Answer

বাঙালি দর্শনের উৎসসমূহ আলোচ না কর।

অথবা, বাঙালি দর্শনের উৎসগুলো ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনের উৎসগুলো কী কী? বর্ণনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনের উৎসসমূহ কী কী? ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনে কী কী উৎস রয়েছে? বিশ্লেষণ কর।
উত্তর।। ভূমিকা :
বাঙালির দর্শন চর্চার ইতিহাস অতি অধ্যাত্মবাদী চিন্তাধারা গড়ে ওঠে। প্রাচীন অস্ট্রিক-দ্রাবিড় জাতির নিজস্ব দর্শন ছিল। কালক্রমে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী বাংলা ভূখণ্ডে বসতি গড়ে তোলে।ফলে তাদের চিন্তাধারা বাঙালির চিন্তাধারার সাথে মিশে মিশ্র ভাবধারা গড়ে উঠে। দর্শনের ইতিহাসে যাকে অনার্য ও আর্যের সংমিশ্রণ বলা হয়। এ মিশ্রণের ধারাবাহিকতা চলতে থাকে এবং সবশেষে মুসলিম ও পাশ্চাত্য ধ্যানধারণা যুক্ত হয়। আর তাই বলা হয়ে থাকে যে, বিভিন্ন যুগে বাঙালির চিন্তামননে জগৎ, জীবন, ধর্ম, সাহিত্য,সংস্কৃতি, সমাজ ও অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে যে দার্শনিক মতবাদ গড়ে উঠেছে তাই বাঙালির দর্শন।
বাঙালি দর্শনের উৎস বা উদ্ভব : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে ছয়টি প্রধান চিন্তাধারা ভিত্তি হিসেবে
কাজ করেছে। সেগুলো হলো :
১. প্রাক বৈদিক চিন্তাধারা
২. বৈদিক চিন্তাধারা
৩. বেদ বিরোধী চিন্তাধারা
৪. ইসলামি চিন্তাধারা
৫. মরমি চিন্তাধারা
৬. পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বিচারধর্মী চিন্তাধারা।
নিম্নে এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. প্ৰাক বৈদিক চিন্তাধারা : বাঙালি দর্শনের প্রথম বীজ রোপণ হয় প্রাক বৈদিক চিন্তাধারায়। এ চিন্তাধারার উৎপত্তি হয় প্রাচীন বাংলার অনার্যদের কাছ থেকে। অনার্যরা সুসভ্য সংস্কৃতি পরায়ণ ছিলেন। অনার্যদের এ দর্শনকে বলা হয় লোকায়ত দর্শন। এ দর্শন ছিল বস্তুবাদী, বেদ বিরোধী ও প্রত্যক্ষবাদী। লোকায়তরা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণকে জ্ঞানের একমাত্র উপায় মনে করত। তাঁদের মতে, ইন্দ্রিয় সুখই মানবজীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। তারা মনে করত এ জগৎ সুখ ও দুঃখে পরিপূর্ণ। তারা বলে, এ জগতে দুঃখ আছে বলে সুখান্বেষণ থেকে বিরত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাদের এ মতধারা
বাংলাদেশ দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২. বৈদিক চিন্তাধারা : বাংলায় আর্যদের আগমনের পর তাঁদের চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপন নিয়ে যে চিন্তাধারা গঠিত হয় তাই বৈদিক চিন্তাধারা। বৈদিক চিন্তাধারায় বস্তুবাদের স্থলে ভাববাদ ও অধ্যাত্মবাদের বিকাশ ঘটে। তাঁদের চিন্তাধারায় পারলৌকিক তথা সৃষ্টিকর্তার অধ্যাত্মবাদ ফুটে উঠে। বিভিন্ন পূজা, মুক্তির উপাসনার মাধ্যমে তাঁদের দর্শন বিকাশ লাভ করে, যা বাঙালি দর্শনের এক বিরাট অংশ। তাই দেখা যায়, বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে বৈদিক চিন্তাধারার অবদান অনস্বীকার্য।
৩. বেদ বিরোধী চিন্তাধারা : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশে আর একটি মৌলিক চিন্তা হলো বেদ বিরোধী মত। বেদ বিরোধী চিন্তাধারায় তিনটি ধর্মীয় দর্শনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যথা :
ক. চার্বাক দর্শন,
খ. জৈন দর্শন ও
গ. বৌদ্ধ দর্শন।
ক. চার্বাক দর্শন : চার্বাক দর্শন কোন প্রকার প্রত্যাদেশে বিশ্বাসী নয়। ‘প্রমাণই’ এ দর্শনের জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায়। প্রত্যাদেশ নির্ভর চিন্তাধারাকে গ্রহণ করে এ দর্শন বাঙালিদের স্বাধীন চিন্তাধারার পথ উন্মুক্ত করেছে।
খ. জৈন দর্শন : অহিংসাই জৈন দর্শনের মূলমন্ত্র। বেদ বিরোধী ভেজন দর্শনের প্রভাবও বাঙালি দর্শনে কম নয়। এ দর্শন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
গ, বৌদ্ধ দর্শন : বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব বাঙালি দর্শনের উৎস ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা বুদ্ধদেবের জীবদ্দশায় কিছু ভিক্ষু বাংলাদেশে আসেন এবং ধর্ম প্রচার করেন। বৌদ্ধধর্মের প্রভাব এ দেশে প্রকৃতিবাদী ও প্রয়োজনবাদী সর্বোপরি মানবতাবাদী দর্শনের চিন্তার বিকাশ ঘটে।
৪. ইসলামি চিন্তাধারা : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে ইসলামি চিন্তাধারা এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যযুগে ইসলামি চিন্তাধারার সাথে এ দেশের তত্ত্বধারার সংমিশ্রণ হয়। এ সংমিশ্রণ হয় আরবদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে। সুফিবাদ বাংলার মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ দেশের জনগণের মধ্যে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয় এবং সৃষ্টি হয় নতুন পথ সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা। এভাবে বাঙালি দর্শনে যোগ হলো নতুন চিন্তাধারা।
৫. মরমি চিন্তাধারা : বাঙালি দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে আর একটি চিন্তাধারা যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। সেটি হলো মরমি চিন্তাধারা। এ দেশজ মরমিবাদের দুটি ধারা রয়েছে। যথা
ক. বৈষ্ণববাদ ও
খ, বাউল তত্ত্ব
ক. বৈষ্ণববাদ : বৈষ্ণববাদ এ দেশে প্রেম ও ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষকে আপন করে নিয়েছিল।
খ. বাউল তত্ত্ব : বাউল তত্ত্ব আবহমান বাংলার পথঘাট, সুশীতল বাতাস, প্রান্তর তথা বাংলার প্রকৃতির প্রাধান্য দিয়ে গানে গানে পরিচিত হয়।
৬. পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বিচারধর্মী চিন্তাধারা : বাংলাদেশ দর্শনের ক্রমবিকাশের তথা পূর্ণতা লাভের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ বিচারধর্মী চিন্তাধারার প্রভাব অপরিসীম। এ চিন্তাধারা আবার তিনটি দার্শনিক তত্ত্বের মাধ্যমে বিকাশ ঘটে। তা হলো।
ক. প্রত্যক্ষবাদ,
খ. উপযোগবাদ ও
গ. মার্কসবাদ।
ক. প্রত্যক্ষবাদ : আধুনিক যুগে বাঙালি দর্শনে ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁতের প্রত্যক্ষবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে। যেসব বাঙালি দার্শনিকরা প্রত্যক্ষবাদের প্রভাবে প্রভাবিত হন তাঁদের মধ্যে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, যোগেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ ও দ্বারকানাথ প্রমুখ। বিংশ শতকে বাংলাদেশেও সাহিত্যকর্মে প্রত্যক্ষবাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
খ. উপযোগবাগ : আধুনিক যুগে যেসব পাশ্চাত্য চিন্তাধারা বাংলাদেশ দর্শনকে প্রভাবিত করেছে তার মধ্যে উপযোগবাদ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। উপযোগবাদের প্রবর্তক হলেন বেন্থাম, জেমস মিল ও জন স্টুয়ার্ট মিল। আর যারা এ উপযোগবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন তারা হলেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবাব আব্দুল লতিফ, কাজী আব্দুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ।
গ. মার্কসবাদ : বাংলাদেশ দর্শনের ক্রমবিকাশে মার্কসবাদের অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিনিময় মুক্তির মাধ্যমে মার্কসীয় বহু পুস্তকাদি বাংলাদেশ দর্শনের ক্রমবিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া গোবিন্দচন্দ্র দেব,আব্দুল হাই, আমিনুল ইসলাম, আব্দুল মতিন ও সাইদুর রহমান প্রমুখ দার্শনিক বাংলাদেশ দর্শনকে আরও নতুন করে একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল ধরে যেসব চিন্তাধারার আবির্ভাব হয়েছে তার পুরোটা হয়ত দর্শন চর্চা নয়, কিন্তু এর মধ্যে থেকেই বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ দর্শনের মূলভিত্তি। প্রাচীন ও মধ্যযুগ ছিল ধর্মভিত্তিক আলোচনায় সমৃদ্ধ। তবে বাঙালির চিন্তাচেতনায় আজ আধুনিক দর্শনের ছোঁয়া লেগেছে, যা বাংলাদেশ দর্শনের জন্য একটি সুসংবাদ।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!