Answer

বৈষ্ণববাদ বলতে কী বুঝ? বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিপাদন কর।

অথবা, বৈষ্ণববাদ কী? বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ কী গ্রহণযোগ্য?
অথবা, বৈষ্ণববাদ কাকে বলে? বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো পুর্নমূল্যায়ন
অথবা, বৈষ্ণববাদ কি? বৈষ্ণববাদ সম্পর্কে সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গির পুর্নমূল্যায়ন কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
বৈষ্ণব ধর্মমতের সার বা তত্ত্বকথা নিয়ে গড়ে উঠেছে বৈষ্ণব দর্শন বা বৈষ্ণববাদ। বিষ্ণুর উপাসকরাই বৈষ্ণব। এ মতবাদে ঈশ্বরকে বিষ্ণু বা নারায়ণ, হরি বা কৃষ্ণ বলা হয়। তিনিই একমাত্রা আরাধ্য। তাঁরা নামই উপাস্য। বৈষ্ণব সমাজ বিষ্ণুর নাম সংকীর্তন ও নাম জপকে আধ্যাত্ম সাধনার প্রধান অঙ্গ হিসেবে গণ্য করেন। তবে তাঁদের এ সাধনা জ্ঞান বা কর্মের উপর নয় বরং প্রেমভক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ প্রেমে ভক্ত ও ভগবানের সম্বন্ধ অত্যন্ত নিবিড় ও প্রত্যক্ষ। ভগবানের তরেই ভক্ত তার প্রেমার্ঘ নিবেদন করেন, নিজকে উজাড় করে দেন। তাই বৈষ্ণববাদের প্রেমভক্তিবাদ ঈশ্বর সাধনার সাথে যুক্ত; যুক্তি তর্কের তত্ত্বীয় কসরত এখানে অতি সামান্যই। তাই অনেকে বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেন যদিও তাদের এ অভিযোগের সত্যতা অনেকটা তর্কসাপেক্ষ।
বৈষ্ণববাদ : বৈষ্ণবীয় রসতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব ও সাহিত্যে বিবৃত তত্ত্বকথা বা নিগূঢ় তত্ত্ব নিয়ে গড়ে উঠেছে বৈষ্ণববাদ । অর্থাৎ বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব, ভক্তি আশ্রিত রসতত্ত্ব ও সাহিত্যের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে বৈষ্ণববাদে। বৈষ্ণববাদের মূল কথা প্রেমভক্তি করুণা। অপরের কল্যাণে আপন স্বার্থ ত্যাগ তথা বিশ্বজনীন প্রেমানুভূতির উপর রচিত সনাতন বৈষ্ণববাদের ভিত্তি। বৈষ্ণব ধর্মের প্রধান অনুষ্ঠান শ্রীবিষ্ণুর নামকীর্তন বা উপাসনা। আর এ উপাসনার মধ্যে বিধৃত বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শন তথা বৈষ্ণববাদের সারকথা। বিষ্ণুর উপাসনা বিষয়ক সবচেয়ে প্রাচীন দলিল ঋগ্বেদ সংহিতা আর তাতেই ব্যাখ্যাত হয়েছে বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শনের মূলরূপ ও বৈশিষ্ট্য। বাংলায় এ মতের উদ্ভব হওয়ার বহুপূর্বে বৈষ্ণব মতের উদ্ভব হলেও এদেশে বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শনের ভিত্তি প্রথম রচনা করেন রামানুজ তাঁর বিশিষ্ট দ্বৈতবাদে। শঙ্করের অদ্বৈতবাদ ছিল জ্ঞানমুখী ও প্রেমভক্তিবাদ বিরোধী। এ নির্জলা অদ্বৈতবাদের প্রভাবে প্রেম ভক্তিবাদ হারিয়ে ফেলেছিল তার প্রাণশক্তি, তাতেই নবপ্রাণের সঞ্চার করেন রামানুজ। আর এ মতই প্রেমধর্ম বা ভক্তিধর্মরূপে বাংলায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য দেবের হাতে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানগুরু সক্রেটিস যেমন শ্রীচৈতন্যও তেমনি কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। সংস্কৃত ভাষায় বর্ণিত মাত্র আটটি শ্লোকের মাধ্যমে তিনি জয়গান করেন তাঁর ভক্তিবাদ বা প্রেমাত্মক দর্শনের। তাঁর বর্ণিত এ দর্শনই মধ্যযুগীয় বাঙালি দর্শনের ইতিহাসে বৈষ্ণব দর্শন বা বৈষ্ণববাদ নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করে। চৈতন্য প্রবর্তিত এ বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শনেরই বিস্তৃত টীকাভাষ্য রচনা করেন বৃন্দাবনের ষড় গোস্বামী (রূপ, সনাতন, রঘুনাথ দাস, রঘুনাথ ভট্ট, গোপালভট্ট ও জীবগোস্বামী)। শ্রীচৈতন্যের এ প্রেমভক্তিবাদ আশ্রিত ধর্ম ও দর্শনকে কেন্দ্র করেই রচিত হয় মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ধারা “শ্রীচৈতন্য জীবনীকাব্য” ও “বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্য।” এসব সাহিত্যেই কাব্যিক আঙ্গিকে বিধৃত হয়েছে বৈষ্ণববাদের দর্শন তত্ত্ব কথা। যা বাঙালিকে তখন থেকে প্রায় পরবর্তী দুই’শ বছর প্লাবিত করে এক ভাব প্লাবনে। বাঙালি তখন গভীরভাবে নিয়োজিত থাকে দার্শনিক তত্ত্ব বিচার, তর্কবিচার ও রসতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে।
বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিপাদন : বৈষ্ণববাদ বা বৈষ্ণব দর্শন যতটা না দর্শন পদবাচ্য তার চেয়ে বেশি ধর্মতত্ত্ব আশ্রিত। বৈষ্ণব ধর্মের পরমতত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণের নাম জপকীর্তন ও প্রেমভক্তি আশ্রিত আধ্যাত্মিক সাধন তত্ত্বের নিগূঢ় ব্যঞ্জনাকে ধারণ করেই গড়ে উঠেছে বৈষ্ণব দর্শন বা বৈষ্ণববাদ। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে বিশুদ্ধ যুক্তিভিত্তিক যে তাত্ত্বিক অনুসন্ধান আমরা তাকে দর্শন বলি সেরকম কোনো তত্ত্ব বা তাত্ত্বিক অনুসন্ধান বৈষ্ণববাদে সূচিত হয়েছে তা একেবারে হলফ করে বলা যায় না। বরং বৈষ্ণববাদের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় এখানে যুক্তি থেকে প্রেমভক্তির প্রাধান্যই বেশি। তাই অনেকেই বৈষ্ণববাদকে দর্শন বলতে নারাজ। এ মতের অনুসারীরা বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে কতিপয় অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন। নিম্নে বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এরূপ কতিপয় অভিযোগ এবং এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা প্রতিপাদন করা হলো :
১. অনেকে অভিযোগ করে বলেন যে, সমকালীন বিশ্লেষণী মানদণ্ডের বিচারে, বৈষ্ণবীয় রসতত্ত্ব ও প্রেমভক্তিবাদকে যথার্থ দর্শন বলা যায় না। কারণ বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শন বলতে যা বুঝায় বৈষ্ণববাদে তার কোনো লক্ষণ দেখতে পাওয়া যায় না।
গ্রহণযোগ্যতা : বৈষ্ণবাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এ অভিযোগ একেবারে অমূলক তা হয়তো বলা চলে না। কিন্তু তাই বলে এ অভিযোগকে অকাট্য হিসেবে গ্রহণ করাও যায় না। বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এ অভিযোগের একটি চমৎকার জবাব আমরা দেখতে পায় ড. আমিনুল ইসলামের বৈষ্ণব দর্শন ও মানবতাবাদ প্রবন্ধে। তাঁর মতে “সমকালীন বিশ্লেষণী মানদণ্ডের বিচারে বৈষ্ণবীয় রসতত্ত্ব ও প্রেমভক্তিবাদকে যথার্থ দর্শন বলা যায় কি না, এ নিয়ে বিশদ আলোচনা ও তর্কবিতর্কের অবকাশ হয়তো আছে। তবে এরকম কোনো বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় যুক্তি তর্কের তত্ত্বীয় কসরত ছাড়াও মানবিক বলে দর্শনের যদি অপর একটি দিক থেকে থাকে তাহলে বৈষ্ণববাদ জীবনমুখী ও মানবধর্মী দার্শনিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ বটে।”
২. বৈষ্ণববাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে বলা হয় যে, বৈষ্ণববাদে দার্শনিক যুক্তিবিচারের চেয়ে আবেগ উচ্ছ্বাস ও মিস্টিক অনুভূতির প্রাধান্যই বেশি। তাই বৈষ্ণববাদকে দর্শন না বলে ধর্মমত বলাই যুক্তিসংগত।
গ্রহণযোগ্যতা : এ সত্য হয়তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বৈষ্ণব ভাবধারা একটি বিশুদ্ধ দর্শন ধারা নয় বরং তা মিশ্রিত হয়ে আছে ধর্মতাত্ত্বিক রসতাত্ত্বিক সাহিত্য ধারার সঙ্গে। কিন্তু এ মিশ্রণ এমন যে তাদের কোনো একটিকে অন্য একটি থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। ধর্ম ও দর্শনের এ সম্মিলিত পথ চলার নিদর্শন দর্শনের ইতিহাসে কম নয়। সমগ্র মধ্যযুগের পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করেছে খ্রিস্টধর্ম। শুধু মধ্যযুগ কেন, বুদ্ধিবাদী ও বিচারবাদী বলে পরিচিত আধুনিক পাশ্চাত্য দার্শনিকদের উপরও ধর্মের প্রভাব একেবারে কম ছিল না। ডেকার্ট এবং কান্টের মতো প্রখ্যাত আধুনিক পাশ্চাত্য দার্শনিকদের চিন্তায় ধর্মের প্রভাব দেখা যায় সুস্পষ্ট।মোটকথা দর্শনের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় ধর্ম, সাহিত্য ও দর্শন পথ চলেছে হাতে হাত রেখে। আসল কথা ধর্ম, সাহিত্য ও দর্শনের মূল উপজীব্য যেখানে মানুষ ও মানবকল্যাণ সেখানে এদের মধ্যে বিরোধ টানাটাই অযৌক্তিক। অতএব ধর্মের দোহায় দিয়ে বৈষ্ণববাদকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই।
৩. অনেকে মনে করেন, বৈষ্ণবমত ও এ মতের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্য কীর্তনের গানে নাচে বাঙালি জাতিকে নির্বীর্য করে গিয়েছেন। অর্থাৎ ভক্ত ভাবোচ্ছ্বাস পেয়ে বাঙালি জাতি সংগ্রাম ভীরু ও জীবনধর্মে পলাতক হয়েছে। এ দর্শনের প্রভাব মানুষকে জীবনবিমুখ করেছে।
গ্রহণযোগ্যতা : এ অভিযোগের উত্তরে সুকুমার সেন বলেন, চৈতন্য বা তাঁর প্রবর্তিত মত বাঙালি জাতিকে নিবীর্য করেনি। বরং বলতে পারা যায় চৈতন্য বাঙালিকে একটা বৃহৎ উদ্যমের পথ খুলে দিয়েছিলেন। কেননা চৈতন্যের বৈরাগ্য ধর্মকর্ম বিমুখ ভিক্ষুকের আলস্য নয়। এ ধর্ম অত্যন্ত কঠিন বীর্যবানেরই আচরণীয় নৈষ্কর্ম।
৪. কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে, বৈষ্ণবীয় প্রেম লোকোত্তীর্ণ অতীন্দ্রিয় ব্যাপার। এ দিয়ে সমাজ ও মাটির মানুষের কি লাভ?
গ্রহণযোগ্যতা : এ অভিযোগের উত্তরে বলা যায়, বৈষ্ণববাদের প্রেমাত্মক দর্শনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগটি অজ্ঞতাপ্রসূত। কারণ, বৈষ্ণবাদের প্রেমাত্মক দর্শন কেবল অতীন্দ্রিয় ও পরমার্থিক পর্যায়েই সীমিত ছিল৪ না। একই সঙ্গে তা বিস্তৃত ছিল মানব সম্পর্কের ব্যাপক পরিমণ্ডলে এবং পরিণতি লাভ করেছিল সর্বাধিক মানবপ্রীতিবাদে ৷ কারণ হরিনাম উপদেশ ও প্রেমভক্তি দিয়ে চৈতন্য সাধারণ মানুষকে ঈশ্বরাভিমুখ করে তাদের জীবন মননের মান উন্নত করতে চেয়েছিলেন। সমাজ ও সংসারে যারা অত্যন্ত দুর্গত, বিনা দোষে সমাজ সংস্কৃতি বহিষ্কৃত, তারাও কৃষ্ণের জীব, তাদের দেহও কৃষ্ণের মন্দির এ বিশ্বাস ও বোধ জাগিয়ে তুলে তাদের শ্রেষ্ঠ মানুষের আসরে সমান আসনের অধিকারী করেছিলেন। তাঁর কাছে মানব প্রেমই ছিল সর্বাত্মক মিলনের নামান্তর এবং এ প্রেমই তিনি প্রচার করেছেন সর্বত্র। তাই বৈষ্ণব প্রেমাত্মক দর্শনকে শুধু অতীন্দ্রিয় ব্যাপার বলে অভিযোগ করা উচিত নয়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বৈষ্ণববাদ মধ্যযুগের বাঙালির ধর্ম ও দর্শন সাধনার অপূর্ব নিদর্শন। প্রেমধর্মের মাধ্যমে মানুষের সার্বিক কল্যাণ সুনিশ্চিত করাই ছিল এ ধর্ম ও দর্শনের মূল লক্ষ্য। হয়তো সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে বৈষ্ণববাদে দার্শনিক উপাত্তের ঘাটতি রয়েছে তথাপি মানবতা ও মানুষ যদি দর্শনের মূল উপজীব্য হয় তাহলে এ অর্থে বৈষ্ণববাদ মানবতাবাদী দর্শনের এক অপূর্ব নিদর্শন।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!