বিশ্বায়ন কী? নারীর উপর বিশ্বায়নের প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, বিশ্বায়ন কাকে বলে? নারীর উপর বিশ্বায়নের প্রভাব বর্ণনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা : বিশ্বায়ন পুঁজিতন্ত্রায়নেরই একটি নতুন রূপ। এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রক্রিয়াও বটে। বস্তুত, আমরা যে সমাজে বাস করছি, সে সমাজে সকল সামাজিক প্রক্রিয়া বিশ্বায়ন দ্বারা প্রভাবিত ও
পরিচালিত। মূলত আজকের বিশ্বে পুঁজি, প্রযুক্তি ও শ্রমের অবাধ প্রবাহ বিশ্বায়ন নামে পরিচিত। আমাদের জীবনের সকল স্তরেই বিশ্বায়নের প্রভাব রয়েছে। নারীর উপর বিশ্বায়নের নানা প্রভাব বিদ্যমান।
বিশ্বায়ন : সাধারণভাবে বিশ্বায়ন বোঝাতে ৩টি ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়। এগুলো হলো :
i. Cross border relations.
ii. Open border relations.
iii. Trans border relations.
প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন চিন্তাবিদ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে বিশ্বায়নের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাঁদের প্রদত্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো :
অনিতা রডিস (Anita Roddies) এর মতে, “অর্থনৈতিক উদারনীতিকরণ, যেমন-নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ, বেসরকারিকরণ এবং অধিকতর মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সংহতিকরণকে বিশ্বায়ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।” অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আইয়ুব রহমান ভূঁইয়া বলেছেন, “বিশ্বায়ন বলতে বাণিজ্য উদারীকরণ, যেমন নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্য বুঝায় । জার্মান অর্থনীতিবিদ জর্জ শেল বলেছেন, “Globalization is the benchmarking for economic activities, in which the standards in profit making is the deciding factor.” অর্থাৎ বিশ্বায়ন হলো মুনাফা সর্বোচ্চকরণের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যা দেশের সীমানার অভ্যন্তরে বা বাইরে যে কোন স্থানে পরিচালিত হতে পারে।
নারীর উপর বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব : নিম্নে নারীর উপর বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলো :
১. নারীমুক্তি আন্দোলনের অভ্যুদয় ও বিকাশ : নারী মুক্তি আন্দোলনের অভ্যুদয় ও বিকাশ বিশ্বায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্বায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বায়নের প্রভাবেই নারী মশ বৈশ্বিক রূপ লাভ করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
২. নারীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি : সারা বিশ্বে নারীর অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের জন্য যে বিভিন্ন রকম সংগ্রাম ও আন্দোলন হয়েছে তাকে যৌক্তিক করে তুলেছে বিশ্বায়ন। বিশ্বায়নের ফলেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নারী অধিকার স্বীকৃত হয়েছে ।
৩. আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন : বিশ্বায়ানের ফলে নারীমুক্তি আন্দোলন আজ আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে নারী উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংগঠন, বিশ্বব্যাংক, বিশেষ করে জাতিসংঘ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করছে।
৪. নতুন নতুন তত্ত্ব ও ধারণার উদ্ভব : বিশ্বায়নের ফলে নানা নতুন তত্ত্বের পাশাপাশি নারীবাদী বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে। যেমন উদার নারীবাদী, মৌলিক নারীবাদী, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী, সাংস্কৃতিক নারীবাদী, পরিবেশ নারীবাদী প্রভৃতি। এসব তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী প্রচার হওয়ার ফলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ঘটছে এবং নারীর উন্নয়ন সাধন হচ্ছে।
৫. নারীর ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি : বিশ্বায়নের প্রভাবে সারা বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নারীরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছে। তারা স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে।
৬. নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে : বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবের ফলেই সারা বিশ্বে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য উপবৃত্তি, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এটি নারী শিক্ষাকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করছে।
নারীর উপর বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব : নারীর উপর বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব বেশ মারাত্মক। এর ফলে নারীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিম্নে এর নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলো :
১. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বিভ্রান্ত নারী : বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি আমাদের দেশের সংস্কৃতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংস্কৃতি ও নারীর সাথে নিবিড় সম্পর্ক থাকে। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের কারণে সন্তানের লালন-পালনের ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নারী বিভ্রান্তিতে পড়ে। ফলে তার মধ্যে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়, যা তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
২. পুরুষতন্ত্রের ভিত্তিকে দৃঢ় করে : বিশ্বায়ন হলো পুঁজিবাদের উপজাত। আর পুঁজিবাদ এর সাথে পুরুষতন্ত্রের সম্পর্ক নিবিড়। পুঁজিবাদ পুরুষতন্ত্র উভয় শোষণের মাধ্যমে নিজের অবস্থান অব্যাহত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পুরুষতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হবার ফলে নারীরা গৃহে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
৩. পরিবেশ বিপর্যয় ও নারী : বিশ্বায়নের ফলে যত্রতত্র নগরায়ন হচ্ছে এবং শিল্পায়ন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নানা কলকারখানা গড়ে উঠছে এবং পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে নারীরা নিজের জীবন রক্ষা করতে পারছে না। শিল্পায়নে নেতিবাচক প্রভাবে শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হচ্ছে ফলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বাজার দখল করে নিয়েছে শিল্পায়িত বিভিন্ন সামগ্রী। এর ফলে তার জীবনযাপন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
৪. হস্ত ও কুটিরশিল্পায়ন : বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবে শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বাজার দখল করে নিয়েছে শিল্পায়িত সামগ্রী। এতে নারী তার কর্মসংস্থান হারাচ্ছে এবং পরিবারে তার আয়ের যোগান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
৫. কৃষিতে নারীর ভূমিকা হ্রাস : বিশ্বায়নের ফলে কৃষিকাজেও নারীর ভূমিকা হ্রাস পেয়েছে। বীজ সংগ্রহ, চারা উৎপাদন, ফসল মাড়াই প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির আবিষ্কার হওয়ার ফলে কৃষিক্ষেত্রে নারীকে আর তেমন প্রয়োজন হয় না। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নারীকে এসব কার্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
৬. যুদ্ধ, জাতিগত সংঘর্ষ ও নারী : বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী একক সংস্কৃতি পরিমণ্ডল তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় যখন ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। এর ফলে পুরুষেরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং নারীরা অরক্ষিত থেকে যায় । ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরে বিধবা নারীর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে।
৭. গণমাধ্যম ও নারী : বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে বিভিন্ন পণ্যের গুণগত মান তুলে ধরার জন্য নারীকে অপ্রাসঙ্গিক ও অশালীনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব নারীর উপর পড়ছে।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়নের নানা ইতিবাচক প্রভাব নারীর উপর রয়েছে। বিশ্বায়নের ফলেই নারী মুক্তি আন্দোলন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে এবং নারী উন্নয়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। বিশ্বায়নের ইতিবাচক প্রভাবের সাথে সাথে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব নারীর উপর বিদ্যমান। বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব কখনই আমাদের জীবনে সুফল বয়ে আনতে পারে না। তাই এর নেতিবাচক দিকগুলোকে আমাদের পরিহার করতে হবে।