ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি আলোচনা কর।

অথবা, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তোমার অভিমত দাও।
অথবা, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা কর।
উত্তর।। ভূমিকা :
সাধারণত জগৎ ও জীবন সম্পর্কে যৌক্তিক আলোচনার নাম দর্শন। দর্শনের বিভিন্ন শাখার মধ্যে অন্যতম হলো বাঙালি দর্শন। বাঙালি দর্শন হলো বাঙালি জাতির চিন্তাচেতনা, ধ্যানধারণা, ভাবধারা, মনোভাব,আবেগ, অভিজ্ঞতা, সংস্কার, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি ইত্যাদির সমষ্টি। এ বাঙালি জাতির রয়েছে বৈচিত্র্যময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ বৈচিত্র্যময় ইতিহাস, ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে লালন করে আসছে বাঙালি জাতি। এসব ঐতিহ্য, রূপ, বৈচিত্ৰই
ঠিক করে দিয়েছে বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি।
বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তির পিছনে যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব, ইসলাম ধর্ম, বেদ, গীতা, মহাভারত, বিচারবাদী দর্শন, মার্কসবাদ ইত্যাদি। এসব বিষয়ই বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। নিম্নে বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি আলোচনা করা হলো :
১. বৌদ্ধদর্শন : বাঙালি দর্শনে বৌদ্ধদর্শন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর ফলে বাঙালি দর্শন দুঃখ নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। গৌতম বুদ্ধ তাঁর দর্শনে দুঃখ নিয়ে আলোচনা করেছেন। দুঃখ কি? দুঃখের কারণ কি এবং কি করে এ দুঃখকে লাঘব করা যায়? এসব বিষয় বাঙালি দর্শনে প্রবেশ করেছে এবং দুঃখ থেকে মুক্তি সম্পর্কে বাঙালি দর্শন সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে।
২. বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান : বাঙালি দর্শনে বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। ফলে বিভিন্ন ধর্মের বৈশিষ্ট্য বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বাঙালি দর্শনে হিন্দু,মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্মের প্রভাব বিদ্যমান। এসব ধর্ম তাদের নিজ নিজ কৃষ্টি, সংস্কৃতি লালন করে বাঙালি দর্শনে জায়গা করে নিয়েছে। মানুষের চিন্তায়, কর্মে এসব ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ে বিভিন্ন ধর্মের প্রভাব কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
৩. সাহিত্য, শিল্পকলা ও সংস্কৃতি : বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ে সাহিত্য, শিল্পকলা ও সংস্কৃতির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য, শিল্পকলা ও সংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি জাতির গৌরব। বাঙালির সাহিত্য চর্চা পৃথিবীর অন্যান্য মানুষের অনুসরণীয়। বাঙালির শিল্পকলা জগৎ বিখ্যাত এবং বাঙালির সংস্কৃতি চর্চা বাঙালির অন্যান্য বৈশিষ্ট্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
৪. বাঙালির চিন্তা-সাধনা : বাঙালির চিন্তা-সাধনার পিছনে দু’টি দিক রয়েছে। ব্যবহারিক দিক এবং মানসিক উৎকর্ষ সাধন। ব্যবহারিক দিক হলো দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটানোর উদ্দেশ্যে চিন্তা-সাধনা এবং মানসিক দিক হলো কি করে এসব প্রয়োজন মিটানো যায় তার উপায় বিশ্লেষণ।
৫. ধর্মীয় প্রভাব : বাঙালি দর্শনে হিন্দু, মুসলিম প্রভৃতি ধর্মের প্রভাব বিদ্যমান। হিন্দুধর্মের মহাভারত, গীতা, বেদ প্রভৃতি গ্রন্থ বাঙালি দর্শনে প্রভাব বিস্তার করে আছে, তেমনি ইসলাম ধর্মও প্রাচীন ও মধ্যযুগে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এসব ধর্মের প্রভাব বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করতে সাহায্য করেছে।
৬. বিভিন্ন যুগের প্রভাব : বাঙালি দর্শনে বিভিন্ন যুগের প্রভাব বিদ্যমান। বাঙালি দর্শনের তিনটি যুগ। যথা : প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ।
ক. প্রাচীন যুগ : বাঙালি দর্শন ও মনন সাধনার ইতিহাস সুপ্রাচীনকালেও বিদ্যমান ছিল। ইতিহাসের সে সুপ্রাচীনকালে যখন বাংলা ভাষা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় নি ভালোভাবে, যখন শিল্প সাহিত্য, জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা করা হতো সংস্কৃত ভাষায়, তখনও বাঙালি চর্চা করেছে মানবতত্ত্বের। অর্থাৎ বাংলা ভাষা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক পূর্ব থেকেই বাঙালির যুক্তিবাদী ও ভাববিলাসী দর্শনচিন্তায় মানব ভাবনা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এ ধরনের যুক্তিনিষ্ঠ ও মানববাদী দর্শন চর্চা করেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন শ্রীধর দাস। তাঁর ন্যায়কন্দলি, অভ্যুদয় সিদ্ধি ও তত্ত্ববোধ সংগ্রহ প্রভৃতি দার্শনিক গ্রন্থ প্রাচীন বাংলার দার্শনিক ঐতিহ্যের পরিচায়ক। প্রাচীন যুগে দর্শন চর্চায় যারা কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে মল্লিকার্জুন সুরী, ভবদেব ভট্ট, হলায়ুধ ও শ্রীহর্ষ উল্লেখযোগ্য।
খ. মধ্যযুগ : প্রাচীন যুগে বাঙালির চিন্তাধারায় ও দর্শন চর্চায় যে ঐতিহ্য গড়ে উঠে তা আরও বিকশিত হয় মধ্যযুগে।মধ্যযুগে বাঙালির দর্শন চর্চার পরিচয় দিতে গিয়ে জনৈক আধুনিক পণ্ডিত মনে করেছেন, মধ্যযুগের বাঙালির ইতিহাসও নিছক ভাববিলাস কিংবা পরলোক চর্চার ইতিহাস নয়। সেদিনের বাঙালি তার বাংলা ভাষার জন্য সংস্কৃত ভাষা থেকে যেটুকু ভিত্তি সংগ্রহ করেছিল তার উপর সে রচনা করেছিল তার যুক্তিবাদী দার্শনিক ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যের অনুশীলনেই মধ্যযুগের বাংলায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে নব্য ন্যায় এবং ব্যাপকভাবে চর্চা করা হয় স্মৃতিশাস্ত্রের। মধ্যযুগের বাঙালি পণ্ডিতদের মধ্যে হরিদাস ন্যায়ালঙ্কার, রঘুনাথ শিরোমণি, কণাদ তর্কবাগীশ, জগদীশ তর্কালঙ্কার, জয়রাম পঞ্চানন, হরিনাথ তর্কবাগীশ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
গ. আধুনিক যুগ : বাঙালির চিন্তাচেতনায় প্রাচীন ও মধ্যযুগে মানবসমীক্ষা নিয়ে যে মনন সাধনা শুরু হয় তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে উনিশ শতকের শুরুতে বাঙালির নবজাগরণের মধ্য দিয়ে। এ সময়ে বাঙালির চিন্তাকাশে সংগঠিত হয় এক প্রভাবিত ভাববিপ্লব। বাঙালি জাতি সেকেলে ধ্যানধারণা পরিহার করে নতুন করে ভাবার, কল্পনা করার, শেখার,জানার, আকার গড়ার, করার এবং উদ্ভাবন করার প্রতি মনোনিবেশ করে। এ সময়ে দর্শন, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা,
রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদিতে অনেক পরিবর্তন সূচিত হয়।
৭. মানব সম্পর্কিত আলোচনা : বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি মানুষকে ঘিরে। বাঙালি, বৌদ্ধ, মুসলিম সকল দর্শনে মানুষকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বৌদ্ধ দর্শনে মানুষের দুঃখের কারণ, দুঃখ হতে কিভাবে মুক্ত হয়ে মানুষ সুখেশান্তি তে থাকতে পারে সে সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছে। মুসলিম দর্শনে সুফিবাদ এবং বেদান্ত দর্শনেও মানুষকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাই বলা যায়, বাঙালি দর্শন মানবতাবাদের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৮. বুদ্ধিবাদ : বুদ্ধিবাদ বাঙালি দর্শনের গতি প্রকৃতি নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রবীন্দ্রনাথ, রাজা রামমোহন রায়, সৈয়দ আমীর আলী সাধারণ মানুষকে কুসংস্কার ও প্রাচীন ভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে এসে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করার পথ দেখিয়েছেন।
৯. বিচারবাদ : বাঙালি দর্শনে বিচারবাদ বাঙালি জাতির চিন্তাচেতনার পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে,বাঙালি জাতি আজ কোনকিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস করে না। প্রতিটি বিষয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে। এর ফলে জাতীয় জীবনে প্রতিটি বিষয় স্পষ্ট, প্রাগুলভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
১০. অধ্যাত্মবাদ : বাঙালি দর্শনে অধ্যাত্মবাদের প্রভাব লক্ষণীয়। গীতা, মহাভারত, বেদ প্রভৃতি গ্রন্থে অধ্যাত্মবাদ লক্ষ্য করা যায়।
১১. বাস্তববাদ : অধ্যাত্মবাদের পাশাপাশি বাঙালি দর্শনে বাস্তববাদের প্রভাব লক্ষণীয়। চার্বাক দার্শনিকরা হলো বাস্তববাদী। তাঁদের মতে, বাস্তবে আমরা যা দেখি, প্রত্যক্ষ করি তাই সত্য। এর বাইরে কোনকিছু সত্য নয়।
১২. উপযোগবাদ : বাঙালি দার্শনিকদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর,অক্ষয়কুমার দত্ত, কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ দার্শনিক উপযোগবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁদের মতে, অধিকসংখ্যক লোকের জন্য যা সুখকর তাই ভালো।
১৩. প্রত্যক্ষবাদ : প্রত্যক্ষবাদ বাঙালি দর্শনে অতি গুরুত্বপূর্ণ। যেসব দার্শনিক প্রত্যক্ষবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, গুরুদাস চ্যাটার্জী, যোগেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ, দ্বারকানাথ মিত্র উল্লেখযোগ্য।
১৪. সমাজতন্ত্র : বাঙালি দর্শনে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। বাঙালি বহু বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক,ছাত্র, সাহিত্যিক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত। এসব দার্শনিকের মধ্যে কমরেড মোজাফফর আহমেদ,মানবেন্দ্রনাথ রায় উল্লেখযোগ্য।
১৫. সমন্বয়ী ভাববাদ : বুদ্ধিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের মাঝামাঝি হলো সমন্বয়ী ভাববাদ। ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব সমস্বয়ী ভাববাদ দ্বারা প্রভাবিত। তিনি সকল দর্শনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার চেষ্টা করেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা হতে বলা যায় যে, বাঙালি দর্শনের গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ে আলোচ্য বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সুপ্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত বাঙালি দর্শনে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সেটি হলো মানুষ। মানুষকে নিয়েই প্রতিটি দর্শন আলোচনা করেছে, বাঙালি দর্শনও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই বাঙালি দর্শনের গুরুত্ব কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!