ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাংলার জাগরণের ক্ষেত্রে ডিরোজিওর অবদান সম্পর্কে আলোচনা কর।

অথবা, ডিরোজিও কে? বাংলার জাগরণে ডিরোজিওর ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর ভূমিকা :
কাজী আবদুল ওদুদ মুক্তচিন্তার অধিকারী একজন বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও লেখক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে সমধিক পরিচিত। স্বদেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং অসম্প্রদায়িক ধ্যান ধারণায় ব্রতী হয়ে তিনি সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ‘বাংলার জাগরণ’ প্রবন্ধে লেখক বাংলার জাগরণের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং তার সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন মনীষীর ধ্যান-ধারণা প্রাঞ্জল এবং যুক্তিনিষ্ঠ ভাষায় তুলে ধরেছেন। বাংলার জাগরণে বাঙালি না হয়েও যাঁর অবদান অনস্বীকার্য তিনি হলেন কবি, শিক্ষক ও প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ডিরোজিও। রামমোহনের শুরু করা পথ ধরে তিনি বাংলার জাগরণে নতুন গতি সঞ্চার করেছিলেন।
ডিরোজিওর পরিচয় : ক্ষণজন্মা বিস্ময়কর এক প্রতিভার নাম ডিরোজিও। ইউরোপীয় সভ্যতায় লালিত-পালিত এ জ্ঞানযোগীর ভারতবর্ষে আগমন এবং এদেশের কৃষ্টিকালচারে নতুন প্রাণের সঞ্চারণ ঘটানো একটি বিস্ময়কর ব্যাপার। মাত্র বিশ বৎসর বয়সে তিনি হিন্দু কলেজের চতুর্থ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। অল্প বয়সে যথেষ্ট বিদ্যা অর্জন করে কবি ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরূপে তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন। মাত্র তিন বছর তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এ স্বল্প সময়ে তিনি ছাত্রদের মাঝে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, বাংলায় একটি নতুন সম্প্রদায় গড়ে উঠে যাঁরা ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী নামে পরিচিত।
ডিরোজিওর ভাবনা : সভ্যতার এক সংকটময় মুহূর্তের মধ্য দিয়ে ডিরোজিওর ভাবনা চিন্তা প্রসারিত হয়েছে। গভীর জ্ঞান ও অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি ইউরোপীয় সভ্যতার ভালোমন্দ অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের চিন্তার স্বাধীনতা বহ্নি তাঁর ভিতরে প্রজ্বলিত ছিল। ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র সাম্য ভ্রাতৃত্ব স্বাধীনতা তাঁর ছিল অন্তরের প্রেরণা। ডিরোজিও তাঁর এসব চিন্তা-চেতনা ছড়িয়ে দেন জ্ঞানপিপাসু ছাত্রদের মাঝে।
ডিরোজিও ও হিন্দুকলেজ : ডিরোজিও এবং হিন্দু কলেজের নাম একসূত্রে গাঁথা। রামমোহন রায় যে সংকল্প নিয়ে সংস্কারে ব্রতী হয়েছিলেন হিন্দু কলেজ এবং তার শিক্ষক ডিরোজিওর কাছ থেকে তাঁর কিছুটা প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলা যায়। মাত্র বিশ বছর বয়সে ডিরোজিও হিন্দু কলেজের চতুর্থ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। আর তিন বছর শিক্ষকতা করার পর তিনি সেখানে থেকে বিতাড়িত হন। ডিরোজিও যে নতুন চিন্তা-চেতনার ধারা ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন তা তৎকালীন সমাজ মেনে নিতে না পারলেও জ্ঞানপিপাসু ছাত্রদের মাঝে তা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। তাই ডিরোজিও হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়িত হলেও তাঁর মত এবং চিন্তা-চেতনার প্রভাব রয়ে যায় তাঁর ছাত্রদের মাঝে। । ছাত্ররাই পরবর্তীতে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তৎকালীন সমাজে ডিরোজিওর প্রভাব : তৎকালীন সমাজ এবং রাষ্ট্র ডিরোজিওর চিন্তা-চেতনা মেনে নিতে পারেনি সংস্কারতীত মানুষগুলো তাই ডিরোজিওকে দেখেছে সন্দেহের চোখে। তাঁর চিন্তা-চেতনা তাঁদের কাছে মনে হয়েছে অসংগত। ফলস্বরূপ তাঁকে হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে। তবে তাঁর চিন্তা-ভাবনা থেমে থাকেনি। প্রাচীনপন্থিরা তাঁকে গ্রহণ না করলেও তরুণ সমাজে তিনি যথেষ্ট সমাদৃত ছিলেন।
বাংলার তরুণ সমাজের উপর ডিরোজিওর প্রভাব : হিন্দু কলেজের শিক্ষক থাকাকালীন সময়ে ডিরোজিও তাঁর বহুমুখী জ্ঞান ও নতুন চিন্তাচেতনার দ্বারা তরুণ ছাত্রসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তিনি তরুণ সমাজের কাছে আদর্শ নেতা হয়ে উঠেন। শ্রেণিকক্ষের বাইরে এবং ভিতরে তিনি তরুণ সমাজের কাছে সমান জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিন বছর শিক্ষকতা করার পর তাঁকে হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়িত করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ে তাঁর শিষ্যদের চিত্তে যে আগুন তিনি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন কলেজ পরিত্যাগের বহুদিন পরও তার তেজ মন্দীভূত হয়নি। শুধু তাই নয়; ডিরোজিওর এই শিষ্যরাই অনেকে সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। ডিরোজিওর শিষ্যরা অনেকেই চরিত্রবিদ্যা সত্যানুরাগ ইত্যাদির জন্য জাতীয় জীবনের গৌরবের আসন লাভ করেছিলেন। এরই সাথে হিন্দু সমাজের আচারবিচার বিধি-নিষেধ ইত্যাদির লঙ্ঘনদ্বারা সুনাম বা কুনাম অর্জন করে সমস্ত সমাজের ভিতরে একটা নব মনোভাবের প্রবর্তন করেন। বাংলার নবসাহিত্যের নেতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত ডিরোজিওর চিন্তা-চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এছাড়া ডিরোজিওর মৃত্যুর পরে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে যাঁরা সামাজিক সংস্কারে জ্ঞানবিজ্ঞানে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রামগোপাল ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্যারীচাদ মিত্র প্রমুখ
ডিরোজিও ও তাঁর দল : ডিরোজিওর প্রভাবে বাংলায় একটি নতুন সম্প্রদায় গড়ে উঠে- যারা ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী নামে পরিচিত। তৎকালীন সময়ে অনেক মধ্যবিত্ত হিন্দু-ঘরের ছেলে হিন্দু কলেজের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। আর এদের মন্ত্রগুরু ছিলেন ডিরোজিও। জাতি-ধর্ম ইত্যাদির সংকীর্ণতা ভেঙে তাঁরা মুক্ত মন নিয়ে সমাজে প্রবেশ করেন। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা এবং ধর্মীয় আচার নিষ্ঠার এঁরা ঘোর বিরোধী ছিলেন। এ দলের সদস্যরা ধর্ম বিষয়ে উদাসীন তো ছিলেন অনেক সময় নাস্তিকভাবাপন্ন ছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘোষণা করতেন “If we hate anything from the bottom of our heart it is hinduism.” ডিরোজিওর দলকে কোন কোন সাহিত্যিক রামমোহনের বিরুদ্ধ দল বলে প্রতিপন্ন করেছেন। তবে প্রকৃত প্রস্তাবে এঁরা রামমোহনের বিরোধী দল ছিলেন না। কেননা ডিরোজিওর দলের অনেকে উত্তরকালে রামমোহনের ব্রাহ্মসমাজের নেতা ও কর্মী হয়েছিলেন। আর বিদ্যা চরিত্রবল জনহিতৈষণা ইত্যাদি গুণে নিজেদের বিকশিত করেছিলেন।
ডিরোজিওর আদর্শ বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ : বহুমুখী জ্ঞান, কর্ম-দক্ষতা ও কল্যাণকামী চিন্তাচেতনা সত্ত্বেও ডিরোজিওর আদর্শ গোঁড়া হিন্দুসমাজ কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। পশ্চাৎপদ অনগ্রসর সংস্কারভীত জাতি ডিরোজিও এবং তাঁর দলের মুক্তির আন্দোলনে যোগ দিতে পারেনি। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ডিরোজিও এবং তাঁর দলেরও ব্যর্থতা আছে। কেননা তাঁরা দেশের ইতিহাসকে একটুও খাতির করতে চায়নি। পবননন্দনের মতো আস্ত ইউরোপ গন্ধমাদন এদেশে বসিয়ে দিতে তাঁরা প্রয়াস পেয়েছিলেন। একটি সভ্যতার আহরিত জ্ঞান অন্য একটি সভ্যতায় প্রতিস্থাপন করার জন্য যে সময় এবং ধৈর্যের প্রয়োজন ডিরোজিও এবং তাঁর দলের তা ছিল না। তাই ডিরোজির দল দু-এক পুরুষের বেশি প্রাণধারণ করে থাকতে সমর্থ হয়নি।
বাংলার জাগরণে ডিরোজিওর অবদান : বাংলার জাগরণে রামমোহন যে প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন ডিরোজিও সেখানে সফলতা বয়ে নিয়ে এসেছেন। রামমোহন ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চমৎকারিত্বের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মাত্র, কিন্তু সে জ্ঞানের স্বাদ বাঙালি প্রকৃত প্রস্তাবে পায় ডিরোজিওর কাছ থেকে। বাংলার চিরআদরের মধুসূদন ডিরোজিওর গৌণ প্রভাবের ফল। তাছাড়া সাধারণ বিদ্যানুরাগী বাঙালি হিন্দু ডিরোজিও প্রদর্শিত পথে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় জ্ঞান বিজ্ঞানের যে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন তা বাস্তবিকই প্রশংসনীয়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পেক্ষিতে বলা যায় যে, বাংলার জাগরণের ক্ষেত্রে ডিরোজিওর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চাৎপদ, অনগ্রসর, সংস্কারাচ্ছন্ন একটি জাতিকে জাগিয়ে তোলার গুরুভার তিনি পালন করেছিলেন আপন জ্ঞানের আলোয় এবং কর্মপ্রচেষ্টায় । বাঙালি এ যুগস্রষ্টা পুরুষকে জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে চিরকাল স্মরণ করবে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!