Answer

বাঙালি দর্শনে বেদের প্রভাব আলোচনা কর।

অথবা, বাঙালি দর্শনতত্ত্বে বেদের প্রভাব বর্ণনা কর।
অথবা, বেদ বাঙালি দর্শনে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছিল— আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনে বৈদিক প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা কর।
অথবা, তুমি কি মনে কর বাঙালি দর্শনে বৈদিক প্রভাব রয়েছে? তোমার মতের স্বপক্ষে বক্তব্য তুলে ধর।
উত্তরা।৷ ভূমিকা :
মানুষ কে বা কি, মানুষ কোথা থেকে এলো, কোথায় মানুষের পরিণতি, এ পৃথিবীতে মানুষের স্থান কতটুকু, এখানে তার বেঁচে থাকার সার্থকতা কোথায়, অন্যান্য অনেক প্রশ্নের মত মানুষের স্বরূপধর্ম সম্পর্কিত এ জাতীয় কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নবানেও মানব মন জর্জরিত হয়েছে যুগে যুগে। পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতা, দর্শন ও সংস্কৃতির উৎস ভূমিরূপে স্বীকৃত বৈদিক সাহিত্যে মানুষের স্বরূপ সন্ধানের প্রথম সুসংহত প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। বৈদিক সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় মানুষের আত্মিক, মানবিক ও নৈতিক দিকসহ সমগ্র মানব পরিস্থিতি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিম্নে আলোচ্য প্রশ্নানুসারে বাঙালি দর্শনে বেদের প্রভাব বর্ণনা করা হলো। তবে তার পূর্বে বেদ কি সে সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। বেদ আর্য কর্তৃক প্রচারিত সংস্কৃতি কি না : আধুনিক পণ্ডিতদের মতে, আর্য কর্তৃক প্রচারিত সংস্কৃতিই বৈদিক সাহিত্য নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকরা মনে করেন আর্যরাই সর্বপ্রথম এ দেশে বেদ প্রচার করেন। আর্য প্রচারিত এ বৈদিক সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়েই সুবিশাল বৈদিক সাহিত্যের সৃষ্টি। এ সাহিত্যের পর্যালোচনা করলে আমরা বৈদিক যুগের ধর্ম ও দর্শন, সমাজ ও ইতিহাস, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে সম্যকভাবে অবগত হয়ে মানুষের স্বরূপ বিষয়ে বৈদিক ধারণার সাথে পরিচিত হতে পারি।
বেদের স্বরূপ : বেদ ভারতীয় সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ। ভারতের ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহকরূপে সর্বাধিক প্রণম্য বেদ। মানবজীবনের উৎপত্তি এবং তার লক্ষ্য ও পরিণতির আলোচনা দিয়েই বেদের মানব সমীক্ষা আবর্তিত হয়েছে। বেদ চার প্রকার। এ চার প্রকার বেদের মধ্যে ঋগবেদ হচ্ছে সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ। ঋগবেদে মানব মনের উচ্ছ্বাস,কবিতার দীপ্তি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও রহস্যে মানব মনের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবাবেগ লক্ষ্য করা যায়। ডক্টর শ্যাকনিল তাই “এ আমাদের জগৎ, আর এতে মানুষের জীবনযাত্রা চলছে- এসব কিসের ব্যঞ্জনা দিচ্ছে, কি প্রকাশ করতে চায়,তা আবিষ্কার করার জন্য লোকে বহু যুগ ধরে বহু প্রয়াস দেখিয়ে এসেছে। ঋগবেদের সূত্রগুলোতে আমরা এসব উদ্যমের লিপিবদ্ধ বিবরণ দেখতে পাই।”
বৈদিক সাহিত্যের ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ একটি দার্শনিক সংকলন। এখানে মানুষের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রথমেই মানুষের সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মানব সৃষ্টির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এখানে বলা হয়েছে সৃষ্টির আদিতে ছিল জলরাশি। এ জলরাশিতে হিরণ্যগর্ভ বা স্বর্ণডিম্ব ভাসমান অবস্থায় ছিল। আর এ স্বর্ণডিম্ব থেকেই আবির্ভূত হলেন যাবতীয় প্রাণীর আদি পুরুষ প্রজাপতি । প্রজাপতি ইচ্ছা করলেন, আমি সৃষ্টি করব। এ ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে তিনি তপস্যামগ্ন হলেন এবং অতঃপর সৃষ্টি করলেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, পৃথিবী, মহাশূন্য ও আকাশ। তারপর আদিপুরুষ প্রজাপতিই পৃথিবী থেকে অগ্নি, মহাশূন্য থেকে বায়ু, আকাশ থেকে অদিতি নামে তিনটি বিরাট শক্তি সৃষ্টি করলেন। তারপর এগুলো থেকেই তিনি বেদ সৃষ্টি করেন।
বাঙালি দর্শনে বেদের প্রভাব : মানুষ অমৃতের সন্তান, মানবজন্ম দুর্লভ, ব্রহ্মাণ্ডে যা আছে, মানুষের দেহ ভাণ্ডে তাই আছে, মানুষই সাধনার বলে ব্রহ্মপদ লাভ করতে পারে, এ জাতীয় বক্তব্যে বৈদিক সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাধনায় মানুষকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাই দেখা যায়, ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃতিসং সমগ্র মানবসভ্যতায় বৈদিক সাহিত্য এক অসাধারণ গুরুত্বের অধিকারী। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাচীন সাহিত্য মানবসভ্যতায় এ রকম বলিষ্ঠ অবদান রাখতে পারে নি। নিম্নে বাঙালি দর্শনে বৈদিক প্রভাব উল্লেখ করা হলো :
১. মানবজীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য : মানবজীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কিত বৈদিক মত আমরা ঋত এর ধারণায় পাই। ঋত শব্দটির ধাতুগত অর্থ হচ্ছে প্রকৃতির এক রূপতা, যা দ্বারা প্রাকৃতিক বস্তুর শৃঙ্খলার বিধিবিধানকে নির্দেশ করা হয়ে থাকে। এ ঋত এর মাধ্যমেই দেবতারা অন্তরের দিক থেকে মানুষের চিন্তা, বাক্য কর্মের দোষগুণ, ভালোমন্দ, সৎঅসৎ বিচার করে থাকেন। আদর্শরূপে গড়ে তোলার জন্য পাপাচারের পথ পরিহার করার আর পুণ্যের পথ অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২. মানুষের নৈতিক জীবন : মানুষকে আদর্শ মানবে রূপান্তরিত করার জন্য, মানুষের জীবনকে নৈতিক করার জন্য বেদে কিছু বিধান দেওয়া হয়েছে। অবৈধ ভোজন ও যথেচ্ছ দক্ষিণা গ্রহণ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। একই যজ্ঞ পর পর তিনবার অনুষ্ঠান না করার কথা বলা হয়েছে। এগুলোর ফলেই মানুষের বন্ধনের সৃষ্টি হয় বলে বেদে উল্লেখ হয়েছে। যে সর্বদা পাপাচারে লিপ্ত থাকে, তার সংশ্রব এড়িয়ে দূরে থাকার জন্যও মানুষকে উপদেশ প্রদান করা হয়েছে।অন্যদিকে, একই পরিবারভুক্ত ব্যক্তিদের পারস্পরিক অনুরাগ, শ্রদ্ধা ও অন্তরঙ্গতা, পিতামাতার প্রতি আনুগত্য, মধুর হিতবাক্য, ছোটদের প্রতি বাৎসল্য, অকৃত্রিম দাম্পত্য প্রেম ও দায়িত্ববোধ গুণগুলো অর্জন করতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
৩. নারী শিক্ষা : পুরুষপ্রধান সমাজ হলেও ঋগবেদের যুগে নারীরা যেন যথেষ্ট উন্নত ও মর্যাদাকর স্থানে অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন, সে ব্যাপারে পুরুষদের শিক্ষা দেওয়া হতো। সে যুগে পুরুষদের মত নারীরাও যাতে উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করতে পারেন, সেজন্য এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না। তাই সে যুগে লোপামুদ্রা, ঘোষা, অপালা প্রভৃতি কয়েকজন ব্রহ্মবিদূষী নারীও ছিলেন।
৪. চতুবর্ণ : বেদে জাতিভেদ প্রথার কঠোরতার কথা বলা না হলেও মানুষকে তার সহজাত গুণ ও কর্মক্ষমতা অনুযায়ী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এ চতুর্বর্ণে বিভক্ত হয়ে প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্তব্য পালন করাকেই ধর্ম বলে অভিহিত করা হয়েছে। ঋগবেদে বিভিন্ন বর্ণ ও শ্রেণিকে এক বিরাট আত্মার বিভিন্ন অঙ্গ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।ব্রাহ্মণগণ সে বিরাট আত্মার মুখগহ্বর থেকে, ক্ষত্রিয়গণ তাঁর বাহু থেকে, বৈশ্যগণ তাঁর দুই উরু থেকে এবং শূদ্রগণ তাঁর দুই চরণ থেকে সৃষ্ট বলে মনে করা হয়েছে।
৫. চতুরাশ্রল : চারটি আশ্রম হলো ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। ব্রহ্মচর্যে ছাত্রছাত্রীকে গুরুগৃহে বাস করে। বিদ্যাশিক্ষা লাভ করতে হতো। গার্হস্থ্য আশ্রমে যুবক যুবতীকে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করে সাংসারিক ধর্ম পালন করার কথা বলা হয়েছে। বানপ্রস্থ হচ্ছে বলবান গ্রহণ। সন্ন্যাসাশ্রমে মানুষকে বহিরাগত আনুষ্ঠানিক কর্ম পরিহার করে ঈশ্বরের টানে নিমগ্ন থাকতে হয়। এগুলোর সার্থক অনুশীলনের মাধ্যমেই মানুষ ঐচ্ছিক ও আধ্যাত্মিক প্রগতি লাভ করতে পারে।
৬. রাজনৈতিক পরিস্থিতি : ঋগবেদে রাজনীতি সম্পর্কে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য যিনি রাজা হবেন, তক জনপ্রিয় ও জননির্বাচিত হতে হবে। তাঁকে শুধু রাজা হলেই চলবে না, তাঁকে প্রজাদের রক্ষকও হতে হবে। তাঁকে সর্বদাই প্রজাদের কল্যাণ দেখতে হবে। কাজকর্মে সাহায্য করার জন্য তাঁর কিছু মিত্রও থাকতে হবে। তিনি ধনবানদের সাহায্যপুষ্ট হবেন এবং সর্বদাই নাগরিক প্রীতি ও দায়িত্ব সচেতন হবেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, বাঙালি দর্শনে বেদের প্রভাব অপরিসীম। বেদের বহু শিক্ষা বাঙালি দর্শনে বিদ্যমান। বেদের মাধ্যমেই এ দেশের মানুষের চিন্তাচেতনা, কর্ম, নীতিবোধে পরিবর্তন এসেছে। তাই বলা যায়, বাঙালি দর্শনে বেদের প্রভাব অতুলনীয়।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!