Answer

বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা কর।


অথবা, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
পৃথিবীর প্রতিটি জাতিরই স্বতন্ত্র সত্ত্বা রয়েছে। সংস্কৃতি রয়েছে, আছে নিজস্ব চিন্তাভাবনা। ঠিক তেমনিভাবে বাঙালি জাতিরও এরূপ স্বতন্ত্র সত্ত্বা বা পরিচয় রয়েছে। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি, চিন্তাধারা, ভাবদর্শন, সাহিত্য প্রভৃতি নিয়ে বাঙালির দর্শন গড়ে উঠেছে। বাঙালির দর্শন বলতে বাঙালির নিজস্ব ভাবধারা তথা জীবনদর্শনকে নির্দেশ করে। বাঙালি জাতিকে চিনতে হলে, জানতে হলে তার কালচারকে জানতে হবে। যে জাতির মধ্যে দর্শন চিন্তার উপাদান নেই, সে জাতির উন্নতি সুদূর পরাহত। বাঙালির দর্শন খুব বেশি উন্নততর না হলেও একেবারে মূল্যহীন তা কিন্তু বলা যাবে না।
বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য : বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি পৃথিবীর অন্যান্য দর্শনের মতো ততটা সহজ নয় বরং জটিল ও দুর্বোধ্য। নানা পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে বাঙালির দর্শন বর্তমান অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে। বাঙালি দর্শন পুরোপুরি নিজস্ব উপাদানের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে একথা বলা যাবে না। আমরা জানি বাঙালিরা শংকর জাতি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একনিষ্ঠভাবে বাঙালি দর্শনের স্বতন্ত্রতা বিবেচনা করার কোন সুযোগ নেই । নিচে বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো :
১. চর্যাপদ : বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি চর্যাপদকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছে। চর্যাপদের উপর ভিত্তি করেই বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে। চর্যাপদের গান ও কবিতাগুলো বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা রচনা করেছিলেন। চর্যাপদের এ উপাদান নিয়েই বাঙালি দর্শন প্রথমে একটি ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে তা একটি শক্তিশালী রূপ ধারণ করে।
২. সমান্তরাল প্রত্রিয়া : বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি একটি সমান্তরাল প্রক্রিয়া বা পদ্ধতির মধ্যদিয়ে বিকশিত হয়েছে।আমরা জানি পৃথিবীর প্রতিটি দর্শনই অতীত কিছু উপাদান বা চিন্তাধারাকে উপজীব্য করে গড়ে উঠে; বাঙালি দর্শনও এর ব্যতিক্রম নয়। বাঙালি দর্শনের সমান্তরাল প্রক্রিয়া তিনটি উপাদান কেন্দ করে বিকশিত হয়েছে। যথা:
পরানশাস্ত্র বা পুরান (Mythology)
দর্শন (Philosophy)
ধর্ম (Religion)
Mythology বা পৌরাণিক বিষয় জগত ও জীবনের ব্যাখ্যায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ উপাদান। হিন্দুধর্ম, ইসলাম ধর্ম,বৌদ্ধধর্মের অনেক বিষয় Mythology এর অন্তর্ভুক্ত। এখানে এমন কতকগুলো বিষয় আলোচিত হয় যা রহস্যের চাঁদরে ঢাকা। বেদ ও উপনিষদে হিন্দুধর্মের পৌরাণিক কাহিনীগুলো বর্ণিত আছে। গৌতম বুদ্ধের সাধনা ও অন্তর্ধান পৌরাণিক কাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়। বাঙালির বর্তমান চিন্তাধারায় এগুলোর প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় যেমন, চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মুসলিম রোমান্টিক প্রণয়উপাখ্যানগুলো এক ধরনের Mythology. এগুলোকে বাদ দিয়ে বাঙালি দর্শনকে কল্পনাও করা যায় না। বাঙালির দর্শনের চিন্তা আর্য, অনার্য ও ইংরেজদের হাত ধরে বিকশিত হয়েছে। প্লেটো, এরিস্টটল, সাইরেনাইক, সক্রেটিস প্রমুখের চিন্তাধারা বাঙালি দর্শনে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে নিয়েছে। আর ধর্ম বাঙালি দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্মকে বাদ দিয়ে বাঙালি দর্শনকে কল্পনাও করা যায় না। বাঙালি দর্শন হলো ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত একটি দর্শন। অনেকে বাঙালি দর্শনকে ধর্মীয় দর্শন বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে। বাঙালি দর্শনের গতি প্রকৃতিতে সমান্তরাল ধারা বিরাজমান রয়েছে।
৩. পাশ্চাত্য দর্শনচিন্তা ও বাঙালির দর্শন : বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যগুলো মূলত পাশ্চাত্য দর্শনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা ভারতের শাসনভার গ্রহণ করার পর থেকেই পাশ্চাত্য চিন্তধারা এদেশের চিন্তাভাবনা প্রবেশ করতে শুরু করে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, অক্ষয়কুমার দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, স্যার সৈয়দ আহমেদ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পাশ্চাত্য দার্শনিকদের চিন্তাধারা বাঙালির জীবনে প্রবেশ করে। ১৮৩৫ সালে ইংরেজি ভাষাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করা হলে ইংরেজি সাহিত্যের চর্চা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ফলে পশ্চিমা সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক বাঙালির জীবনকে প্রভাবিত করে। যা
বাঙালির দর্শনের ধারাকে প্রাণ দান করে।
৪. বাঙালি দর্শনের গতি ধারায় ভারতীয় দর্শনের প্রভাব : বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতিতে ভারতীয় দর্শনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। চার্বাক, জৈন, বৌদ্ধ, সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, যোগ দর্শনের বিভিন্ন দিক বাঙালি দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চার্বাক, দর্শনের ভোগের ধারণা, বৌদ্ধ দর্শনের নির্বাসের ধারণা, হিন্দুধর্মের মোক্ষের ধারণা, ন্যায় দর্শনের নিরীশ্বরবাদী ধারণা, সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতি ও পুরুষের ধারণা, ন্যায় দর্শনের জগত ও ব্রহ্মের ধারণা, ভারতবর্ষে আগত বিভিন্ন সুফিদের মতামত ও ধর্মচিন্তা বাঙালির দর্শনে প্রবেশ করেছে। এগুলোর মধ্যদিয়েই জড়বাদ, অস্তিত্ববাদ, ঈশ্বরবাদ, নিরীশ্বরবাদ একটি স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। যা বাঙালি দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৫. বেদ ও উপনিষদ : বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য বেদ ও উপনিষদের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। বেদ ও উপনিষদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, আচার-প্রথা, বিধি নিষেধ বাঙালি দর্শনে প্রবেশ করেছে। ফলে বাঙালি দর্শন সমৃদ্ধ লাভ করেছে। বর্তমানে হিন্দু সমাজে যে পূজাপার্বন দেখা যায় তা বেদ ও উপনিষদ থেকে এসেছে। এগুলো বাঙালি দর্শনের গতিধারাকে শক্তিশালী করেছে, প্রাণ দান করেছে।
৬. রূপান্তরকরণ বা ট্রানজিশান : রূপান্তরকরণ বা ট্রানজিশন বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতির একটি স্বাভাবিক রূপ বা প্রক্রিয়া। পৃথিবীর অন্যান্য দর্শনের ন্যায় বাঙালির দর্শনেও এ বিষয়টি স্থান লাভ করেছে। এ রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন উপাদান থেকে যে বিষয়গুলো বাঙালির চিন্তাভাবনায় প্রবেশ করেছে সেগুলো কালক্রমে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন : প্রত্যক্ষবাদ (Positivisn), উপযোগবাদ (Utilitarianison), মার্কসবাদ (Marxison), অগাস্ট কোঁতের প্রত্যক্ষবাদ, জেমস মিলের উপযোগবাদ, কার্ল মার্ক্সের মার্কসবাদ রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বাঙালির দর্শনে প্রবেশ করেছে। এ রূপান্তর প্রক্রিয়া বাঙালি দর্শনকে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
৭. দ্বিকোটিক চিন্তাধারা : বাঙালির দর্শনের গতিপ্রকৃতিতে দ্বিকোটিক চিন্তধারা বা দ্বিকোটিক বিভাগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দ্বিকোটিক প্রক্রিয়ায় কোন বিষয়কে প্রথমে ও না এ দুই প্রক্রিয়ায় ভাগ করা হয়। এরপর যুক্তি ও বুদ্ধির আলোকে সত্যতা যাচাই করা হয়। এটি বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
৮. মানবতাবাদ : বাঙালির দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মানবতাবাদ অন্যতম। কিভাবে মানুষের বৃহত্তর কল্যাণ সাধন করা যায় সেটাই মানবতাবাদ চেষ্টা করে। বাঙালি দর্শনের গতি প্রকৃতিতে মানবতাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। সকল ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানবকল্যাণ। এ মানবকল্যাণের ধারণা পাশ্চাত্য দর্শন থেকে বাঙালির দর্শনে প্রবেশ করেছে।
৯. দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া : হেগেল প্রবর্তিত দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মূল কথা ছিল সবকিছুই এক সময় পরম সত্তায় বিলীন হয়ে যায়। কার্ল মার্কস এর মতে, হয়, প্রতিময়, এবং সমন্বয় এ প্রক্রিয়ায় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি পরিচালিত হয় তা ব্যাখ্যা করেন। বাঙালি সংস্কৃতিতে এ দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি প্রবেশ করেছে। বাঙালিরা বিভিন্ন দর্শন চিন্তাধারার বিভিন্ন দিক বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রহণ বা বর্জনের পথে অগ্রসর হয়েছে।
১০. ইসলামি চিন্তাধারা : ইসলামের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ (স.) এর মক্কা বিজয়ের পর পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধি পায়। ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলা বিজয়ের পর এদেশের সংস্কৃতিতে ইসলামি চিন্তাধারা অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, সাধন পদ্ধতি প্রবেশ করে।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য একটি অনন্য সাধারণ ঘটনা। পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতি ও দর্শন চিন্তাধারার বিভিন্ন উপাদান বাঙালি সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে বাঙালি সংস্কৃতিকে একদিকে যেমন গতিদান করেছে অন্যদিকে করেছে সমৃদ্ধ। এজন্য বাঙালি দর্শনকে বলা হয় সমন্বয়বাদী, মানবতাবাদী, রূপান্তরবাদী দর্শন। তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় আর তা হলো বিভিন্ন দর্শনের প্রভাব বাঙালি দর্শনে প্রবেশ করলেও বাঙালি দর্শন তার স্বতন্ত্রতা হারায়নি বরং আপন মহিমায় সামনের দিকে এগিয়ে গেছে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!