সমাজসংস্কারে বেগম রোকেয়ার অবদান কী? আলোচনা কর।

অথবা, বেগম রোকেয়ার সমাজসংস্কার সম্পর্কে আলোচনা কর।
অথবা, সমাজসংস্কারক হিসেবে বেগম রোকেয়ার অবস্থান মূল্যায়ন কর।
অথবা, “বাঙালি মুসলিম মহিলাদের মধ্যে বেগম রোকেয়া হলেন অন্যতম প্রধান সমাজসংস্কারক” উক্তিটি পর্যালোচনা কর।
অথবা, বেগম রোকেয়াকে যথার্থ অর্থে সমাজ সংস্কারক বলা যায় কি না তা আলোচনা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার অন্তর্গত পায়রাবন্দ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল রক্ষণশীল। তৎকালীন সমাজে অবরোধ প্রথা ও অশিক্ষা ছিল মুসলিম নারীদের জন্য অভিশাপ স্বরূপ। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক তারা ছিল চার দেয়ালে বন্দী। জ্ঞানার্জনের, স্বাধীনভাবে চলাফেরার, সমাজে পুরুষের সহায়ক ভূমিকা পালন করার কোনো সুযোগই তাদের ছিল না। আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ ছিল অকল্পনীয়। এমন এক প্রতিকূল পরিবেশে
বেগম রোকেয়া বেড়ে উঠেছেন এবং সমাজ সংস্কারে মনোনিবেশ করেছেন।
সমাজসংস্কারক হিসেবে বেগম রোকেয়ার অবদান : সমাজসংস্কারক হিসেবে বেগম রোকেয়া নারী সমাজের দাসত্ত্ববৃত্তি থেকে পরিত্রাণের উপায় অনুসন্ধান করতে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। বেগম রোকেয়ার সমাজ সংস্কার সম্পর্কে মোহিত লাল মজুমদার বলেন, “রোকেয়ার সমস্ত রচনার পিছনে আছে সমাজসংস্কার বা সমাজহিতের নির্দেশ।” বেগম রোকেয়া লেখনি ধারণ করেছিলেন সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য। বেগম রোকেয়া তাঁর “মতিচুর” গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে “অর্ধাঙ্গী” প্রবন্ধে বলেন, “আমি ভগিনীদের কল্যাণ কামনা করি, তাহাদের ধর্ম বা সমাজবন্ধন ছিন্ন করিয়া তাহাদিগকে একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে বাহির করিতে চাহিনা। সামাজিক উন্নতি করিতে হইলে হিন্দুকে হিন্দুত্ব বা খ্রিস্টানকে খ্রিস্টানি ছাড়িতে হইবে এমন কোনো কথা নাই।”
সমাজচিন্তায় ঊনবিংশ শতকের বাঙালি সমাজ দার্শনিক বা সমাজচিন্তাবিদদের মতে, বেগম রোকেয়াও ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে তিনি সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। সমাজ উন্নয়নে নারীকে দেখতে চেয়েছেন সহায়ক ও পরিপূরক শক্তি হিসেবে। নিম্নে বেগম রোকেয়ার সমাজ সংস্কারের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. সামগ্রিক সমাজ চিন্তা : বেগম রোকেয়ার সমাজ চিন্তা ছিল সামগ্রিক। তিনি পুরুষ জাতির উন্নতির পাশাপাশি নারী জাতির উন্নয়নের কথা বলেন। নারীর সামাজিক অবস্থান নিরূপণে তাঁর দূরদর্শিতা ছিল। তিনি নারী ও পুরুষকে পরস্পরের সহযোগী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।
২. নারীর অবস্থান নির্ণয় : বেগম রোকেয়া তাঁর নারী মুক্তির সমাজ দর্শনে নারীর সামাজিক অবস্থান নির্ণয় এবং তাদের দুর্গতি মোচন করাকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। এজন্য তিনি মুক্তিবাদী ও বিশ্লেষণ দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজে নারীর অবস্থান নির্ণয় করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, “পাঠিকাগণ। আপনারা কি কোনোদিন আপনাদের দুর্দশার বিষয় চিন্তা করিয়া দেখিয়াছেন? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্য জগতে আমরা কি দাসী! পৃথিবীর থেকে দাস ব্যবস্থা উঠিয়া গিয়াছে শুনতে পাই। কিন্তু আমাদের দাসত্ব কি গিয়াছে? আমরা দাসী কেন? কারণ আছে।”
৩. নারীর পশ্চাৎপদতার কারণ : বেগম রোকেয়ার সমাজ সংস্কারমূলক চিন্তার মূলে ছিল নারী এবং সমাজে নারীর
অবস্থান। বেগম রোকেয়া তাঁর মতিচুর এর প্রথম খণ্ডে “অর্ধাঙ্গী” প্রবন্ধে বলেন, “শারীরিক শক্তিতে নারী অপেক্ষাকৃত দুর্বল। শুধু এ কারণেই স্বামী স্ত্রীর প্রভু হতে পারে না।” তিনি বলেন, নারীর পশ্চাৎপদতার কারণ শুধু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নয়; নারীর নিজস্ব ভূমিকাও রয়েছে।
৪. সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান : বেগম রোকেয়া সমাজসংস্কারে নারী-পুরুষের মধ্যকার সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তিনি নারী জাতির অবনতির মুখ্য কারণ হিসেবে সমাজে পুরুষ শাসন, নারী-পুরুষের মধ্যকার বিরাজমান সামাজিক বৈষম্যের পাশাপাশি নারীর সমান সুযোগের অভাবকেও দায়ী করেন। নারীর অবনতির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, সম্ভবত সুযোগের অভাব এর কারণ। সুযোগ না পেয়ে বাইরের কাজের ভার পুরুষদের দিয়ে তারা অবসরে গেছে আর এই সুযোগে পুরুষ তাদের সাহায্য করে আরো বেশি অকর্মণ্য করে তুলেছে। ফলে নারী হয়ে পড়েছে পুরুষের মুখাপেক্ষী।
৫. নারী শিক্ষার বিস্তার : বেগম রোকেয়া সমাজে নারীর পিছিয়ে পড়ার পিছনে শিক্ষার অভাবকে দায়ী করেন। এ কারণে সামাজিকভাবে নারীরা পুরুষের বোঝায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন। তাই তিনি নারীশিক্ষা প্রসারের জন্য এগিয়ে আসেন। ভারতীয় উপমহাদেশে তৎকালীন মুসলিম নারীসমাজে “নারীশিক্ষা” প্রবর্তনে সর্বপ্রথম উদ্যোগ নেন বেগম রোকেয়া। তিনি সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গড়ে তোলেন “সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল”। তিনি মেয়েদের জন্য শিক্ষার সুযোগ করে দেন। দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে তিনি ছাত্রী সংগ্রহ করেন। নিজেই স্কুল পরিচালনা করেন। তিনি তাঁর কর্মজীবনের প্রায় পুরো সময়টাতে নারীশিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করতে চেয়েছেন।
৬. অবরোধ প্রথার অবসান : বেগম রোকেয়ার সমাজসংস্কারের অন্যতম একটি দিক হলো নারীর অবরোধ প্রথার অবসান ঘটানো। তিনি ধর্মান্ধ গোঁড়া মুসলমান সম্প্রদায়ের নারীর প্রতি পর্দা প্রথার নির্মমতা চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন। নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে তিনি অবরোধ প্রথার অবসান কামনা করেন। তিনি এ বিষয়ে সামাজিক বাঁধা সম্পর্কে বলেন, “আমি কারসিয়াং ও মধুপুর বেড়াইতে গিয়া সুন্দর সুদর্শন পাথর কুড়িয়াছি। উড়িষ্যা ও মাদ্রাজে সাগর তীরে বেড়াইতে গিয়া বিচিত্র বর্ণের বিবিধ আকারের ঝিনুক কুড়াইয়া আনিয়াছি। আর জীবনের ২৫ বছর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠ মোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইতেছি। সমাজের কল্যাণের জন্য তিনি নারীকে অবরোধ প্রথা ভাঙার আহ্বান করেছেন। অবরোধ প্রথার বিষয়ে তাঁর মধ্যে ঘৃণা কাজ করেছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
৭. পুরুষতান্ত্রিকতার বিরোধিতা : তৎকালীন সমাজ ছিল পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষরাই সমাজের কর্তা ছিল। নারীদের আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল সংসারকার্যে। বেগম রোকেয়া নারীকে সমাজে ‘দাসী’ রূপে আবিষ্কার করেন। বেগম রোকেয়ার রচনা পর্যালোচনা করে নারীবাদী লেখক হুমায়ুন আজাদ বলেন, ‘রোকেয়ার সমগ্র রচনাবলিও ঘৃণায় ভরে রয়েছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। পুরুষ ধারণাটিই ছিল তাঁর কাছে আপত্তিকর। রোকেয়ার রচনাবলির প্রধান বৈশিষ্ট্য পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।’ তবে তিনি কোনো কোনো পুরুষের সহমর্মিতা ও সহযোগিতার কথাও বলেছেন। তাই তাকে পরিপূর্ণ অর্থে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরোধী বলা যায় না। তবে তিনি নারীর অংশগ্রহণে আশাবাদী ছিলেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে আমরা বলতে পারি যে, বেগম রোকেয়ার সমাজ সংস্কার নারী উন্নয়নের বিষয়কে লক্ষ্য হিসেবে ধরে নিয়ে পরিচালিত। তাঁর সংস্কার চিন্তা ও কার্যক্রম থেকে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি যে, নারী শিক্ষার অবসানের মাধ্যমে নারীকে তার সম্মানজনক অবস্থানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিভঙ্গী ও নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। তিনি পত্র-পত্রিকা ও সাহিত্য খাওয়াতীনে ইসলাম তিনি মূলত করতে চেয়েছেন। সমাজ রচনার ব্যাপক বিস্তার ও অবরোধ প্রথার সংস্কারে তাঁর বস্তুবাদী মহিলা পাশাপাশি মুসলিম সমিতি বা আঞ্জুমানে গঠনের মধ্য দিয়ে সমাজ
সংস্কারমূলক কার্যাবলি এগিয়ে নিয়ে যান। বাঙালি দর্শনে তিনি শিক্ষা ও সমাজসংস্কারক হিসেবে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b6-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%97%e0%a6%ae-%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a7%87/
পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*