ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের মূলবক্তব্য তোমার নিজের ভাষায় লিখ।

অথবা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত প্রাগৈতিহাসিক গল্পের অন্ধকার জগতের মানুষের যে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও চাওয়া পাওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে তা বর্ণনা কর।
উত্তর :
ত্রিশোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ছোটগল্পসমূহে অখ্যাত অজ্ঞাত মানুষদের জীবনাচরণকে স্থান দিয়ে সাহিত্যে নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। যেসব মানুষ থাকে দৃষ্টির অন্তরালে তাদেরই কয়েকজনকে নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন তাঁর অনবদ্য ছোটগল্প ‘প্রাগৈতিহাসিক’। এই গল্পের ভিখু, পাঁচী, বসির ও পেহ্লাদ সভ্য সমাজের মানুষ নয়। তাদের জীবনজীরিকাও সুন্দর ও স্বাভাবিক নয়। তারা অন্ধকার জগতের মানুষ। শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলোয় তারা আলোকিত নয়। এদেরই সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও চাওয়া-পাওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে গল্পটিতে। ভিখুর পেশা ডাকাতি। সে দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার। পৃথিবীতে এমন কোন অপকর্ম নেই যা সে করে না। ডাকাতি করে মানুষের সর্বস্ব লুঠ করা, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে, মায়ের সামনে ছেলেকে খুন করা, পরের মেয়ে অপহরণ, বন্ধুর স্ত্রীকে ফুসলিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, উপকারী বন্ধুর স্ত্রীর গায়ে হাত দেওয়া, আবার বন্ধুর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া প্রভৃতি অপকর্মে তার হাত পাকা। সর্বশেষ বসন্তপুরের বৈকুণ্ঠ সাহার গদিতে ডাকাতি করতে গিয়ে ভিখু একটা খুন করে বসে। দলের সকলেই ধরা পড়লেও কাঁধে একটা বর্শার খোঁচা খেয়ে ভিখু একা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অনেক কষ্টে আহত ভিখু চিতলপুর পৌঁছে তার পুরানো বন্ধু পেহ্লাদের কাছে আশ্রয় চায়। পেহ্লাদ তাকে বাড়িতে রাখতে সাহস না পেয়ে বনের গভীরে সিনজুরি গাছের সাথে মাঁচা বেঁধে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। সেখানে অনাদরে অবহেলায় বিনাচিকিৎসায় ভিখু মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। সংকটজনক অবস্থা দেখে পেহ্লাদ ভিখুকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে। এখানে কেবল অপেক্ষাকৃত একটু অধিক আরামে থাকার সুবাদে সে দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে থাকে। একটু শরীরে জোর ফিরে পেয়েই ভিখু হাত বাড়ায় পেহ্লাদের স্ত্রীর দিকে। পেহ্লাদ জানতে পেরে ভগ্নীপতি ভরতের সাহায্য নিয়ে বেদম মারধোর করে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। প্রহৃত ও অপমানিত ভিখু রাতের অন্ধকারে পেহ্লাদের ঘরে আগুন দিয়ে ঘাট থেকে নৌকা চুরি করে শহরের দিকে পালিয়ে যায়। পরদিন পেটের তাগিদে ভিখু বাজারের পথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়ায়। ডাকাতি করতে গিয়ে বর্শার খোঁচা খেয়ে আহত ডান হাতটি তার চিরকালের জন্য অবশ হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে পূর্বেকার দুর্ধর্ষ জীবনে ফিরে যাওয়া তার পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। সুতরাং ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া জীবিকা অর্জনের আর কোন পথ তার সামনে খোলা থাকল না।
ভিখু এখন রাজপথের ভিক্ষুক। মানুষের কাছ থেকে ভিক্ষা আদায়ের কলাকৌশল সে অল্পদিনের মধ্যেই রপ্ত করে ফেলে। তার আয়-রোজগার ভালোই হতে থাকে। বিন্নু মাঝির একটা চালা মাসিক আট আনায় ভাড়া নিয়ে ভিখু নারীসঙ্গহীন জীবন কাটাতে শুরু করে। কিন্তু নারীসঙ্গহীন এই নিরামিষ জীবন তার ভালো লাগে না। অবসর সময়ে ভিখু নদীর পাড়ে গিয়ে স্নানরতা মেয়েদের দেখে তৃষ্ণা মেটায়। রাতেরবেলা একাকী বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে। এরপর একজন কম বয়সী ভিখারিণীর দিকে তার নজর পড়ে। তার সাথে ভাব জমাবার চেষ্টা চালায় ভিখু । আস্ত একটা পাকা কলা ঘুস দিয়ে তার নাম জেনে নেয় সে। ভিখারিণীর নাম পাঁচী। পাঁচী রাত কাটায় বসির নামের আর এক খঞ্জ ভিক্ষুকের সাথে। ভিখু পাঁচীকে তার সাথে থাকার প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়। ভিখুর জেদ চেপে যায়। বসিরের সাথে আলাপ জমাতে গিয়ে জীবন নাশের হুমকি খেয়ে ভিখু ক্ষিপ্ত হয়! সে বসিরকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেয়। নদীর তীরে কুড়িয়ে পাওয়া একটা লোহার শিকের মাথা পাথরে ঘষে ঘষে ভিখু মারণাস্ত্রে পরিণত করে। একদিন অন্ধকার রাতে এই অস্ত্র হাতে নিয়ে সে সতর্কতার সাথে বসিরের কুঁড়েঘরে গিয়ে হামলা চালায়। কৌশলে এক হাতের সাহায্যেই বসিরকে হত্যা করে সে। সংঘর্ষের শব্দে পাঁচীর ঘুম ভেঙে যায়। হত্যাকাণ্ড নির্বিঘ্নে সুসম্পন্ন হওয়ার পর ভিখু পাঁচীকে তার সাথে পালিয়ে যাওয়ার আদেশ দেয়। ভীতসন্ত্রস্ত পাঁচী তার ও বসিরের গচ্ছিত পয়সাকড়ি সাথে নিয়ে ভিখুকে অনুসরণ করে। তারা নতুন জীবন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে অজানার দিকে পাড়ি জমায়। ‘প্রাগৈতিহাসিক’ ছোটগল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সভ্যতার নিরাভরণ নগ্নমূর্তি উন্মোচন করেছেন। ভিখুকে তিনি গ্রহণ করেছেন মূর্তি নির্মাণের উপকরণ হিসেবে। ভিখু ও অন্যান্যদের মধ্যে যে নগ্নতা তা তাদের নিজস্ব সম্পদ নয়। এ সম্পদ সমাজ ও সভ্যতার। ভিখু এখানে অবলম্বন মাত্র। ভিখুর বেঁচে থাকার সংগ্রাম, কামনা চরিতার্থ করার উন্মাদনা, মানুষ খুন করার প্রবণতা প্রভৃতি মানুষের ভেতরকার সুপ্ত আদিমতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। গল্পকার মানুষের এসব সুপ্ত প্রবণতাসমূহের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। এ গল্পের ভিখু, পাঁচী, বসির, পেহ্লাদেরা আমাদের সভ্যসমাজের অন্ধকার গহবরে বসবাস করছে। মানুষের মধ্যে যে পশুপ্রবৃত্তি ও প্রাগৈতিহাসিকতা সুপ্ত অবস্থায় থাকে তা মাঝেমধ্যে আত্মপ্রকাশ করে সমাজের বুকে অঘটন ঘটায়। এই আদিমতা থেকে আধুনিক সভ্য সমাজ এখনো মুক্ত হতে পারেনি, কবে মুক্ত হতে পারবে তাও আমরা কেউ জানি না।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!