ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাঙালি দর্শনের আলোকে ‘বাংলা ও বাঙালি’ প্রত্যয়গুলো বিশ্লেষণ কর।

অথবা, বাঙালি দর্শনের আলোকে বাংলা ও বাঙালি প্রত্যয়গুলো আলোচনা কর।
অথবা, বাঙালি দর্শনের আলোকে “বাংলা ও বাঙালি” ধারণা দুটি পর্যালোচনা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, অন্যান্য অনেক অগ্রসরমান জাতির মত বাঙালির দর্শন চিন্তাও ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। বাঙালি দর্শন প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক- এ তিন যুগে বিভক্ত। এ তিন যুগে বাংলাদেশের দর্শনচিন্তা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। জগৎ ও জীবনের স্বরূপ ও গূঢ়ার্থ আবিষ্কার এবং যথার্থ মানবোচিত জীবনের অনুসন্ধানসহ মানুষকে নিয়ে মানুষের ভাবনা বাঙালির দর্শন চিন্তায় একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যরূপে দেখা দিয়েছে সকল যুগে।
বাংলা ও বাঙালি প্রত্যয় : সাধারণত বাংলাভাষী জনসাধারণের আবাসভূমিকেই বাংলা বা বঙ্গদেশ এবং বঙ্গদেশীয় জাতিকে বাঙালি বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। নিম্নে এ দু’টি প্রত্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
১. আধুনিক পণ্ডিতদের মতে : আধুনিক পণ্ডিতদের মতে, বাংলা শব্দটি সর্বপ্রাচীন ‘ঐতরেয় আরণ্যকে’ দেখতে পাওয়া যায়। যেখানে বঙ্গবাসী বা বাঙালিদের বয়াংসি বা পক্ষি জাতীয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ঐতরেয় আরণ্যকে পুত্র বলেও আর একটি জাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পুণ্ড্রদের বলা হয়েছে দস্যু। এভাবেই বৈদিক সাহিত্যে আমরা বাঙালির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ লক্ষ্য করি।
২. বৌধায়ন ধর্মসূত্র : বৌধায়ন ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে এ দেশে সে সময় আর্যধর্ম ও তার ক্রিয়াকলাপ প্রচলিত না থাকায় ধর্মসূত্রে বঙ্গদেশে গেলে প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান দেওয়া হয়েছে। বৌধায়ন ধর্মসূত্র অনুযায়ী পুণ্ড্রদের অবস্থিতি ছিল উত্তরবঙ্গে আর বঙ্গদের মধ্য পূর্ববঙ্গে।
৩. রামায়ণ ও মহাভারত : রামায়ণ, মহাভারত এবং উত্তরকালীন অন্যান্য কাব্য, পুরাণ ও স্মৃতি ইত্যাদিতেও বঙ্গদেশের উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। উত্তরকালীন সাহিত্যে বঙ্গদেশের অধিবাসীদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা ঘৃণাজনিত মনোভাব পরিদৃষ্ট হয় না।
৪. আধুনিক পণ্ডিতদের গবেষণা : আধুনিক পণ্ডিতগণ গবেষণায় পেয়েছেন বঙ্গ শব্দটি। শুরুতে ছিল একটি কৌম গোষ্ঠীর নাম। পরে শব্দটি ভৌগোলিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল। কৌম গোষ্ঠীর নাম হিসেবে বঙ্গ শব্দটির সাথে বৈদিক যুগের আর্যরাও পরিচিত ছিল।
৫. বঙ্গ ও বঙ্গাল শব্দ দু’টি সমার্থক নয় : বঙ্গদেশ বলতে আমাদের সামনে যে বাঙালি, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার,উড়িষ্যা ও ত্রিপুরা রাজ্যকে নিয়ে সম্মিলিত বৃহৎ যুক্ত রাষ্ট্রের ছবি ভেসে উঠেছে, আদিবঙ্গ বা বঙ্গদেশের আয়তন সে রকম ছিল না। আবার বঙ্গ ও বঙ্গাল শব্দ দু’টিও সমার্থক নয়। কেননা এ শব্দ পৃথক দু’টি ভৌগোলিক স্থানকে নির্দেশ করে।
৬. বঙ্গ ও বাংলার অর্থ : বঙ্গ শব্দের দ্বারা বাংলায় এক ব্যাপক অংশকে বুঝাত, যার অবস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি ভাগীরথী নদীর পূর্বদিকে। ভাগীরথীর পশ্চিমাংশকে বলা হতো রাঢ় দেশ। রাঢ়ের উত্তর পশ্চিমাংশে ছিল অঙ্গ দেশ ও দক্ষিণে কলিঙ্গ। এ অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, গঙ্গা নিয়েই বাংলা।
৭. ড. নীহাররঞ্জন রায়ের মতে : ড. নীহাররঞ্জন রায় অবিভক্ত বাংলার সীমারেখা নির্দেশ করতে গিয়ে বলেছেন,উত্তরে হিমালয় এবং হিমালয়কৃত নেপাল, সিকিম ও ভুটান রাজ্য; উত্তর পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ ও উপত্যকা, উত্তর-পশ্চিম দিকে দ্বারবঙ্গ পর্যন্ত ভাগীরথীর উত্তর সমান্তরালবর্তী সমভূমি, পূর্বদিকে গারো, খাসিয়া, জৈন্তিয়া, ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম শৈলশ্রেণী বহে দক্ষিণ সমুদ্র পর্যন্ত; পশ্চিমে রাজমহল, সাঁওতাল, পরগনা, ছোটনাগপুর-মালভূমি-ধলভূম-কেওফর-ময়ূর ভাঞ্চুর,শৈলময় অরণ্যময় মালভূমি এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এ প্রাকৃতিক সীমা বিধৃত ভূমিখণ্ডের মধ্যেই প্রাচীন বাংলার গৌড়,পুণ্ড্র, বরেন্দ্র, রাঢ় সুহ্ম, তাম্রলিপ্ত সমতট, বঙ্গাল, হরিকেল প্রভৃতি জনপদ অবস্থিত।
৮. বাংলার উৎপত্তি : বাংলার উৎপত্তি সম্পর্কে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, বঙ্গাল শব্দের সাথে ফারসি প্রত্যয় অহ বা আ যোগ করলে বাঙ্গালাহ বা বাঙ্গালা নামের দেশের ফারসি নাম পাওয়া যায়। এ ফারসি বাঙ্গালাহ বা বাঙ্গালা থেকেই মধ্যযুগের বাংলা ভাষায় আধুনিক, বাংলা নামের উৎপত্তি।
৯. চর্যাপদে বাঙ্গাল ও বাঙালি : চর্যাপদেও বাঙ্গাল বা বাঙালি নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। ড. আহমেদ শরীফের মতে, চর্যাপদে বাঙ্গাল বা বাঙালি নামের মিলনেও বঙ্গ এর পরিবর্তে বাঙ্গাল বা বাঙ্গালা ব্যবহৃত হয় ইবনে বতুতার বৃত্তান্তে। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ স্বয়ং শাহই বাঙ্গালা নাম গ্রহণ করেন।
১০. বাঙালির উৎপত্তি সম্পর্কে হাসাদ শাস্ত্রী : বাঙালির উৎপত্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাঙালিকে একটি আত্মভোলা জাতি বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, “আমার বিশ্বাস বাঙালি একটি আত্মবিস্তৃত জাতি। বিষ্ণু যখন রামারূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তখন কোনো ঋষির শাপে তিনি আত্মাবিস্তৃত হয়েছিলেন। তিনি ধরাধামে এসে ঈশ্বরের লীলা করে গেছেন। কিন্তু তিনি যে ঈশ্বর একথা তিনি কখনো বলেন নি, কার্যে ও কর্মে দেখানও নি এবং কখনো তিনি স্মরণ করেন নি, বাঙালিও তেমনি।
১১. বাঙালির উৎপত্তি সম্পর্কে হার্বার্টি রিজলি : বাঙালির উৎপত্তি সম্পর্কে অধ্যাপক হার্বার্ট রিজলি বলেছেন, পাঞ্জাব,আচ্ছা, আবোাধ্যা, বিহার এবং রাজপুতনার অধিবাসীদের গড়ে শতকরা ৭৫ জনের মস্তক দীর্ঘ। পক্ষান্তরে, গুজরাট, মারাঠা,জ্বর্গ, উড়িয়া এবং বাংলার অধিবাসীদের গড়ে শতকরা প্রায় ৮০ জনের মস্তকের অনুপাত ৭৫ এর উপর। এর দক্ষিণে আবার তামিলল, মালারামল ভাবী, ব্রাবিভূগণ দীর্ঘস্তকবিশিষ্ট, গুজরাটি, মারাঠি, উড়িষ্যা ও বাঙালির মধ্যে চৌড়া মাথায় বাহুল্য দেখে তিনি সিদ্ধান্ত করেছেন উড়িয়া ও বাঙালিদের চৌড়া মাথা মঙ্গোল ও দ্রাবিড়ের মিশ্রণজাত। সুতরাং এ মঙ্গোল ও প্রাবিড় সোকেই বাঙালির উৎপত্তি।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, বঙ্গ থেকেই মূলত বাংলা ও বাঙালি প্রত্যয়গুলো এসেছে।বাঙ্গ শব্দটি বিভিন্ন মনীরী বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন। বিভিন্ন ব্যবহারের মাধ্যমে বঙ্গ শব্দটি বাংলা ও বাঙালির রূপ লাভ করেছে। কাজেই এ দু’টি শব্দ বর্তমানে বাঙালি দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!