ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাউল দর্শন ও সুফি দর্শনের মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য ব্যাখ্যা কর।

অথবা, বাউল দর্শন ও সুফি দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা কর।
অথবা, বাউল দর্শন ও সুফি দর্শনের মধ্যকার সম্পর্ক ও পার্থক্য ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাউল দর্শন ও সুফি দর্শনের মধ্যকার মিল ও অমিল ব্যাখ্যা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
মধ্যযুগীয় বাঙালি চিন্তায় বিকশিত দুটি উল্লেখযোগ্য দার্শনিক মতধারা হচ্ছে বাউল দর্শন ও সফি দর্শন। মধ্যযুগের বাঙালির জীবন, মনন ও সাহিত্য সাধনায় এ দুটি মতধারার প্রভাব ছিল অত্যন্ত কার্যকরী ও তাৎপর্যপূর্ণ। বাউল দর্শন বাঙালির নিজস্ব মননে বিকশিত বাঙালির স্বকীয় জীবন বৈশিষ্ট্য প্রসূত একটি দার্শনিক মতবাদ।অন্যদিকে, সুফি দর্শন বহিরাগত ইসলামি ভাবধারা প্রসূত একটি দার্শনিক মতবাদ হলেও বাংলায় বাঙালির চিন্তায় একটি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। অর্থাৎ ইসলামি ভাবধারা আগত সুফি দর্শন বাংলায় বাঙালির জীবনবোধের সাথে নব্যরূপ পরিগ্রহ করেছে। ফলে দুটি মতাদর্শই হয়ে উঠেছে বাঙালির নিজের দর্শন এবং উভয়ের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক গভীর সম্পর্ক। তুলনা করলে এই উভয় দর্শন তথা বাউল ও সুফি দর্শনের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য উভয়ই দেখতে মিশে পাওয়া যায় ।
বাউল দর্শন : বাঙালির নিজস্ব মনন বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে বাংলার নিজস্ব আবহে বিকশিত একটি সাধনাশ্রয়ী মরমি আদর্শিক চিন্তাধারা হচ্ছে বাউল দর্শন। অন্যভাবে বলা যায় বাংলার একশ্রেণির অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, একতারা আশ্রয়ী, সংসার বিবাগী, উদাসী, ধর্মোন্মাদ, ক্ষ্যাপা, আত্মকর্ম সম্মাহিত, ভাববিদ্রোহী গায়ক ও মরমি সাধকদের আত্মোপলদ্ধিমূলক চিন্তাধারার নাম বাউল দর্শন। বাউল ধর্ম ও দর্শন মূলত সাধনকেন্দ্রিক। দেহই তাদের সকল সাধারণ মূলভিত্তি ভূমি। বাউলদের দেহ সাধনা জ্ঞান, কর্ম, ভাব, ভক্তি ও প্রেমের উপর প্রতিষ্ঠিত। বাউল মতে, দেহের মধ্যেই পরম আত্মা বা পরম তত্ত্বের অধিষ্ঠান। তাই মানবদেহেই তাঁরা পরমাত্মা বা মনের মানুষকে খুঁজে বেড়ান।
সুফি দর্শন : সুফিবাদ বা সুফি দর্শন ইসলামি ভাবধারায় বিকশিত একটি মরমি চিন্তাধারা। সুফি ভাবধারার মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর গূঢ় অনুভূতির অন্বেষণ ও আত্মার পবিত্রতা বিধান। গভীর ধ্যান অনুধ্যানের মাধ্যমে মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন সাধন। সুফি সাধকেরা অন্তরের গভীর অনুভূতির দ্বারা আল্লাহর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে চান। তাঁরা অতীন্দ্রিয় উপলব্ধির মাধ্যমে পরমসত্তাকে উপলব্ধি করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, কেবল স্বজ্ঞার মাধ্যমেই আল্লাহকে পাওয়া যেতে পারে। তাই আল্লাহর ধ্যান ও আল্লাহর প্রেমই সুফির একমাত্র আরাধ্য সাধনা। অতএব, বলা যায় সুফিবাদ হচ্ছে আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন থাকার দর্শন।
বাউল দর্শন ও সুফি দর্শনের তুলনা / সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য : মধ্যযুগের বাঙালির চিন্তা, মনন ও জীবনাদর্শে বাউল ও সুফি উভয় দর্শনই তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেও তুলনা করতে গেলে উভয় চিন্তার মধ্যে নানা সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে উভয়ের মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যসমূহ তুলে ধরা হলো।
বাউল দর্শন ও সুফি দর্শনের সাদৃশ্য : বাউল ও সুফি দর্শন দুটি স্বতন্ত্র দার্শনিক মতধারা হলেও উভয়ের মধ্যে কিছু কিছু সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। তবে উভয় দর্শনের মধ্যকার সাদৃশ্যের দিকসমূহ মূলত বাহ্যিক। নিম্নে উভয়ের মধ্যকার সাদৃশ্যের দিকসমূহ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
প্রথমত, বাউল ও সুফি উভয় মতবাদই সাধনার উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করে। উভয় সম্প্রদায়ই পরম সত্তার সাধনায় আত্মনিবেদন করে। বাউল বা সুফি কোনো মতবাদই আল্লাহ বা মনের মানুষকে বাদে সাধনা করার পক্ষবাদী নয়। উভয়েই দেহের মধ্যে আল্লাহর সিংহাসন ও অবস্থিতির কথা বলে ।
দ্বিতীয়ত, বাউল ও সুফি উভয়ের সাধনাই আত্মোপলব্ধির কথা বলা হয়। উভয় মতবাদই দেহের মধ্যে আল্লাহর সিংহাসন ও উপস্থিতির কথা বলে ।
তৃতীয়ত, বাউল ও সুফি উভয় মতবাদই গুরুবাদী, গুরুই উভয়কে সাধনার পথ দেখান। গুরুর সান্নিধ্য ছাড়া কেহই সাধনার ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে পারে না।
চতুর্থত, বাউল ও সুফি উভয় দর্শনই প্রেম প্রধান। প্রেম তন্ময়তার মধ্য দিয়েই বাউলরা পরমাত্মার সাথে মিলিত হতে চায়। আর সুফিরাও আল্লাহর গভীর প্রেমে মশগুল হয়ে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করতে চায়। অর্থাৎ প্রেম ছাড়া বাউল ও সুফি কারো সাধনাই পূর্ণ হয় না।
পঞ্চমত, ৰাউল ও সুফি মতবাদেই দেহের সাধনা করা হয়। দেহের সাধনাই বাউল সাধনা। দেহই বাউলের নিকট সকল কিছুর মূল। অন্যদিকে সুফিরাও দেহের সাধনা করে। সুফিরাও দেহের মধ্যেই প্রেমাস্পদ অর্থাৎ পরমসত্তার অনুসন্ধান করেন। কুরআনের আয়াত আবৃত্তি বা জিকিরের মাধ্যমেই সম্পাদিত সুফির দেহ সাধনা। তবে বাউল ও সুফি উই দেহের সাধনা করলেও তাঁদের সাধন পদ্ধতি ভিন্ন।
বাউল ও সুফি দর্শনের বৈসাদৃশ্য : বাউল ও সুফি মতাদর্শের মধ্যে উপর্যুক্ত কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে উভয় মতবাদ দুটি স্বাতন্ত্র্য দার্শনিক ধারা। তাই উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্যের চেয়ে বৈসাদৃশ্যই বেশি। নিতে উচ্চ মতাদর্শের বৈসাদৃশ্যসমূহ তুলে ধরা হলো :
প্রথমত, উৎসগত দিক থেকে বাউল ও সুফি মতের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। বাংলার এক শ্রেণির অশিক্ষিত হয় শিক্ষিত, একতারা আশ্রয়ী, ভাববিদ্রোহী গায়ক, সংসার বিবাগী, ক্ষ্যাপা, স্বাধীন ও সমন্বয়মূলক মরমি সাধকদের আত্মোপলব্ধিমূলক চিন্তাধারার নাম বাউল দর্শন। অর্থাৎ বাউল দর্শন বাঙালির নিজস্ব চিন্তা ও মননে বিকশিত এক চিন্তাধারা। পক্ষান্তরে, সুফি দর্শনের উৎস ভূমি বাংলা নয়। সুফিবাদ ইসলামি মরমি আদর্শ প্রসূত, কুরআন ও হাদিস
উৎসারিত একটি চিন্তাধারা। অর্থাৎ সুফিবাদ বাঙালির নিজস্ব দর্শন চিন্তা নয়, যদিও বাংলায় এসে সুফিবাদ একটি নতুন হল পরিগ্রহ করেছে।
দ্বিতীয়ত, দেহ সাধনাই বাউলের সাধনা। বাউল সাধনায় রেচক, পূরক ও কুম্বের মাধ্যমে দেহ সাধনা করে। এগুলোর অনেকটাই রতি শাস্ত্রে উল্লিখিত কলাকৌশলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ সাধন পদ্ধতিতে নামাজ রোজার স্থান নেই। কিন্তু সুফিবাদ ইসলামের পাঁচ মূলভিত্তি কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতের উপর প্রতিষ্ঠিত। সুফিরা ইসলামের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় বিধানই কঠোরভাবে মেনে চলে।
তৃতীয়ত, বাউলরা নূরনবী তথা হযরত মুহাম্মদ (স)-কে আল্লাহর অবতার বলে স্বীকার করে। কিন্তু সুফিরা অবতারবাদে বিশ্বাস করে না।
চতুৰ্থত, শাস্ত্ৰত তত্ত্ব কিংবা মন্দির মসজিদে বাউলদের কোনো বিশ্বাস নেই। কিন্তু সুফিরা শাস্ত্র বা কুরআনের আকর্ষ বিশ্বাস রাখে। কুরআন-ই সুফিবাদের মূল উৎস।
পঞ্চমত, বাউলদের নিকট হারাম-হালাল বলে কিছু নেই। মল, মূত্র, রজ:, বীর্য ইত্যাদি নিষিদ্ধ দ্রব্য বাউলরা সাধনার অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করে। অন্যদিকে, সুফিরা হারাম হালাল সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। হারাম-হালাল শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো হারাম খেয়ে করা ইবাদত আল্লাহ গ্রহণ করেন না।
ষষ্ঠত, নারী-পুরুষের যুগল মিলনই বাউলদের মূল সাধনা। বিপরীত দেহ ব্যতীত বাউল সাধনায় সিদ্ধি লাভ হয় না। অপরদিকে, সুফি সাধনার জন্য নারী-পুরুষের বিপরীত দেহ আবশ্যক নয়। বহু সুফি সাধক কৃতদার ছিলেন।
সপ্তমত, স্ত্রীর ঋতুস্রাবের প্রথম বিন্দু পান করা করা বাউল সাধনার অংশবিশেষ। বীর্য পানও তাঁদের সাধনার অংশ।তাছাড়া স্ত্রীর ঋতুকালীন সময়ের তিনদিন সহবাস করাকে বাউলরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। তাঁদের মতে, এ তিনদিন অধর মানুষকে ধরার উপযুক্ত সময়। অন্যদিকে, সুফিদের মতে, উল্লিখিত সকল কাজই শরিয়ত বিরোধী। তাঁরা বাউলদের এসব কাজকে ঘৃণার চোখে দেখেন।
অষ্টমত, বাউল সাধনায় পরকীয়া প্রেম বিশেষভাবে স্বীকৃত। পরকীয়া দেহ ভোগ ব্যতীত বাউল সাধনা পূর্ণ হয় না। কিন্তু, সুফিমতে বিবাহ ব্যতীত পরনারীর দেহ ভোগ করা হারাম বা অবৈধ।
নবমত, বাউল মতে, জীব হত্যা নিষিদ্ধ। কিন্তু, সুফিমতে আল্লাহর নামে কুরবানি বা পশু হত্যা জায়েজ।
দর্শমত, বাউলদের নিকট ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ। গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে জীবনধারণ করা তাঁদের সাধনার অঙ্গ। পক্ষান্ত রে, সুফিরা ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ করে না।
একাদশতম, বাউলরা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী, কিন্তু সুফিরা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করে না।
দ্বাদশতম, আচারব্যবহার, রীতিনীতি, পোশাক পরিচ্ছদ, চালচলন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বাউল ও সুফির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান ।
উপসংহার : বাউল ও সুফি দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা সারসংক্ষেপে বলা যায়, বাউল ও সুফি দর্শন এক নয়। উভয়ের জীবনাদর্শ, সাধন পদ্ধতি, ক্রিয়াকলাপ এমনকি চালচলনও ভিন্ন। বাউল দর্শনের মূলসুর মানবদেহে নিপতিত, আর সুফি দর্শন সম্পূর্ণরূপে আধ্যাত্মিক যার মূলসুর আল্লাহর প্রেমে নিপতিত।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!