ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাঙালি দর্শনে মহাভারতের প্রভাব আলোচনা কর।

অথবা, বাঙালি দর্শনচিন্তায় মহাভারতের প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনতত্ত্বে মহাভারতের প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শন সৃষ্টিতে মহাভারতের ভূমিকা বা অবদান পর্যালোচনা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত বিভিন্ন মৌলিক প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা কিংবা আলাপ আলোচনাই হচ্ছে দর্শন। দর্শনের বিভিন্ন শাখার মধ্যে বাঙালি দর্শন হচ্ছে অন্যতম। বাঙালি দর্শন হলো বাঙালির ধ্যানধারণা,চিন্তন-মনন, ভাবধারা, মতামত, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি প্রভৃতির সংমিশ্রণ। বাঙালি দর্শন শুধু আবেগাত্মক বা বিলাসী নয়,এ দর্শন হলো বিচারবুদ্ধি ও বিচক্ষণতার দর্শন।
বাঙালি দর্শনে মহাভারতের প্রভাব : বাঙালি দর্শনের একটি বিশেষ বিষয় হচ্ছে মহাভারত। মহাভারতে মানবজীবনের বিভিন্ন দিক; যেমন- মানবজীবনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, আদর্শ, প্রকৃতি এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নিম্নে বাঙালি দর্শনে মহাভারতের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে স্বীকার : মহাভারতে মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে এবং সর্বাবস্থায় মানুষের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মহাভারতে বলা হয়েছে, মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নেই। মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আধ্যাত্মিক, পারলৌকিক সকল বিষয়ই মহাভারতের আলোচনায় এসেছে। মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের জীবন কাহিনী ছাড়াও রাজ্য শাসন এবং দৈনন্দিন কার্যাবলি, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
২. নৈতিকতাই ধর্মের ভিত্তি : মহাভারতে নৈতিকতাকে ধর্মের ভিত্তিরূপে দেখানো হয়েছে। নৈতিকতা বিবর্জিত সমাজ আনন্দ বিবর্জিত এবং শ্রীহীন ও সমৃদ্ধিহীন। সমাজের সার্বিক কল্যাণই হচ্ছে এর একমাত্র লক্ষ্য। সামাজিক আইনকানুনও নৈতিকতা বিবর্জিত হতে পারে না। কারণ নৈতিকতা বিবর্জিত কোনো ধর্ম বা সামাজিক আইন সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা, সমৃদ্ধি আনতে পারে না।
৩. সমাজের সার্বিক কল্যাণ : মহাভারতে কোনো বিশেষ ব্যক্তি, দল কিংবা সম্প্রদায়ের কল্যাণের কথা বলা হয় নি,বরং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ এবং মানবতার জয়গানই গাওয়া হয়েছে। মহাভারত নশ্বর জীবের বাসভূমি এ অখণ্ড জগতকে একটি আত্মনির্ভরশীল দেহ বলে বিবেচনা করে থাকে।
৪. মানবিক উৎকর্ষ সাধন : মহাভারত একটি যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও তাতে রয়েছে মানবিক উৎকর্ষের নানাবিধ দিক। শুধু কৌরব ও পাণ্ডবদের যুদ্ধ কাহিনীই নয়, শকুন্তলা-দুষ্মন্ত, নল-দময়ন্তী, সাবিত্রী-সত্যবান, রুদ্র-বিনতা,দাতা কর্ণ, শিবি রামোপাখ্যান, যক্ষরূপী ধর্ম ও যুধিষ্ঠিরের কাহিনীসহ প্রতিটি আখ্যানেই একই মানবমূর্ছনা লক্ষ্য করা যায়।যুদ্ধবিগ্রহ অনিবার্য হলেও মানসিক উত্তেজনা প্রশমিত করে আত্মসংযম রক্ষা করা এবং ক্রোধ ও ঘৃণাকে দমন করার জন্য মহাভারতে বার বার উপদেশ প্রদান করা হয়েছে।
৫. ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার : পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু মহাভারতকে একটি ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার হিসেবে অভিহিত করেন। এর মধ্যে আমরা সকল প্রকার রত্ন আবিষ্কার করতে পারি। মহাভারতের শিক্ষা একটি বাক্যে প্রকাশ করা হয়েছে। বাক্যটি এরকম, ‘তোমার কাছে যা কিছু অপ্রীতিকর, অন্যের প্রতি তা প্রয়োগ করো না’। এ গ্রন্থে সমাজের কল্যাণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যা সমাজের মঙ্গল বিধান করে কিংবা যার জন্য তোমার লজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে,এমন কাজ কখনো করো না।
৬. মানব প্রকৃতির ত্রিগুণ : মহাভারতে মানব প্রকৃতির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, মানুষের স্বরূপ সাংখ্যচার্য কথিত ত্রিগুণ দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত। সত্ত্ব হচ্ছে মানুষের সদগুণ, রজঃ মানুষের কাম, ক্রোধাদি রিপু এবং তমঃ মানুষের অজ্ঞানতা ও মোহ প্রভৃতি সৃষ্টি করে। মহাভারতে বেদানুগ কর্ম যেমন স্বীকৃত হয়েছে, তেমনি বর্ণধর্মও বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের উপায়রূপে উপদিষ্ট হয়েছে।
৭. কর্মবাদে বিশ্বাস : মহাভারত কর্মবাদের অমোঘ নীতিতে বিশ্বাস করে। মানবকর্ম যেমন দেবনির্ভর, তেমনি,দেবকর্মও ঈশ্বরনির্ভর। মহাভারতের মতে, একনিষ্ঠ ঈশ্বরভক্ত তাঁর কৃপা দ্বারা কর্মফল রোধ করতে পারে। এতে আরও বিশ্বাস করা হয়, ধর্ম ছাড়া নৈতিকতা অচল, আর নৈতিকতা ছাড়া ধর্মও অপূর্ণাঙ্গ। তাই মহাভারতের নৈতিকতা ঈশ্বরের প্রতি প্রেমঘন ভক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত।
৮. মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য : মহাভারতে মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যরূপে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এ চতুর্বর্গকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো পরস্পর বিষম, বিরুদ্ধ, বিমিশ্র ও জটিল। এদের পারস্পরিক সম্পর্কও দ্বন্দ্ব এবং সংঘর্ষের। মহাভারতের নায়ক পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের মহাপ্লাবন বয়ে গেছে। চতুর্বর্গের কোনটি শ্রেষ্ঠ তার উত্তরে অর্জুন বলেছেন অর্থের কথা। নকুল ও সহদেব বলেছেন ধর্ম ও অর্থের মিলন ঘটলে তা হয় মানুষের কাছে অমৃত সমান। ভীমের মতে কামই সর্বশ্রেষ্ঠ। আর যুধিষ্ঠির চেয়েছেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে স্থিতধী হতে।
৯. মহাভারতে ধর্ম : মহাভারতের মূল কেন্দ্রে ধর্মের অবস্থান। রামায়ণের আদর্শ যদি হয় সত্যতা, তাহলে মহাভারতের আদর্শ হবে ধার্মিকতা। তাই মহাভারতের বাণী হচ্ছে, ‘যথাঃ ধর্ম তথা জয়ঃ’। মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম সম্পর্কে বলেছেন, “যা মানুষকে রক্ষা করে, তাই ধর্ম।” ভীমের মতে, যার দ্বারা সকল জীবের বৃদ্ধি ও অভ্যুদয় হয় তাই ধর্ম।
১০. মহাভারতে অর্থ : অর্থকে মহাভারতে একটি শক্তি, ভগবদ্‌শক্তিরূপে গ্রহণ করা হয়েছে। ধর্মের মূলে রয়েছে যেমন অর্থ, তেমনি অর্থের মূলেও রয়েছে ধর্ম। যক্ষরূপী ধর্মরাজের প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির অর্থহীন লোককে জীবিত থেকেও মৃত বলে অভিহিত করেন। পাণ্ডব জননী কুন্তি বলেছেন, দারিদ্র্য আর মৃত্যু তো একই কথা। অর্থ শক্তিতে মানুষ ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ঈস্ট সাধন করতে পারে। তাই অর্থকে মহাভারতে একটি ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। যা কিছু মানুষের আয়ত্তাধীন তাই ধর্ম। ধর্ম এবং বিদ্যা মানুষের আয়ত্তাধীন বলেই এরা শ্রেষ্ঠ অর্থরূপে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এ কারণেই অর্ধকে মহাভারতে ভগবানের শক্তিরূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
১১. মহাভারতে কাম : মহাভারতে কাম শব্দটি বৈদিক অর্থেই ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। অরণি থেকে যেমন অগ্নি, তেমনি অর্থ থেকেও কামের উৎপত্তি। সংক্ষেপে যে কোনো সঙ্কল্পরূপ মানস ইচ্ছাই কাম। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে,মনের সঙ্কল্প বিকল্প থেকেই কামের উৎপত্তি। জীবন মাত্রই কামের বন্ধনে আবদ্ধ। মহাভারত মনে করে, যে ব্যক্তি ধর্ম ও অর্থকে পরিত্যাগ করে কেবল কার্যের পিছনেই ধাবিত হয় তার শুভ বুদ্ধি ধ্বংস হয়। মহাভারত মানুষের এ কাম প্রবৃত্তিকে বিষবৃক্ষের পরিবর্তে ধর্মবৃক্ষে পরিণত করতে চেয়েছে।
১২. মহাভারতে মোক্ষ : মহাভারত যে অবস্থাকে মোক্ষ বলে অভিহিত করা হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ তাকেই বলেছেন যোগতত্ত্ব। এ এমন এক অবস্থা, যা স্বরূপত রহস্যঘন। তাই মহাভারতে বলা হয়েছে বিষয় সংসারে থাকলেই যে বন্ধন,আর সংসারের সবকিছু পরিত্যাগ করলেই যে মোক্ষ তা নয়। ধনী, গরিব, সংসারী, সন্ন্যাসী সকলেই স্বধর্ম পালনের মাধ্যমে মোক্ষ লাভ করতে পারে। মোক্ষ হচ্ছে এমন এক অবস্থা, যেখানে ধর্ম, অর্থ ও কামের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের উপর সম্যক কর্তৃত্ব লাভ করা যায়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, মহাভারত মানুষের উপর সঠিক গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং কি করে মানুষের জীবনের প্রকৃত কল্যাণ সাধিত হতে পারে তার দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। মানুষ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এ গুণ তিনটি দ্বারা পরিচালিত বলে উল্লেখ রয়েছে। আধুনিক পণ্ডিতদের মতে, প্রাচীন বেদোপনিষদের আত্মতত্ত্বের প্রতিধ্বনি লক্ষ্য করা যায় মহাভারতে। তাই বাঙালি দর্শন বিকাশে মহাভারতের অবদান কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!