ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাংলার জাগরণে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান কতটুকু, আলোচনা কর।

অথবা, “বাংলার জাগরণের ক্ষেত্রে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন”- আলোচনা কর।
উত্তরা৷ ভূমিকা :
বাংলার ঊনবিংশ শতাব্দীর ধর্মচর্চার উপর একটা মধ্যযুগীয় ছাপ যে পড়েছিল তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু নববিকশিত বাংলা সাহিত্যে প্রথম থেকেই সেই ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা শুরু হয়েছিল। বাংলার নব সাহিত্যের মহান নেতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত আশ্চর্য উদার মন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রায় একই সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন আর এক অগ্রদূত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এই দুই মহামানব তাঁদের সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে নব জাগরণের সৃষ্টি করেছিলেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত : জাতি ধর্মের সংকীর্ণতা মধুসূদনকে ক্ষণিকের জন্যও স্পর্শ করতে পারেনি। এই উদারচিত্ত কবি ইউরোপ ও ভারতের প্রাচীন কাব্যকলার শ্রেষ্ঠ সম্পদসমূহ যেভাবে অবলীলাক্রমে আহরণ করে তাঁর স্বদেশবাসীদের উপহার দিয়েছেন তা বাঙালি চিরকালই বিস্ময় ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। মধুসূদন ছিলেন আধুনিক মানুষ। শিক্ষাজীবনের শুরুতে ডিরোজিওর প্রভাব পড়েছিল তাঁর উপর। হিন্দুর ঘরে জন্মে হিন্দুধর্মের কুসংস্কার ও অন্ধত্বকে পছন্দ করতে না পেরে তিনি প্রগতিশীল খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি আত্মজাগরণ ঘটিয়েছিলেন। তাঁর এই আত্মজাগরণ বাঙালি যুব সমাজের মধ্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিল। প্রাবন্ধিক কাজী আব্দুল ওদুদের ধারণা ডিরোজিওর প্রভাবের গৌণ ফসল আমাদের আদরের কবি মধুসূদন। একদিকে তিনি যেমন ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের রূপকার তেমনি বাংলা ও বাঙালির নবজাগরণের ক্ষেত্রে তিনি পালন করেছেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তাকে ধিকৃত ও তিরস্কৃত হতে হয়েছে প্রাচীনপন্থিদের দ্বারা। জন্মদাতা পিতাকর্তৃক ত্যাজ্যপুত্র ঘোষিত হওয়ার পরও তিনি নিজের দর্শন থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর কাছে গোটা বাঙালি সমাজ অশেষ ঋণে ঋণী।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অসাধারণ মেধা ও মননের অধিকারী ছিলেন। বাংলার জাগরণে তাঁর অবদানও অবিস্মরণীয়। মধুসূদনের পরে বাংলা সাহিত্যের যে নেতা বাঙালির জীবনাচরণে অক্ষয় ছাপ রেখে গিয়েছেন তিনি এই ঋষি বঙ্কিম। বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম জীবনে ছিলেন শিল্পী। তাঁর ভিতরে কবিসুলভ স্বপ্ন ছিল কম। তিনি ছিলেন নিপুণ চিত্রকর ও বাস্তববাদী দেশপ্রেমিক। ইংরেজ সরকারের চাকরি করতে গিয়ে বঙ্কিম তাদেরকে ভালো করে চেনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাই মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন কট্টর ব্রিটিশবিরোধী। স্বাধীনতাকামী এই মহৎ সাহিত্যিকের কলম থেকে তাই বেরিয়ে এসেছিল ‘বন্দে মাতরম’ এর মতো অগ্নিঝরা সংগীত। তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে ইংরেজ বিরোধী যুদ্ধ ও সংগ্রামের কাহিনি রচনা করে বাঙালিকে জাগরিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন
মধুসূদনের অবদান : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে মধ্যযুগীয় নিগড় থেকে মুক্ত করা মধুসূদনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলেও পশ্চাৎপদ বাঙালি সমাজকে জাগিয়ে তুলতে তিনি যে অবদান রেখেছেন তা কোন অংশে কম নয়। হিন্দুধর্মের অন্ধত্ব ও গোঁড়ামির জাল ছিন্ন করে তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন। তাঁকে কেন্দ্র করে শিক্ষিত নব্য বাঙালিদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল মুক্তির আন্দোলন। তাঁর বেপরোয়া জীবনাচরণের মধ্যেই ছিল জাগরণের সুপ্ত মন্ত্র। মধুসূদন স্বীয় মেধা ও মননের দ্বারা বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় যে জাগরণের সূচনা করেছিলেন তাকেই ত্বরান্বিত করেছেন মধুসূদন। তিনি ছিলেন বাংলার নন্দিত ও নিন্দিত যুবরাজ। সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে যুগান্তর তিনি সৃষ্টি করে গিয়েছেন তার তুলনা অন্য কারো সাথে চলে না।
ঙ্কিমচন্দ্রের অবদান : সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বাঙালিকে জাগরিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। এই অমর কীর্তিতে হয়তো নায়ক নায়িকার গূঢ় আনন্দ বেদনার রেখাপাত তেমন নেই, হয়তো এমন কোন সৌন্দর্য মূর্তি আঁকা হয়নি যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের নয়নে প্রতিভাত হবে, “A thing of beauty is a joy for ever” হিসেবে। কিন্তু তবু এটি অমর এই জন্য যে এতে যেন লেখক কী এক আশ্চর্য ক্ষমতায় পাঠকের সামনে প্রসারিত করে ধরেছেন দেশের দুর্দশামথিত তাঁর রক্তাক্ত হৃদয়- যে হৃদয়ে তার সুগভীর বাস্তবতার জন্যই সৌন্দর্যের এক সমাজকে জাগাতে চেয়েছিলেন।
মধুসূদন ও বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যর্থতা : বঙ্কিমচন্দ্র শেষ পর্যন্ত শিল্পের ক্ষেত্রে থাকতে পারেননি। শেষ বয়সে তিনি ধর্মের দিকে ঝুঁকেছিলেন। আত্মবিয়োগে অধীর হয়ে তিনি ধর্মে মনোনিবেশ করলেও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দেশহিতৈষণা। এক্ষেত্রে তিনি তেমন সার্থকতা দেখাতে না পারায় জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে দেশবাসী তাঁকে ভাবতে পারেনি। অপরদিকে, মধুসূদনও যে গ্রামে সুর বেঁধেছিলেন তা ধরে রাখতে পারেননি ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে। এই দুই প্রতিভাবান বাঙালির করার ক্ষমতা যতখানি ছিল প্রয়োগের ক্ষেত্রে ততখানি দেখতে পাওয়া যায়নি।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পেক্ষিতে বলা যায় যে, অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজজীবনে জন্মেছিলেন মধুসূদন ও বঙ্কিমচন্দ্র। রামমোহন প্রদর্শিত পথে তাঁরা না হেঁটেও স্ব-স্ব সৃষ্টপথ তাঁরা বাঙালিকে দেখিয়েছিলেন। তাঁদের উভয়ের মধ্যে স্বদেশপ্রেমের যে বহ্নিশিখা প্রজ্বলিত ছিল তা জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তারা অভূতপূর্ব সাফল্য প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছিলেন।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!