বাঙালি দর্শনের উপর ধর্মের প্রভাব কতটুকু? আলোচনা কর।

অথবা, বাঙালি দর্শন কী? বাঙালি দর্শনতত্ত্বে ধর্মের প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, “বাঙালি দর্শন ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত দর্শন”- উক্তিটির আলোকে বাঙালি দর্শনে ধর্মের প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনে ধর্মের প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশ দর্শনে ধর্মের প্রভাব বর্ণনা কর।
উত্তর।। ভূমিকা :
ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, অন্যান্য অনেক অগ্রসরমান জাতির মতো বাঙালির দর্শন চিন্তাও ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। বাঙালি দর্শনকে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক এ তিন যুগে ভাগ করা হয়েছে যার প্রত্যেকটি যুগই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। জগৎ ও জীবনের স্বরূপ ও গূঢ়ার্থ আবিষ্কার এবং যথার্থ মানবোচিত জীবনের অনুসন্ধানসহ মানুষকে নিয়ে মানুষের ভাবনা বাঙালি দর্শন চিন্তায় একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যরূপে দেখা দিয়েছে সকল যুগে। বাঙালির জীবনের সাথে যুগে যুগে ধর্ম অবিচ্ছেদ্যভাবে রয়েছে। ধর্মকে বাদ দিয়ে বাঙালির জীবন ও চিন্তাচেতনার প্রবাহ প্রায় অসম্ভব। তাই দেখা যায় বাঙালির চিন্তা ও মনন ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত।
বাঙালি দর্শন : ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় অন্যান্য প্রাগ্রসর জাতির মতো বাঙালির দর্শনচিন্তাও ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। বাঙালির দর্শনের তিন যুগে (প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক) বাঙালি দর্শন বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়ে জগজ্জীবনের স্বরূপ ও গূঢ়ার্থ আবিষ্কার এবং যথার্থ মানবোচিত জীবনের অনুসন্ধানসহ মানুষকে নিয়ে মানুষের ভাবনা বাঙালির দর্শনচিন্তায় একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যরূপে দেখা দিয়েছে। তাই বলা যায়, বাঙালি দর্শন হলো বাঙালির ধ্যানধারণা, চিন্তা, মনন, ভাবধারা, মতামত, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদির সংমিশ্রণ।
বাঙালি দর্শন নিছক দুঃখবাদী কিংবা ভাববিলাসী দর্শন নয়, বাঙালি দর্শন হলো জগৎ ও জীবনের সাথে সম্পর্কিত দর্শন। তাই বলা যায়, বাংলা ও বাংলার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যময় রূপ ও রসের মাধুর্যে আপ্লুত হয়ে মরমি চেতনায় উদ্ভূত যে দর্শন তাকেই বাঙালি দর্শন বলে অভিহিত করা হয়।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্নভাবে বাঙালির দর্শনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে তাঁদের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা প্রদান করা হলো :
বাঙালির দর্শনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ড. প্রদীপ কুমার রায় বলেছেন, “যে প্রজ্ঞাময় দর্শন বাংলাদেশের আবহমানকালের বিশাল পটভূমিতে, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এ সময় পর্যন্ত বিবর্তিত হয়েছে তাই বাঙালির দর্শন।”
অধ্যাপক সাইদুর রহমান বাঙালি দর্শন সম্পর্কে বলেন, “বাঙালি দর্শন কেবল সমদর্শন নয়, খালি পরলোক চর্চা নয়,তত্ত্ববিদ্যার নিছক রোমন্থন ও কসরত নয়, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের যে কোনো সার্থক দর্শনের ন্যায় বাঙালি দর্শনও মূলত জীবনদর্শন, উন্নত মানবজীবন প্রণয়ন ও যাপনের উপায়ানুসন্ধান।”
অধ্যাপক মফিজউদ্দিন আহমেদ বাঙালি দর্শন সম্পর্কে বলেন, “বাঙালি দর্শন মুক্তি বা মোক্ষলাভকে কেন্দ্র করে গড়ে
উঠেছে।”
সুতরাং উপরের আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, বাঙালির দর্শন হলো বাঙালির শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিন্তাচেতনা, মনন ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচিত জীবনদর্শন।
বাঙালি দর্শনের উপর ধর্মের প্রভাব বা উক্তিটির ব্যাখ্যা : বাঙালির দর্শন ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত দর্শন। ধর্মকে কেন্দ্র করেই সুদূর অতীত থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাঙালির দর্শনচিন্তা আবর্তিত হয়েছে। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন সময়ে সে সব ধর্মের উত্থান ঘটেছে দর্শন তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ধর্মতত্ত্বের মধ্যে দর্শন স্বতন্ত্র আলোচ্য ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে। তাই ধর্মকে বাদ দিলে বাঙালির দর্শন যেমন পূর্ণতা পায় না তেমনি দর্শনে ধর্মের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। নিম্নে বাঙালির দর্শনচিন্তায় ধর্মের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র ঐতরেয় আরণ্যকের প্রভাব : বাংলা বা বঙ্গদেশ সম্পর্কে আমরা সর্বপ্রথম ঐতরেয় আরণ্যক এ আলোচনা দেখতে পাই। সেখানে বঙ্গদেশে বসবাসকারী বাঙালিকে বয়াংসি বা পক্ষি জাতীয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে।এভাবে বৈদিক ধর্মগ্রন্থ বা সাহিত্যে আমরা বাঙালি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করি। তাই বলা যায় বাঙালি জাতিসত্তার ব্যাখ্যায় ধর্ম প্রভাব বিস্তার করে আছে।
২. বাঙালির সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাব : প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধর্ম মানুষের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। সভ্যতার ইতিহাসের মতোই ধর্মের ইতিহাস প্রাচীন। অন্যান্য জাতির মতো বাঙালিরও নিজস্ব ধর্মবোধ রয়েছে। বাঙালির সমাজ সংস্কৃতি ও অন্তর্জগতে এ ধর্মবোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাঙালির সংস্কৃতির ইতিহাসকে ধর্মের ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হবে না।
৩. বাঙালির দর্শনে যোগতান্ত্রিক জীবনবাদের প্রভাব: যোগতান্ত্রিক জীবনবাদকে অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান ‘বাঙালির ধর্ম ও বাঙালির জীবন সাধনা” বলে উল্লেখ করেন। তিনি উল্লেখ করেন,…. এই যোগতান্ত্রিক জীবনবাদ বাঙালির মানসে ও মননে, চিন্তায় ও ধ্যানে এমন ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে, যার ফলে বহিরাগত কোনো ধর্মই বাঙালির জীবনে-সংস্কৃতিতে, মননে, ইতিহাসে কোনো পর্যায়েই স্থায়ী আসন লাভ করতে পারে নি। বরং বাঙালির ধর্মচেতনা, বিশ্বাস, নীতিবোধ প্রভৃতি বহিরাগত ধর্ম মতের উপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। বাঙালির এ ধর্মসাধনা ও যোগতান্ত্রিক জীবনবাদে বাঙালি স্বাধীন মনোবৃত্তি তথা জীবনদর্শনের পরিচয় দিয়েছে সবসময়। আর এভাবেই বাঙালির ধর্মদর্শন স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে আছে প্রতিটি বাঙালির প্রাণে।
৪. বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয় ও দর্শনতত্ত্ব : বাঙালি জাতির মধ্যে বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। এসব ধর্মের অন্তর্গত বিভিন্ন তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন পণ্ডিত এগিয়ে এসেছেন। তাঁরা মূল তত্ত্বের উপর টীকা ভাষ্য রচনা করেন এবং এভাবেই তারা ধর্মতত্ত্বের দার্শনিক ব্যাখ্যা দাঁড় করান। তাই আমরা বলতে পারি বাঙালি দর্শন মূলত বাঙালি ধর্মের মৌলিক তত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত দর্শন।
৫. পরলোকমুখী ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত বাঙালি দর্শন : ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি ধর্মই পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক বাস প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এসব বিষয় আলোচনাকালে জীবনের পরম লক্ষ্য, ঈশ্বরবাদ, অবতারবাদ, ধর্মবাদ, জন্মান্তরবাদ, ভবচক্র প্রভৃতি বিষয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাঙালি দার্শনিকগণ এসব তত্ত্বের গূঢ়ার্থ নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। ফলে একদিকে অধ্যাত্মবাদী দর্শন অপরদিকে বস্তুবাদী দর্শনের বা দৃষ্টিভক্তির বিকাশ ঘটেছে।
৬. আবেগ অনুভূতি ও মুক্তি বিকারের সমন্বয় : বাঙালি দর্শনে আমরা ধর্মীয় বিশ্বাস, আবেগ অনুভূতির সাথে ধর্মনিরপেক্ষতা, বস্তুবাদ, ঐহ্যিক ধারা প্রভৃতির সমন্বয় লক্ষ্য করি। ফলে আমরা এখানে ধর্ম প্রভাবিত বুদ্ধিবৃত্তির ও ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ম প্রবণতা, আধ্যাত্মিকতা, পারলৌকিক মানসিকতা, নীতিজ্ঞান প্রভৃতি সম্পৰ্কীয় সমন্বয়বাদী বা ধর্ম ও দর্শন দ্বারা প্রভাবিত সাধনতত্ত্ব লক্ষ্য করি যা বাঙালি দর্শনে ধর্মের প্রভাবের ফল শ্রুতিতেই হয়েছে।
৭. ন্যায়শাস্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত দর্শন : ভারতীয় উপমহাদেশে ন্যায়শাস্ত্র বলতে যুক্তিবিদ্যাকে বুঝানো হয়। বাঙালি ধর্মতত্ত্বের আলোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যুক্তির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোতে অনেক জায়গায় যুক্তির প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। ন্যায়শাস্ত্রের বিকাশের ধারা প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। বাঙালি দর্শনে ন্যায়শাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। বিশেষ করে পনেরো, ষোল ও সতেরো শতকে নব্য ন্যায়শাস্ত্রের ব্যাপক চর্চা হতে থাকে। ন্যায়পন্থি বাঙালি দার্শনিকদের মধ্যে হরিদাস, ন্যায়ালঙ্গার, রঘুনাথ শিরোমনি, কনাদ তর্কবাগীশ, জগদীশ তর্কালংকার, জয়রাম পঞ্চানন প্রমুখ দার্শনিক উল্লেখযোগ্য।
৮. মুসলিম ভাবধারার প্রভাব : বাঙালি দর্শনে মুসলিম ভাবধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়। ইসলাম ধর্মের বিস্তৃতির সাথে সাথে মুসলমানরা বাংলা ভূখণ্ডে আসে বিজেতা হিসেবে। স্থানীয় ভাবধারার সাথে তারা উন্নত মধ্য এশীয় মুসলিম ভাবধারার সমন্বয় ঘটান। ফলে ইসলামের অনেক বিষয় বাঙালি দর্শনচিন্তায় জায়গা করে নেয়।
৯. সুফি দর্শন তত্ত্ব : বাঙালি সংস্কৃতি ও চিন্তাজগতে সুফিবাদ একটি শক্তিশালী মতবাদ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে সুফিরা এদেশে এসে ইসলাম প্রচার করেন। তাদের আকর্ষণীয় জীবনযাপন প্রণালি বাঙালি সমাজের কাছে শিক্ষণীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। তাঁর যে অধ্যাত্মবাদ অনুসরণ করেন তা দ্বারা বাঙালি অনেক হিন্দু সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা অধ্যাত্মবাদের পাশাপাশি মানবতাবাদ সাম্য, মৈত্রী প্রচার করেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অসাম্প্রদায়িক। ফলে তা বাঙালি জীবনদর্শনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
উপসংহার : উপরের আলোচনার আলোকে আমরা বলতে পারি, বাঙালি দর্শনের উপর অন্য যে কোনো উপাদান বা বিষয় অপেক্ষা ধর্মের প্রভাব ছিল সর্বাধিক। বাঙালির পরিচয় থেকে শুরু করে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ধর্ম যে ব্যাখ্যা দিয়েছে বাঙালি দর্শনের মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বাঙালি দর্শনকে বিশ্লেষণ করলে আমরা ধর্ম ও দর্শন এ দুটি উপাদানকে পায়। অসাম্প্রদায়িক বাঙালি দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ধর্ম ও দর্শনের সমন্বয়ে মানবকল্যাণ সাধন করা।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!