ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাঙালি দর্শনের সংজ্ঞা দাও । বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।

অথবা, বাঙালি দর্শন কাকে বলে? বাঙালি দর্শনের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে যা জান ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শন কী? বাঙালি দর্শনের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনের পরিচয় দাও। বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বর্ণনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শন বলতে কোন দর্শনকে বোঝায়? এর উৎপত্তির ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে যা জান লেখ।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
‘দর্শন’ শব্দের উৎপত্তি দৃশ্ ধাতু থেকে। দৃশ্ + অনট= দর্শন। তাই শাব্দিক অর্থে দর্শন বলতে কোনো কিছু দেখাকে বুঝায়। কিন্তু দর্শন শাস্ত্রে দর্শন শব্দটিকে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। আর এ অর্থে দর্শন বলতে তত্ত্বানুসন্ধান দ্বারা জ্ঞান লাভের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে বুঝায়। প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব একটি দর্শন রয়েছে,যেমন- গ্রিক দর্শন, ইউরোপীয় দর্শন, ভারতীয় দর্শন, মুসলিম দর্শন। তেমনি বাঙালি জাতির প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের বিভিন্ন দার্শনিক সমস্যা সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত নিয়ে যে দর্শন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা বাঙালি দর্শন নামে সুবিদিত।
বাঙালি দর্শন : ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, অন্যান্য প্রাগ্রসর জাতির মত বাঙালির দর্শন চিন্তাও ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। বাঙালির তিন যুগে (প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক) বাঙালি দর্শন বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়ে জগৎ, জীবনের স্বরূপ ও গূঢ়ার্থ আবিষ্কার এবং যথার্থ মানবোচিত জীবনের অনুসন্ধানসহ মানুষকে নিয়ে মানুষের ভাবনা বাঙালির দর্শনচিন্তায় একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যরূপে দেখা দিয়েছে। তাই বলা যায়, বাঙালি দর্শন হলো বাঙালির ধ্যানধারণা, চিন্তা-মনন, ভাবধারা, মতামত, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদির সংমিশ্রণ। বাঙালি দর্শন নিছক দুঃখবাদী কিংবা ভাববিলাসী দর্শন নয়, বাঙালি দর্শন হলো জগৎ ও জীবনের সাথে সম্পর্কিত দর্শন। তাই বলা যায়, বাংলা ও বাংলার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যময় রূপ ও রসের মাধুর্যে আপ্লুত হয়ে মরমি চেতনায় উদ্ভূত যে দর্শন জন্মলাভ করেছে, তাকেই বাঙালি দর্শন নামে অভিহিত করা যায়।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্নভাবে বাঙালি দর্শনের সংজ্ঞা দিয়েছেন। নিম্নে তাঁদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংজ্ঞা উপস্থাপন করা হলো :
বাঙালি দর্শনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার রায় বলেছেন, “যে প্রজ্ঞাময় দর্শন বাংলাদেশের আবহমানকালের বিশাল পটভূমিতে প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে এ সময় পর্যন্ত বিবর্তিত হয়েছে তাই বাঙালি দর্শন।”
অধ্যাপক মফিজ উদ্দীন আহমেদ বাঙালি দর্শন সম্পর্কে বলেছেন, “বাঙালি দর্শন মুক্তি বা মোক্ষলাভকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।”
অধ্যাপক সাইদুর রহমান বাঙালি দর্শন সম্পর্কে বলেছেন, “বাঙালি দর্শন কেবল সমদর্শন নয়, খালি পরলোকচর্চা নয়, তত্ত্ববিদ্যার নিছক রোমন্থন ও কসরত নয়, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের যে কোনো সার্থক দর্শনের ন্যায় বাঙালি দর্শনও মূলত জীবনদর্শন, উন্নত মানবজীবন প্রণয়ন ও যাপনের উপায়ানুসন্ধান।”
সুতরাং উপরের আলোচনা হতে বলা যায় যে, বাঙালি দর্শন হলো বাঙালির শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিন্তাচেতনা, মনন ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচিত জীবনদর্শন।
বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে ছয়টি প্রধান চিন্তাধারা ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। নিম্নে এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. প্রাক বৈদিক চিন্তাধারা : বৈদিক চিন্তাধারার উৎপত্তি হয় প্রাচীন বাংলার অনার্যদের কাছ থেকে। অনার্যরা সুসভ্য সংস্কৃতি পরায়ণ ছিলেন। অনার্যদের এ দর্শনকে বলা হয় লোকায়ত দর্শন। দর্শন ছিল বস্তুবাদী, বেদ বিরোধী ও প্রত্যক্ষবাদী। লোকায়তরা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণকে জ্ঞানের একমাত্র উপায় মনে করত। তাদের এ মতবাদ বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২. বৈদিক চিন্তাধারা : বৈদিক চিন্তাধারায় বস্তুবাদের স্থলে ভাববাদ ও অধ্যাত্মবাদের বিকাশ ঘটে। তাঁদের চিন্তাধারায় পারলৌকিক তথা সৃষ্টিকর্তার অধ্যাত্মবাদ ফুটে উঠে। তাই দেখা যায়, বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে বৈদিক চিন্তাধারার অবদান অনস্বীকার্য।
৩. বেদ বিরোধী চিন্তাধারা : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশে আর একটি মৌলিক চিন্তা হলো বেদ বিরোধী মত। বেদ বিরোধী চিন্তাধারায় তিনটি ধর্মীয় দর্শনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যথা :
ক. চার্বাক দর্শন : চার্বাক দর্শন কোনো প্রকার প্রত্যাদেশে বিশ্বাসী নয়। ‘প্রমাণই’ এ দর্শনের জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায়। প্রত্যাদেশ নির্ভর চিন্তাধারাকে গ্রহণ করে এ দর্শন বাঙালিদের স্বাধীন চিন্তাধারার পথ উন্মুক্ত করেছে।
খ. জৈন দৰ্শন : অহিংসাই জৈন দর্শনের মূলমন্ত্র। বেদ বিরোধী জৈন দর্শনের প্রভাবও বাঙালি দর্শনে কম নয়। এ দর্শন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
গ. বৌদ্ধ দর্শন : বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব বাঙালি দর্শনের উৎস ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে এ দেশে প্রকৃতিবাদী ও প্রয়োজবাদী সর্বোপরি মানবতাবাদী দর্শনের চিন্তার বিকাশ ঘটে।
৪. ইসলামি চিন্তাধারা : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে ইসলামি চিন্তাধারা এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যযুগে ইসলামি চিন্তাধারার সাথে এ দেশের তত্ত্বধারার সংমিশ্রণ হয়। এভাবে বাঙালি দর্শনে যোগ হয় নতুন চিন্তাধারা।
৫. মরমি চিন্তাধারা : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে আর একটি চিন্তাধারা যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। সেটি হলো মরমি চিন্তাধারা। এ দেশজ মরমিবাদের দু’টি ধারা রয়েছে। যথা :
ক. বৈষ্ণববাদ : বৈষ্ণববাদ এ দেশে প্রেম ও ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষকে আপন করে নিয়েছিল।
খ. বাউল তত্ত্ব : বাউল তত্ত্ব আবহমান বাংলার পথঘাট, সুশীতল বাতাস, প্রান্তর তথা বাংলার প্রকৃতির প্রাধান্য দিয়ে গানে গানে পরিচিত হয়।
৬. পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বিচারধর্মী চিন্তাধারা : বাঙালি দর্শনের ক্রমবিকাশে তথা পূর্ণতা লাভের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বিচারধর্মী চিন্তাধারার প্রভাব অপরিসীম। এ চিন্তাধারা আবার তিনটি দার্শনিক তত্ত্বের মাধ্যমে বিকাশ ঘটে। তা হলো :
ক. প্রত্যক্ষবাদ : আধুনিক যুগে বাঙালি দর্শনে ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁতের প্রত্যক্ষবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে। যেসব বাঙালি দার্শনিকরা প্রত্যক্ষবাদের প্রভাবে প্রভাবিত হন তাঁদের মধ্যে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, যোগেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ ও দ্বারকানাথ প্রমুখ । বিংশ শতকে বাংলাদেশেও সাহিত্যকর্মে প্রত্যক্ষবাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
খ. উপযোগবাদ : আধুনিক যুগে যেসব পাশ্চাত্য দার্শনিক চিন্তাধারা বাঙালি দর্শনকে প্রভাবিত করেছে তার মধ্যে উপযোগবাদ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। উপযোগবাদের প্রবর্তক হলেন বেন্থাম, জেমস মিল ও জন স্টুয়ার্ট মিল। আর যাঁরা এ উপযোগবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন তারা হলেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবাব আব্দুল লতিফ, কাজী আব্দুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ ।
গ. মার্কসবাদ : বাঙালি দর্শনের ক্রমবিকাশে মার্কসবাদের অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিনিময় মুক্তির মাধ্যমে মার্কসীয় বহু পুস্তকাদি বাঙালি দর্শনের ক্রমবিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বাঙালি নামক ভূখণ্ডে প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল ধরে যেসব চিন্তাধারার আবির্ভাব হয়েছে তার পুরোটা হয়ত দর্শন চর্চা নয়, কিন্তু এর মধ্যে থেকেই বেরিয়ে এসেছে বাঙালি দর্শনের মূলভিত্তি। প্রাচীন ও মধ্যযুগ ছিল ধর্মভিত্তিক আলোচনায় সমৃদ্ধ। তবে বাঙালির চিন্তাচেতনায় আজ আধুনিক দর্শনের ছোঁয়া লেগেছে, যা বাঙালি দর্শনের জন্য একটি সুসংবাদ।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!