Answer

সাম্প্রতিক নারী মুক্তি আন্দোলন এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ মূল্যায়ন কর।

অথবা, বিভিন্ন ধর্মে নারীর অবস্থা উল্লেখ কর। ইসলাম ধর্মে নারীর অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে যা জান লিখ।
অথবা, বিভিন্ন ধর্মে নারীর অবস্থা বর্ণনা দাও। ইসলাম ধর্মে নারীর কী কী অধিকার ও মর্যাদা
প্রদান করা হয়েছে? আলোচনা কর।
উত্তর৷৷ ভূমিকা :
যে যুগে কোন সমাজব্যবস্থায়, কোন সম্প্রদায়ে, বধূ, মাতা, ভগ্নি তথা নারীসমাজের কোন অধিকার ছিল না, যে দেশে কন্যার জন্মলাভ ভাগ্যহীনা, কুলক্ষ্মী, অপমানের কারণ বলে গণ্য করা হতো, সে যুগে, সে দেশে জন্মগ্রহণ করে তিনি নারীসমাজকে যথাযথ অধিকার দান করেছিলেন আর তা এমন অধিকার, যা বিংশ শতাব্দীর সভ্য সমাজে অনিচ্ছুক পুরুষের কাছ থেকে জোর করে আদায় করা হয়। তিনি মানবতার কৃতজ্ঞতাভাজন হযরত মুহাম্মদ (স)। যদি আর কিছুই না করতেন, তবু শুধু এ জন্যেই মানুষের কল্যাণসাধনকারীরূপে তাঁর দাবি হতো অবিসংবাদী। হযরত আলী (রা) পুণ্যবতী নারীকে ইহকালীন কল্যাণ ‘হাসানাতুত দুনিয়া’ বলেছেন।
বিভিন্ন ধর্মে নারীর অবস্থা : নিম্নে বিভিন্ন ধর্মে নারীর অবস্থা বর্ণনা করা হল :ইসলাম ধর্মে নারীর অবস্থা : পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে নারীর ক্ষেত্রে ইসলাম কতটুকু অবদান রেখেছে, তা আলোচনা করা হল :
১.এ সম্পত্তি আর এর সকল সম্পদ খুব মূল্যবান; কিন্তু সর্বাপেক্ষা মূল্যবান হল পুণ্যবতী নারী ।
২. তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রীর প্রতি সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার করে, তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ।
৩.জননীর চরণতলে বেহেশত। মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে নারী-পুরুষ উভয়ই সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সমাজ গঠনে নারীর চিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে বিশ্ব বরেণ্য মহাকবি আল্লামা ইকবাল লবলেছেন; “পৃথিবীর তাসবীরকে রঙ্গিন করেছে নারীজীবন চিত্তের উষ্ণতা তারই সেকালের ধ্বনি।” তাই ইসলাম “নারীকে প্রথম দিয়াছি মুক্তি নরসম অধিকার,মানুষের গড়া প্রাচীর ভাঙ্গিয়া করিয়াছি একাকার।
৪.নারীর অধিকারসমূহ পবিত্র।
কিন্তু অজ্ঞতার যুগে এ মহিয়ান নারীর কোন সামাজিক মর্যাদা ছিল না। তারা নিতান্তই ভোগের সামগ্রী হিসেবে পরিগণিত হতো। ইসলামই সর্বপ্রথম নারীদের উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে সমাজে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
খ্রিস্টধর্মে নারীর অবস্থা : খ্রিস্টীয় রোমান সভ্যতার স্বর্ণযুগেও নারীদের অলক্ষ্মী, অপয়া মনে করা হতো। কুৎসিত পাপ নিয়ে নারীরা পুরুষের জীবনকে বিষময় করে তোলে। তারা মনে করতো, নারী একটা অনিবার্য পাপ, নরকের দ্বার, বিষধর সর্প, একটা জন্মগত দুষ্ট প্ররোচনা, আনন্দদায়ক প্রেমদায়িনী, একটা পারিবারিক আশংকা। নারীদের আত্মা আছে
কি না তারা তাতে সংশয় প্রকাশ করত।
হিন্দুধর্মে নারীর অবস্থা : হিন্দুধর্মে নারীরা চরম অলক্ষ্মী, অপয়া হিসেবে বিবেচিত হতো। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর সতীদাহের মাধ্যমে মরা ছিল তাদের জীবনের শেষ পরিণতি। সতীদাহ প্রথা রহিত হয়ে যাওয়ার পর তাদের ভাষায়, নারীর বাল্যে পিতা, যৌবনে পতি এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীন। তবে হিন্দুধর্মে নারীর বহুবিবাহের আইন চালু রয়েছে।
বৌদ্ধধর্মে নারীর অবস্থা : বৌদ্ধধর্মেও নারীদেরকে ভোগের উপকরণ মনে করা হয়।
ইসলাম ধর্মে নারীর অধিকার ও মর্যাদা : নারী জাতিকে এসব দুর্দশা ও হীন অবস্থা থেকে মুক্ত করে সমাজের বুকে তাদের যথোপযুক্ত মান মর্যাদা, অস্তিত্ব, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম ধর্ম সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে। নারী জাতির সার্বিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম কি ধরনের ভূমিকা পালন করেছে, নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত
আলোচনা করা হল :
১. মা হিসেবে নারীর মর্যাদা : ইসলাম মা হিসেবে নারী জাতিকে যে সম্মান ও মর্যাদার আসন দিয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোন ধর্ম এবং সমাজব্যবস্থা তা করতে পারেনি। আল্লাহ পাক তাঁর আনুগত্যের পরই মায়ের প্রতি ইহসান ও আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর ইবাদত করা, শিরক না করা এবং মাতাপিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা একজন মুমিনের পক্ষে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও কোনকিছুকে তার শরীক করো না এবং পিতামাতার প্রতি সদাচরণ কর। (সূরা নিসাঃ আয়াত ৩৬)। সন্তানের প্রতি মাতাপিতার অপরিসীম হে, বাৎসল্য ও ত্যাগ বিশেষত মাতার দুঃসহ যাতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “আমি তো
মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি।” জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে। সুতরাং, আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। (সূরা লুকমান : আয়াত ১৪) সন্তানের প্রতি মায়ের অধিকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে নবী (স) বলেছেন, উভয়জ (পিতামাতা) তোমার বেহেশত ও দোজখ । অপর একখানা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “মায়ের চরণতলে সন্তানের বেহেশত।” প্রত্যেক মা একাধারে গর্ভধারিণী, স্তন্যদানকারী, প্রতিপালনকারিণী, সেবিকা, শিক্ষিকা, অভিভাবিকা ইত্যাদি বহুমুখী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বলে ইসলাম কোন কোন ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দান করে সম্মানিত করেছে। হাদিসে আছে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার সদাচরণ পাওয়ার সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত কে? প্রতি উত্তরে নবী (স) বলেছেন, তোমার জননী। অতপর লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তখনও নবী (স) বললেন, তোমার জননী। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? নবী (স) প্রতি উত্তরে বললেন, তোমার পিতা। (মিশকাত শরীফ- কিতাবুল আদাব) । উল্লিখিত হাদিসে মাতাকে পিতার উপর তিনগুণ শ্রেষ্ঠত্ব দান করে ইসলাম নারী জাতির মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।
২. শিক্ষিকা হিসেবে নারীর মর্যাদা : সন্তানের শিক্ষার ভিত্তিমূল স্থাপনের দায়িত্ব মাতার। স্কুলপূর্ব বয়সসীমা পর্যন্ত শিশু মাতার একান্ত সান্নিধ্যে থাকে। মায়ের নিকট সে সর্বপ্রথম ভাবের আদানপ্রদান করতে, মান অভিমান প্রকাশ করতে, কথা বলতে মার অনুকরণ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে মা-ই তার একমাত্র শিক্ষকা। তাই বলা হয়ে থাকে “A good mother is better than hundred teachers.”
৩. আদর্শ জাতি গঠনে নারী : আদর্শ জাতি গঠনের ক্ষেত্রে আদর্শ নারীর ভূমিকা অপরিসীম। এ সম্পর্কে নেপোলিয়ন বলেছেন,
“Give me a good mother,
I shall give you a good nation.”
মহানবী (স) তার দুধমা হালিমা সা’দিয়াকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন। তাকে দেখা মাত্রই মা-মা বলে নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে বসতে দিতেন। তিনি মাতাপিতার মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছামতো সকল পাপই ক্ষমা করে থাকেন, কিন্তু পিতামাতার অবাধ্যজনিত পাপ ক্ষমা করবেন না।” কেননা “তিনি পিতামাতার অবাধ্য ব্যক্তিকে। মৃত্যুর পূর্বে দুনিয়াতেই শাস্তি দেয়ার জন্য তাড়াতাড়ি করে থাকেন।” যে কোমল হাত দোলনা চালায়, সে দোলনা হাত সন্তুন লালনপালনের মাধ্যমে জাতি গঠন করে।
৪. স্ত্রী হিসেবে নারী : পারিবারিক জীবনে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের ভূমিকাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজনকে ছাড়া আরেক সুতরাং, স্বামী স্ত্রীকে তার জীবনের প্রিয়তম বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে এবং সুখশান্তি ও আনন্দে সম অধিকার দান করবে। জন অসম্পূর্ণ। ইসলাম তাই নারীকে নরের সমান মর্যাদা দান করেছে। স্ত্রী স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী, জীবনসঙ্গিনী ও সহধর্মিণী
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কালামে পাকে ইরশাদ করেন, তারা (নারীরা) তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ [সূরা ২ বাকারা : আয়াত ১৮৭]
৫. গৃহের শাসক হিসেবে নারী : পুরুষ যেমন বহির্জগতের ক্রিয়াকর্মের শাসক, নারী তেমনি গৃহের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে শাসক। এ প্রসঙ্গে মহানবী (স) বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম এবং আমি আমার পরিবারের নিকট সর্বোত্তম।”
বিজ্ঞজনের উল্লেখযোগ্য বাণীসমূহ “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। “কষ্ট করে বড় হয়ে পরের ঘরে যেতে হয় কি নারীর বড় শক্ত কাজ পরকে আপন করতে হয়।”
৬. চারিত্রিক সনদ দানকারী হিসেবে নারী : ইসলাম নারীকে পুরুষের চারিত্রিক সার্টিফিকেট দানকারী হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। বিদায় হজ্জের ভাষণে মহানবী (স) নারীকে আল্লাহর আমানত হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, “তোমরা স্ত্রীর অধিকার প্রদানের বিষয়ে খোদাভীরুতা অর্জন কর। কেননা, আল্লাহর আমানত হিসেবে তাদের তোমরা স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর বাণী উচ্চারণের মাধ্যমে তাদের ভোগ করার অধিকার বৈধ করে নিয়েছো।”
৭, কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা : কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদাগুলো নিম্নে আলোচনা করা হল :
ক. কন্যা হত্যার চিরাবসান : অজ্ঞতার যুগে আরব দেশে কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো। কন্যা হত্যা চিরতরে রোধকল্পে মানবতাবাদী মহানবী (স) একদিকে ভীতি, অন্যদিকে সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন, “যে কন্যা সন্তানকে হত্যা করবে, সে চির জাহান্নামী হবে। পক্ষান্তরে, যে সন্তুষ্ট চিত্তে কন্যাকে আদর যত্ন করে প্রতিপালন করবে, সে চির জান্নাতী হবে।”
খ. কন্যাকে গ্লানি হতে মুক্তি দান : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, “দারিদ্র্যের জন্য তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি।” মহানবী (স) বলেছেন, “তোমার কন্যা যখন তোমার কাছে ফিরে আসে এবং তুমি ছাড়া তার আর কোন উপার্জনকারী না থাকে, তাকে ভরণপোষণ করাই তোমার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সদকা।”
৮. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী : দৈনন্দিন জীবনে অর্থ সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় জিনিস। অর্থ মানুষের আত্মচেতনা ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলে। ইসলাম পিতা, স্বামী, পুত্র ও আত্মীয়স্বজনের সম্পত্তিতে নারীর সুনির্দিষ্ট অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। স্ত্রী হিসেবে একজন নারী তার সংসারের সীমিত ক্ষুদ্র রাজ্যের কর্ত্রী। স্বামীর সম্পত্তিতে তার অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃত। এ সম্পর্কে Shaikh M. H. Kidwid of Gadia তাঁর “Women under different social and religious laws” গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, “No Christian or western system or law gives a mother any legal claim on the son’s property.”
৯. ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নারী : ইসলাম নারী জাতিকে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা প্রদান করেছে। নারীর পরিশ্রমে উৎপন্ন অর্থে একমাত্র তারই অধিকার থাকবে। তবে সে ইচ্ছা করলে তার স্বামীকেও দিতে পারে।
১০. প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নারী : ইসলাম আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীকে সমান অধিকার প্রদান করেছে। ইমাম আবু হানিফা (রা) এর মতে, স্বীকৃত যোগ্যতার ভিত্তিতে নারীকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ করা যেতে পারে। ভারত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ফাতিমা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । ইসলাম নারীকে প্রশাসনিক কাজেও নিয়োগ করার অধিকার ও মর্যাদ দিয়েছে। কেননা, নারী সম্বন্ধে তথ্য উদ্ঘাটন, নারী অপরাধীদের গ্রেফতার, তল্লাশি ইত্যাদির জন্য নারীর প্রয়োজন। তাই প্রশাসনিক কাজে নারী নিয়োগ করা যেতে পারে।
১১. শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা : ইসলাম নারীকে শুধু পুরুষের সমমানের জ্ঞানার্জন করতে বলেই ক্ষান্ত হয়নি। বর জ্ঞানার্জনের জন্য বাধ্যতা আরোপ করে বলা হয়েছে, “প্রত্যেক নরনারীর উপর বিদ্যা অর্জন করা ফরজ।” জননীর শিক্ষা ছাড়া সন্তানের সার্বিক উন্নতি অসম্ভব। শিক্ষার বলেই যুগে যুগে বহুক্ষেত্রে বহু নারীকে পুরুষের চেয়ে অধিক মর্যাদাবান বলে ইসলাম ঘোষণা করেছে। অনেক সাহাবী ও তাবেয়ী হযরত আয়েশা (রা) এর কাছ হতে হাদিস, তাফসীর, ফিকহ শিক্ষ গ্রহণ করতে আসতেন। তাঁরই আদর্শ অনুসরণ করে আজকের নারীরা জ্ঞানবিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য, চিকিৎসা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছেন। মহানবী (স) শুধুমাত্র স্বাধীন নারীর শিক্ষার ব্যাপারেই নয়, দাসী নারীর শিক্ষার ব্যাপারেও তিনি বলেছেন, যার নিকট কোন দাসী থাকে এবং যদি সে তাকে ভালোভাবে বিদ্যা, আদবকায়দা, শালীনতা শিক্ষা দেয়, অতপর তাকে মুক্ত করে বিয়ে করে, তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে।
১২. বৈবাহিক ক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা : ইসলাম নারীকে তার স্বামী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেছে। শান্তিশৃঙ্খলার জন্য অভিভাবকের অনুমতি নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু কোন প্রাপ্তবয়স্ক জ্ঞানী মেয়েকে বিয়ে দেয়ার সময় তার উপর কোন প্রকার জোর খাটাতে পারবে না। যেমন হুজুর (স) বলেছেন “বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবক অপেক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের মতামতের গুরুত্বই বেশি।
ক. তালাকে নারীর অধিকার : মানুষের জীবন সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় করাই বিবাহের উদ্দেশ্য। কিন্তু ঘটনাচক্রে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব না হয় এবং এ অবস্থায় যদি বিবাহবিচ্ছেদের কোন ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জীবনেই অশান্তি নেমে আসা স্বাভাবিক। তাই ইসলামে তালাকের মাধ্যমে এ অশান্তিময় দাম্পত্জী বনের অবসান ঘটানোর ব্যবস্থা আছে। ইসলামি অনুশাসন অনুযায়ী পুরুষের ন্যায় নারীও তার স্বামীকে তালাক প্রদান করতে পারে।
খ. স্বামীর বহুবিবাহে স্ত্রীর অনুমতি : ইসলাম পুরুষকে চার বিবাহ করার অনুমতি দিয়েছে। তবে এখানেও বিশেষ শর্ত আছে। এভাবেই ইসলাম বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী জাতির মর্যাদা সংরক্ষণ করেছে।
গ. বিধবা নারীর মর্যাদা : পবিত্র কুরআনের বিধান অনুযায়ী মুসলিম বিধবা নারীগণ স্বামীর সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশের অধিকারী হয়। প্রয়োজনে বিধবাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে ইসলাম নারী জাতির চাওয়া পাওয়ার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৩. নারীর সম্মানিত আসন : পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত দেশে আজ নারী যে সম্মানজনক আসন লাভ করেছে, ইসলামের ইতিহাসে প্রথম কয়েক শতাব্দীতে প্রায় সারা সিনীয় সাম্রাজ্যের পতনের সময় পর্যন্ত নারী সে সম্মানিত আসন লাভ করে আসছে। মহানবী (স) এর পরিবারের রমণীগণ বিদ্যা, সদগুণ ও চরিত্রবলের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। ইসলামের সুবৃহৎ উদ্যানের সাথে তাঁরা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। হাদিসের জ্ঞানে হযরত আয়েশা, বিদ্যা চর্চায় ও করুণা প্রকাশ হযরত ফাতিমা (রা) এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তার জন্য বিবি খাদিজার নাম স্মরণীয়। বাদশাহ হারুন-অর-রশিদের বেগম জুবায়দা এবং মামুনের ভগ্নি উম্মুল ফজল ও কন্যা উম্মুল হাবিবও পাণ্ডিত্যের জন্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন। একজন আধুনিক লেখক যথার্থ মন্তব্য করেছেন :
“সভ্যতার ভবিষ্যৎ শক্তিকেন্দ্র নিহিত থাকবে নারীর মধ্যে- জাতির যুদ্ধরত পুরুষের তা সাধ্য নয়। “নারী পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী। যতদিন মানুষ পৃথিবীতে বসবাস করবে, ততদিন নারীর যথার্থ ক্ষেত্র গৃহ। তার অর্থ অন্তঃপুরে তার নির্বাসন নয়, পতিগৃহে সম্রাজ্ঞীরূপে তার আসন লাভ। গন্তব্যের উদ্দেশ্যে মানব পরিবারের অগ্রগতির পথে পুরুষের সমান অংশীদার রূপে নারীর আসন অক্ষত থাকবে। ইসলাম এটিই অনুমোদন করে এবং নির্দেশ দেয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম নারী জাতিকে এতই সম্মান ও মর্যাদা দান করেছে যে, পবিত্র কুরআনের সুরা ‘নিসা’ অর্থাৎ, ‘নারী’ এবং ‘মরিয়ম’ নামে দু’খানা সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এ ঘটনার উল্লেখ ও তার সমাধান দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সকল নির্যাতিতা, লাঞ্ছিতা নারীর ইজ্জত রক্ষা ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য দৃষ্টান্ত হয়েছে। হযরত
খাদিজা (রা) বলেছেন, আমি রাসূল (স) কে সমস্ত জীবনে মাত্র তিনবার সালাম দেয়ার সুযোগ পেয়েছি, কেননা তিনিই প্রথমে সালাম দিতেন। তাই বলবো যে, “Islam was probably the greatest champion of women’s rights th world has ever seen.” ইসলামই নারী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!