ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাউল কারা? বাউল দর্শনের মূলতত্ত্ব আলোচনা কর।

অথবা, বাউল কারা? বাউল দর্শনের মূলতত্ত্ব ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাউল কাদের বলা হয়? বাউল দর্শনের মূল উপাদান ব্যাখ্যা কর।
অথবা, বাউল কারা? বাউল দর্শনের মূলতত্ত্বগুলো কী কী? বর্ণনা কর।
অথবা, বাউল কারা? বাউল দর্শনের কী কী মূলতত্ত্ব রয়েছে?
উত্তর।৷ ভূমিকা :
অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে একদল মরমিবাদী সাধকের আবির্ভাব ঘটে যারা দেশের আনাচে কানাচে গান গেয়ে তাদের মতাদর্শ প্রচার করেন। বাংলাদেশে এসব সাধককে বলা হয় বাউল সাধক।বাউলরা অধ্যাত্মবাদ ও দেহাত্ববাদী গান রচনা করেন এবং দেহভিত্তিক সাধনতত্ত্ব প্রচার করেন। বাংলাদেশে প্রেম দর্শন ভিত্তিক যে সকল তাত্ত্বিক মতবাদ গড়ে উঠেছে বৈষ্ণববাদ, সুফিবাদ এবং বাউলবাদ তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে যউলবাদ একটি স্বতন্ত্র দর্শন পদ্ধতি যা বাংলাদেশের নিজস্ব দর্শন নামে পরিচিত। মানুষের সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক, প্রেম ও
মমত্ববোধ এবং মানবতাবাদী আদর্শ এ দর্শনের মূল ভিত্তি।
বাউল কারা : বাউল শব্দটির আক্ষরিক অর্থ বাতুল বা বাউলা। আবার অনেকে মনে করেন আউল শব্দ হতে বাউল শব্দের উৎপত্তি। এ আউল শব্দের অর্থ আউলিয়া বা দরবেশ। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে একদল রহস্যবাদী সাধক বা দরবেশ ছিলেন। তাঁরাই মূলত বাউল নামে পরিচিত ছিলেন। এসব সাধক ও দরবেশ বাউল নামে একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলো এবং তারা অধ্যাত্মবাদী ও দেহাত্ববাদী গান রচনা করে গ্রামেগঞ্জে গেয়ে গেয়ে মতাদর্শ প্রচার করতেন। বাংলার অন্যতম বাউল গবেষক ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর “বাংলার বাউল ও বাউল গান” নামক গ্রন্থে বলেন, “সুফিবাদ প্রভাবিত মুসলমান নেতা বা ফকিররাই বাংলার বাউল ধর্ম সাধনার প্রবর্তক।”
অনেকে মনে করেন, বাউল ধর্ম বা বাউল দর্শনের আদি প্রবর্তক মাধবতি বিবি নামক একজন মহিলা সাধক। বাংলাদেশে বাউল সম্রাট হলেন লালন শাহ। লালন শাহের গুরু ছিলেন সিরাজ সাঁই। বাউল দর্শনে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকদেরকে দেখা যায়। বাউলরা প্রচলিত দৃষ্টিতে আনুষ্ঠানিক ধর্মভেদ ও শরীয়ত বহির্ভূত বলে বিবেচিত। তাদের জীবনদর্শনে সেরূপই প্রতীয়মান হয়। বাউল গানের মধ্যেই তাদের জীবনদর্শন ফুটে উঠেছে। বাউল দর্শনের বিশিষ্ট লক্ষণ হলো ঐকান্তিক উপলব্ধি ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
বাউল দর্শনের মূলতত্ত্ব : বাউলবাদ বাংলাদেশে একটি মরমি চিন্তাধারা। বাউল দর্শন কতকগুলো গুহ্য যোগক্রিয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। বাউল সাধকরা এ ক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধি লাভ করেন। বাউলরা মনে করেন মানব দেহই সব তত্ত্ব ও সত্যের ভিত্তি। দেহই সকল জ্ঞান ও কর্মের উৎস। বাউল দর্শনের যাবতীয় তত্ত্বের মূল হলো দেহ। আর তাই তাদের মতবাদকে বলা হয় দেহাত্ববাদ। এ মতবাদই বাউল দর্শনের মূল তত্ত্ব। বাউল সাধকদের মতে, দেহেই কৈলাস-বৃন্দাবন, দেহেই মক্কা-মদিনা। মানবাত্মার মধ্যেই পরমাত্মার অধিষ্ঠান। বাউলরা বলেন, আপন ভাত খুঁজলে পরে সকল জানা যায়।” আবার তারা বলেন, “যা যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে
দেহভাণ্ডে।”
বাউলরা মনে করেন পরম সত্তাকে জানতে নিজ দেহের মধ্যে পরম সত্তার অনুসন্ধান করতে হয়। কারণ দেহের ভিতরে পরমসত্তা অবস্থান করেন। লালন শাহ তাই তাঁর গানে বলেন,
“ক্ষেপ তুই না জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায়?
আপন ঘর না বুঝে বাহিরে খুঁজে পড়বি ধাধায়।”
বাউল দর্শনে প্রেমকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
যথা: ১. ভাবের পিরিত
২. খোদার পিরিত
১. ভাবের পিরিত : ভাবের পিরিত হলো ক্ষণস্থায়ী পিরিত। যে প্রেম মানুষকে জাগতিক বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে। তাকে ভাবের পিরিত বলা যায়। এ প্রেম বস্তুকেন্দ্রিক।
২. খোদার পিরিত: দৈহিক প্রেম বা ভাবের পিরিতের উচ্চস্তরে বা বিকাশের উচ্চস্তরে গিয়ে খোদার পিরিতে পরিণত হয়। এ পিরিতি লোকোত্তীর্ণ প্রেম।
সুতরাং আমরা দেখি যে, ভাবের পিরিত হলো দেহাত্মক যা খোদার পিরিতের সোপান স্বরূপ। লালন শাহের মধ্যে ভাবের পিরিতের সোপান ধরে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করতে হয়। বাউল দর্শন মানুষকে সকল শাস্ত্র, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মের উপরে স্থান দেয়। তারা পরমসত্তাকে মানুষের মধ্যে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বলেন,
“এই মানুষে আছেরে মন
যারে বলে মানুষ রতন
লালন বলে পেয়ে ধন
পারলাম না চিনিতে।”
বাউলরা দেহসাধনার মাধ্যমে স্বজ্ঞার সাহায্যে ঐশী জ্ঞান লাভ সম্ভব বলে মনে করেন। দৈহিক সাধনার মধ্য দিয়েই লাভ করা যায় পরম সত্তাকে।পরমসত্তাকে জানার এ অবস্থাকে বলা হয় জ্যান্ত মরা। জ্যান্ত মরা অবস্থা হলো লোকোত্তীর্ণ স্থায়ী আনন্দ। এ আনন্দ দৈহিক আনন্দ থেকে উচ্চস্তর। এ আনন্দ লাভের জন্য দরকার গুরুর। গুরুর নির্দেশনা অনুযায়ী সাধক সামনে এগিয়ে যায় এবং পরম আনন্দ লাভ করে। বাউল সাধনার সূত্রপাত হয় দৈহিক সাধনার মধ্য দিয়ে এবং সমাপ্ত হয় পরমসত্তা বা পরমানন্দ লাভের মধ্য দিয়ে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে আমরা বলতে পারি যে, বাউল দর্শনের মূল তত্ত্ব হলো দেহাত্ববাদ। তারা মানব দেহকে সত্য ধরে দেহ সাধনার মাধ্যমে পরম সত্য বা পরম সত্তা লাভের কথা বলে। তারা দেহকে সকল জ্ঞান ও কর্মের উৎস বলেছেন এবং এ দেহকেই পরমাত্মার বাস বলে প্রচার করেন। তাদের দেহাত্মবাদে ইহজাগতিকতা থেকে আধ্যাত্মিকতায় উপনীত হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। বাউলরা তাদের দর্শনতত্ত্বে পরমসত্তা বা ঈশ্বরকে নিজ দেহে অনুসন্ধান করেছেন। সক্রেটিসের মতো তারাও আত্মজ্ঞানের উপর জোর দিয়েছেন। বাঙালি দর্শনে তাদের প্রেমমিশ্রিত দেহাত্ববাদ গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হিসেবে বিবেচিত।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!