Answer

পলিউন্নয়ন কাকে বলে? পলি উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত কর্মসূচি আলোচনা কর।

অথবা, পল্লি উন্নয়নের সংজ্ঞা দাও। পল্লি উন্নয়নে সরকারি সংস্থাসমূহের ভূমিকা আলোচনা কর।
অথবা, পল্লিউন্নয়ন কী? পল্লি উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ আলোচনা কর।
অথবা, পল্লিউন্নয়ন বলতে কী বুঝ? পল্লি উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা উল্লেখ কর। ছাত্র
অথবা, পল্লিউন্নয়ন কী? পল্লি উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত কর্মসূচি উল্লেখ কর।
অথবা, পল্লিউন্নয়ন কাকে বলে? পল্লি উন্নয়নে সরকারি সংস্থার কার্যক্রম আলোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্যয় হলো পল্লিউন্নয়ন। পল্লি উন্নয়নের মাধ্যমে একটি দেশের পল্লির জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়। পল্লির সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে পল্লির জনগণের আর্থসামাজিক, শিক্ষা, সংস্কৃতি তথা জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য একান্ত জরুরি। তাই এদেশের সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের গৃহীত কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
পল্লিউন্নয়ন : পল্লিউন্নয়ন একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান অংশ । সাধারণভাবে বলা যায়, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে যে বিভিন্ন কর্মসূচি ও কৌশল অবলম্বন করা হয় তাই পল্লিউন্নয়ন । পল্লি উন্নয়নে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, জনসাধারণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে পল্লি উন্নয়নের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাঁদের প্রদত্ত কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো :
ড. আবদুল হামিদ তাঁর ‘পল্লিউন্নয়ন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গ্রন্থে বলেছেন, “পল্লিউন্নয়ন এমন একটি ধীমান মানুষ চালিত প্রক্রিয়া, যা পল্লির সর্বস্তরের জনসাধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং সার্বিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে।”
কার্ল সি. টেইলর (Carl C. Taylor) বলেন, “এটি এমন একটি পদ্ধতি, যাতে জনসাধারণ তাদের নিজস্ব সামাজিক
ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিকল্পে নিজেদের নিয়োজিত করে এবং ফলশ্রুতিতে জাতীয় উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতে কার্যকরী দল হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে।”
পল্লিউন্নয়ন সম্পর্কে বি. মুখার্জী (B. Mukherjee) তাঁর ‘Community Development in India’ গ্রন্থে বলেন,
“পল্লিউন্নয়ন হচ্ছে পল্লির জনসমষ্টির ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রাকে উন্নয়নশীল জীবনযাত্রায় রূপান্তরিত করার পদ্ধতি ।”
Radha Raman Singh তাঁর ‘Rural Development Concept and Significance of the Issue’ শীর্ষক এক
Article 4, “Rural development means development of the rural areas in such a way that each component of rural life changes in a desired direction and in sympathy with others components.”
Robert Chambers, বলেন “Rural development is a strategy to enable a specific group of people, poor, rural, women and men to give themselves and their children more of that they want and need. It involves helping the poorest among those who stele a livelihood in the rural areas to demand and control more of the benefit of development. The group including small scale farmers tenants and the landless.”
বাংলাদেশের পল্লি উন্নয়নে সরকারি সংস্থা : বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের শতকরা ৮০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। এদেশের শতকরা ৭৯% মানুষ গ্রামে বসবাস করে, যাদের জীবন স্বল্প মাথাপিছু আয়, নিম্ন জীবনযাত্রার মান, শিক্ষার অভাব, ক্ষুধা, অপুষ্টি, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, প্রাকৃতিক ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। তাই গ্রামীণ জনসাধারণের এসব সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টায় সরকারি সংস্থাসমূহ দুর্যোগ
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
১৯৫৩ সালে V-AID (Village Agricultural and Industrial Development) কর্মসূচির অগ্রযাত্রা শুরু হয়।বাংলাদেশ গ্রাম উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে বাস্তবায়িত করার জন্য এ কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য নিম্নরূপ :
ক. গ্রামবাসীদের আয় বৃদ্ধির জন্য কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমবায়, কুটির শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞান ও কৌশল প্রয়োগ করতে সহায়তা করা।
খ. আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ জনগণের মধ্যে সমবায় এবং নেতৃত্বের সৃষ্টি করা।
গ. গ্রাম পর্যায়ে জনগণকে সংগঠিত করে ছোট ছোট স্বনির্ভর প্রকল্প গ্রহণে উৎসাহিত করা।
২. বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন একাডেমি (BARD) : পাকিস্তান সরকার কুমিল্লা পল্লি উন্নয়ন একডেমি গঠন করে। স্বাধীনতার পর এ সংস্থা বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন একডেমি (BARD) নামে পরিচিতি লাভ করে । গ্রামীণ উন্নয়নে এ সংস্থার কর্মসূচিসমূহ নিম্নরূপ :
ক. গ্রামীণ কৃষকদের উন্নয়নের লক্ষ্যে সমবায় সমিতি গঠন করা।
খ. কৃষিতে আধুনিকায়নের ব্যবস্থা করা এবং সেচ, সার, কীটনাশক ব্যবহারের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করা।
গ. খামার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া।
ঘ. বাজার ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণকে পরামর্শ দেয়া ।
ঙ. কৃষি উন্নয়নে থানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা।
৩. স্থানীয় সরকার ও পল্লিউন্নয়ন (LGRD) : বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজের যে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালিত হয় তা এক অর্থে জাতির উন্নয়ন বলা চলে। ১৯৮৫-‘৯০ সালের তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পদ্ধতির উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।পল্লিউন্নয়ন নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদ ও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মূল উপাদান হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। যেমন-
ক. কৃষি ও কুটির শিল্পের উন্নয়নে সহায়তা করা।
খ. গ্রামের রাস্তাঘাট, কালভার্ট ইত্যাদি উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন ।
গ. ভিজিএফ ও ভিজিটি কার্যক্রম তদারকি করা।
ঘ. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে সহায়তা করা।
ঙ. আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা।
৪. সমন্বিত পল্লি উন্নয়ন কর্মসূচি (IRDP) : গ্রামীণ জনগণের উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি বহুমুখী কর্মপ্রচেষ্টার নাম সমন্বিত পল্লি উন্নয়ন কর্মসূচি। ১৯৭১ সালে কুমিল্লা উন্নয়ন একাডেমির দ্বিস্তরবিশিষ্ট সমবায় ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সমন্বিত পল্লি উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সমন্বিত পল্লি উন্নয়ন কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সমবায় সংগঠন তৈরি করা, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, কৃষকদের প্রয়োজনীয় ঋণ সরবরাহ, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করা প্রভৃতি ।
৫. বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন বোর্ড (BRDB) : ১৯৮২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ থানায় পল্লি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর কার্যক্রমসমূহ নিম্নরূপ :
ক. গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে সমবায় কাঠামো গড়ে তোলা।
খ. কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা এবং কৃষকদের আধুনিক চাষ ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান।
গ. স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সফল বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা।
ঘ. উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সমবায়ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ঙ. গ্রামের কৃষকদের সমবায় সমিতি কর্তৃক প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুবিধা প্রদান এবং সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।
৬. স্বনির্ভর আন্দোলন : ব্রিটিশ সরকারের আমল থেকে স্বনির্ভর পল্লি গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের পর এ স্বনির্ভর পল্লির প্রাতিষ্ঠানিক দান স্বনির্ভর আন্দোলন। এ আন্দোলনের মূলকথা হচ্ছে গ্রামের প্রাপ্ত শক্তি,সামর্থ্য, সম্পদ এবং সুযোগ সুবিধা কাজে লাগানো। গ্রাম বাংলার মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এ আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য।
৭. পল্লি পূর্ত কর্মসূচি (Rural works programme) : বাংলাদেশের পল্লি অঞ্চলের বেকারত্বের অবসান ও
অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এ কর্মসূচির উদ্দেশ্যসমূহ নিম্নরূপ :
ক. গ্রামের রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণ ও মেরামত এবং খাল খনন ।
খ. প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার জন্য আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন।
গ. কৃষি উন্নয়নের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের পল্লি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।উল্লিখিত কর্মসূচি ছাড়াও সরকার পল্লি উন্নয়নের লক্ষ্যে এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, থানা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন ও থানা সেচ কর্মসূচি প্রবর্তন করেছে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, পল্লির জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়ন পল্লি উন্নয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ একটি গ্রামপ্রধান দেশ। এদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যা উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করেছে। পল্লির আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাসমূহের ভূমিকা যত বেশি হবে এদেশের উন্নয়নের মাত্রাও তত বেশি বৃদ্ধি লাভ করবে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!