত অবস্থায় রাত কাটায়। সারাদিন এরা শহরের মানুষের দ্বারে দ্বারে, দোকানে দোকানে একমুঠো খাবারের জন্য হন্যে হয়ে ঘোরে। কিন্তু খাবার তাদের ভাগ্যে জোটে না। শহরের মানুষেরা এদেরকে দূর দূর করে তাড়ায়। এ বানভাসি মানুষদের একজন আমু। ময়ূরাক্ষী নদী তীরের নয়নচারা গ্রামে তার বাড়ি। বন্যায় সব তলিয়ে যাওয়ায় আমু অন্যান্যদের সাথে শহরে এসেছে। শহরে এসে আমু এখানকার মানুষদের যে পরিচয় পেয়েছে তা-ই ‘নয়নচারা’ গল্পের কাহিনির মূল উপজীব্য।
ছিন্নমূল গ্রামের মানুষ : আটষট্টি হাজার গ্রাম অধ্যুষিত বাংলাদেশে শতকরা আশি ভাগ মানুষের বাস গ্রামে। এসব গ্রাম মাঝেমাঝেই দুর্যোগ কবলিত হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে এ দেশের কোন না কোন অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। ‘নয়নচারা’ গল্পে ময়ূরাক্ষী নদী তীরের গ্রামসমূহ বন্যা কবলিত হওয়ায় এখানকার মানুষ শহরে গিয়েছে আশ্রয়ের জন্য। বন্যার কারণে ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছে বলে এরা পরিণত হয়েছে ছিন্নমূল উদ্বাস্তুতে। গ্রামের এ ছিন্নমূল মানুষদের দুর্দশার অন্ত থাকে না। গল্পকার এ গল্পে চিরন্তন বাংলার নিত্যনৈমিত্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার অসহায় মানুষদের দুঃখকষ্টের কাহিনি বর্ণনা করেছেন। ছিন্নমূল এসব মানুষের জন্মই যেন
আজন্ম পাপ । এদেরকে দেখার, পরিচর্যা করার কেউ কোথাও নেই।
উদ্বাস্তুদের দুর্বহ জীবন : গ্রামের এ উদ্বাস্তু মানুষগুলোর জীবন সহজসরল ক্যানভাসে প্রতিভাত। জীবনের জটিলতা সম্পর্কে এদের কোন ধারণা নেই। কিন্তু শহরে আসার পর এরা বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এখানকার মানুষগুলো তাদের কাছে একান্তই অপরিচিত। এ অপরিচিত জগতে এসে উদ্বাস্তুদের জীবন দুর্বহ হয়ে উঠেছে। শহরের প্রতিটা মানুষ এদেরকে ঘৃণা করে। এদের কারও চোখে মমতা নেই। এখানে মানুষের চোখে বৈরিতা। প্রাণ খুলে কেউ কথা বলতে পারে না যেন। নয়নচারা গ্রামের মানুষ এমন নয়। তাদের প্রাণ আছে, প্রাণ খুলে হাসতে পারে তারা। তাই শহরের এ বৈরী পরিবেশে এসে নিজের জীবনকে দুর্বহ বোঝা বলে মনে হয়। এ জীবনের ভার বইতে বইতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, অস্থির হয়ে ওঠে।
শহরের পরিবেশ : দিনের বেলায় শহরে অসহ্য রোদ। ছায়া নেই কোথাও, কোমল ঘাসের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। এটা কি রকম কথা, ভেবে পায় না গ্রামের এ হতভাগ্য মানুষগুলো। অসংখ্য হৃদয়হীন ইট-পাথরের বাড়ি দেখে তারা ভাবে এর মধ্যে মানুষ থাকে কি করে। অদ্ভুত চাঞ্চল্যময় অসংখ্য মানুষ। এদের কালো কালো মাথাগুলো মিলে কালো রঙের সাগর তৈরি করেছে। এর সাথে তুলনা চলে ময়ূরাক্ষী পাড়ের হাওয়ায় দোলানো দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেতের। তবু এদের মধ্যে তফাত অনেক। এখানে প্রাণের চিহ্ন নেই, ওখানে অফুরন্ত প্রাণের ছড়াছড়ি। শহরের শুষ্কতা, হিংস্রতা, হৃদয়হীনতা খুঁজে পাওয়া যাবে না ময়ূরাক্ষী তীরে।
মানুষের চোখে বৈরিতা : ছিন্নমূল মানুষগুলো একটা বিষয় দেখে বিস্মিত হয়। শহরের কুকুরগুলোর চোখে বৈরিতা নেই। এরা তাদেরকে দেখে তেড়ে আসে না। রাতের বেলা তাদের আশেপাশেই কুকুরগুলো অবস্থান করলেও এরা শত্রুতা করে না। অথচ দিনের বেলায় যে মানুষগুলোর কাছে সাহায্যের জন্য উদ্বাস্তুরা যায় তারা কুকুরের মতো তেড়ে আসে। শহরের এ মানুষদের চোখে বৈরিতার শেষ নেই। এমনি বৈরিতা তারা দেখেছে গ্রামের কুকুরদের চোখে। এখানকার মানুষগুলোকে তাদের গ্রামের কুকুরের মতো হিংস্র মনে হয়। তাদের অন্তরে দয়া নেই, মায়া নেই, মমতা নেই। এ অমানবিক অবস্থা দেখে আমু এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, গ্রামের কুকুর আর শহরের মানুষদের স্বভাব-চরিত্র এক। আর গ্রামের মানুষ এবং শহরের কুকুরের মধ্যে বৈরিতা নেই। এরা শান্তিপ্রিয় ।
মূল প্রতিপাদ্য বিষয় : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘নয়নচারা’ গল্পের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় বাংলার জনমানসের ভিন্নতা। এদেশে দুই শ্রেণির মানুষ বাস করে- এক শ্রেণি বাস করে গ্রামে আর এক শ্রেণি বাস করে শহরে। উভয় শ্রেণির মনমানসে আকাশ-পাতাল ভিন্নতা বিদ্যমান। গ্রামের বিত্তহীন ও নিম্নবিত্ত মানুষগুলো একেবারেই সহজসরল। কোমল মাটিতে খোলা প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় তারা বেড়ে ওঠে। তাদের জীবনে জটিলতার স্থান নেই। হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে তারা সবকিছুকে বিচার করে থাকে। অন্যদিকে শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষেরা হৃদয়হীন পাথরের মতো। শুকনো ইট-পাথরের বদ্ধ পরিবেশে বাস করে তাদের হৃদয়ের উষ্ণতা লোপ পেয়েছে। মানুষের প্রতি তাদের মমতা নেই। তারা এক জটিল জীবন আবর্তে বন্দী। উদ্বাস্তু আমু যখন এ নিষ্ঠুরতার শিকার তখন এক করুণাময়ী গৃহবধূর মমতা তাকে বিস্মিত করেছে। সে ভাবতে বাধ্য হয়েছে যে এ মেয়ে শহরের মেয়ে নয়, নিশ্চয়ই এর মায়ের বাড়ি নয়নচারা গ্রামে । আমুর এ ভাবনাই গল্পের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়কে স্পষ্ট করে তুলেছে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ‘নয়নচারা’ গল্পে গ্রাম্য জীবন ও শহুরে জীবনের তুলনামূলক চিত্রটির শিল্পিত রূপ প্রতিভাত হয়েছে। ছিন্নমূল একদল বানভাসি মানুষকে শহরে নিয়ে এসে গল্পকার গ্রাম ও শহরের ভিন্নতাকে স্পষ্ট করে তুলেছেন । বাংলাদেশের জনমানসের এ ভিন্নতাই নয়নচারা গল্পের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!