Answer

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত ‘একরাত্রি’ গল্পে বর্ণিত প্রেমের স্বরূপ নিজের ভাষায় বিশ্লেষণ কর।

অথবা, “বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়”- উক্তিটি ‘একরাত্রি’ গল্পের বক্তব্যের সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ আলোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
বাংলা সাহিত্যে সার্থক ছোটগল্পের জনক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শতাধিক ছোটগল্প রচনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বিচিত্রধর্মী এ সকল গল্পে চিরন্তন বাঙালি সমাজের সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না, আশা-নিরাশার কথা বর্ণিত হয়েছে। ‘গল্পগুচ্ছ’ গ্রন্থে স্থান পাওয়া গল্পগুলোর মধ্যে যে কয়টি বিশ্বমানের প্রেমের গল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘একরাত্রি তার অন্যতম। এ গল্পে রবীন্দ্রনাথ শাশ্বত প্রেমের এক অভূতপূর্ব কাহিনি বর্ণনা করেছেন যা পাঠককে মুগ্ধ ও বিমোহিত করে।
গল্পের কাহিনি : ‘একরাত্রি’ গল্পের কাহিনি একটি সুবিন্যস্ত পটভূমির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। গল্পের নায়কের শৈশবের খেলার সাথী সুরবালা একদিন যে তার জীবনের বিশেষ একটি উপাদানে পরিণত হবে সে আভাস গল্পের প্রারম্ভেই পাওয়া যায়। তাদের মায়েরা বলাবলি করতেন ‘আহা দুটিতে বেশ মানায়’। শিশু হলেও নায়ক এ কথাটার অর্থ বুঝত। কিন্তু পরবর্তীতে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে কলকাতায় গিয়ে স্বদেশী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে নায়ক সুরবালাকে একেবারেই ভুলে যায়। দোশোদ্ধারে ব্যস্ত নায়ক সুরবালার অভিভাবকের দেয়া বিয়ের প্রস্তাব অবহেলা ভরে প্রত্যাখ্যান করে। নোয়াখালীর রামলোচন উকিলের সাথে সুরবালার শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। খবরটি নায়কের কানে পৌছালেও তার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।
কাহিনির ঘনঘটা : এরপর নায়ক যখন এফ. এ. পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমন সময় তার পিতার মৃত্যু হলো। বিধবা মা ও দুটি অবিবাহিত বোনের দায়িত্ব কাঁধে গড়ায় নায়ককে লেখাপড়া ও দেশোদ্ধারের মহান দায়িত্বে ইস্তফা দিয়ে রোজগারের পথে নামতে হলো। অনেক চেষ্টায় সে নোয়াখালির এক ছোট্ট শহরে এট্রেন্স স্কুলের সেকেন্ড মাস্টারের চাকরি গেল। নায়কের আবাসিক ব্যবস্থা হলো স্কুলগৃহের একটি ছোট কক্ষে। অবস্থাচক্রে সুরবালার স্বামী রামলোচন বাবু তার অনতিদূরেই সস্ত্রীক বসবাস করতেন। রামলোচন বাবুর সাথে তার আলাপ পরিচয় হলো। একদিন ছুটির দিনে নায়ক রামলোচন বাবুর সাথে গল্প করতে তার বাড়িতে গেল। সুরবালা তার সামনে এল না। এখন সে পরস্ত্রী, নায়কের বাল্যকালের খেলার সাথী নয়। সুতরাং পাশের ঘরে একটু খসখসানি, পায়ের একটুখানি শব্দ প্রভৃতি শুনেই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো।
স্মৃতি সেতো বেদনা : এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বাস, সরলতা এবং শৈশবপ্রীতিতে ঢল ঢল সুরবালার দুখানি চোখের কথা নায়কের স্মৃতিতে ভেসে উঠল। সহসা তার হৃৎপিণ্ডকে কে যেন একটা কঠিন মুষ্টির দ্বারা চেপে ধরল এবং বেদনায় তার ভেতরটা টন টন করে উঠল। নায়ক উদভ্রান্তের মতো বাসায় ফিরে এলেও সেই ব্যথাটা লেগেই রইল। কোন কাজেই সে মন বসাতে পারল না। বাল্যকালে খেলার হলে যে সুরবালা নায়কের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল যৌবনে সে সুরবালাকে স্পর্শ করা তো দূরের কথা তাকে এক নজর দেখার অধিকারও সে হারিয়ে বসেছে। সুরবালা এখন এক বেদনাময় স্মৃতিমাত্র।
সুরবালা তোমার কী না হইতে পারিত: শৈশবে যে সুরবালাকে নায়ক স্বেচ্ছায় অবহেলার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিল যৌবনে সেই সুরবালা তার হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে অবস্থান করতে লাগল। এক সময় যাকে ইচ্ছে করলেই পাওয়া যেত আজ মাথা খুঁড়ে মরলেও তাকে দেখার অধিকারটুকুও পাওয়া যাবে না। শৈশবের সেই সুরবালা তার যত কাছেই থাকুক না কেন উভয়ের মধ্যে একখানা দেয়াল বরাবর অবস্থান করবে। নায়ক উন্মত্তের মতো নিজেকে প্রশ্ন করল ‘সুরবালা আমার কে?’ ভেতর থেকে উত্তর শোনা গেল ‘সুরবালা আজ তোমার কেহই নয়, কিন্তু সুরবালা তোমার কী না হইতে পারিত।’ অনেক দুঃখে অনেক কষ্টে নায়ক এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলে যে, এখনকার এ প্রেম যদি যথাসময়ে আবির্ভূত হতো তাহলে সুরবালা তার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ, সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়ে তার জীবনের সমস্ত সুখ-দুঃখভাগিনী হতে পারত। অথচ আজ তার কথা চিন্তা করাও পাপ।
উপসংহার: দিন যেতে লাগল। নায়কের সমস্ত প্রেমিক মন জুড়ে সুরবালা বিরাজ করতে থাকল। এক সোমবারে সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। সারাদিন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। বিকেলের দিকে মুষলধারে বৃষ্টি এবং ঝড় আরম্ভ হলো। রাতে ঝড়ের বেগ বাড়তে লাগল। নায়ক জানত, রামলোচন বাবু একটা বড়ো মকদ্দমার কাজে বাইরে গিয়েছেন এবং এ দুর্যোগের রাতে সুরবালা একাই ঘরে অবস্থান করছে। দ্বিপ্রহর রাত্রে বানের ডাক শোনা গেল। চারদিক জলমগ্ন। সে যখন স্কুলের পুষ্করিণীর শুকনা পাড়ে গিয়ে উঠল তখন দেখা গেল বিপরীত দিক থেকে আত্মরক্ষার্থে সুরবালাও সেই পাড়ে এসে দাঁড়াল। তখন প্রলয়কাল। পৃথিবীর সমস্ত আলো নিবে গিয়েছে। এ নির্জন অন্ধকারের মধ্যে উভয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কাউকে একটা কুশল প্রশ্নও করতে পারল না। কেবল দুজনে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। আর পদতলে গাঢ়কৃষ্ণবর্ণ উন্মুক্ত মৃত্যুস্রোত গর্জন করে ছুটে চলল।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!