ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাংলায় সুফিবাদের সামাজিক প্রভাব আলোচনা কর।

অথবা, সুফিবাদের সামাজিক প্রভাব নিরূপণ কর।
অথবা, বাঙালি সমাজে সুফিবাদের প্রভাব আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের সমাজ জীবনে সুফিবাদের প্রভাব বর্ণনা কর।
অথবা, বাংলার জনজীবনে সুফিবাদের প্রভাব ব্যাখ্যা কর।
উত্তরা।৷ ভূমিকা :
সুফিবাদ ইসলামি ভাবাদর্শের সর্বোচ্চ স্তরে বিকশিত ধ্যান অনুধ্যানমূলক মরমি চিন্তাধারা। ধ্যান অনুধ্যানমূলক আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে পরম, একক ও অদ্বিতীয়, সর্বময়সত্তা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভই সুফিবাদের মর্মকথা। কিন্তু বাংলায় সুফিবাদ তার আধ্যাত্মিক লক্ষ্যকে সমুন্নত রেখেও সামাজিক ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। তৎকালীন বিদ্যমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে সুফিবাদের এ সামাজিক প্রভাবের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
সুফিবাদের সামাজিক প্রভাব : বাংলায় যে সামাজিক প্রেক্ষাপটে সুফিবাদের প্রচার ও প্রসার ঘটে তা ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করে। কেননা, বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা যেমন সুফিবাদের প্রচার ও প্রচারকে মহীরূহ দান করে তেমনি সুফিবাদের আদর্শ এদেশে মুসলিম শাসনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করতে যথেষ্ট সহায়তা দান করে। একথা ধ্রুব সত্য যে যেকোন নতুন মতবাদ বা শাসনের প্রতিষ্ঠা একটি সমাজের বিদ্যমান কাঠামো এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনয়ন করে। বাংলায় সুফিবাদের অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলায় সুফিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে শেষ হিন্দু রাজা লক্ষ্মণ সেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। এসময় মুসলিম বীর ইখতিয়ারুদ্দীন বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বাংলা বিজয় মুসলমান পীর, দরবেশ, ফকির, সুফিদের জন্য এদেশে প্রবেশের অবারিত দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে ইসলামের তৌহিদের বাণী, বিশ্বভ্রাতৃত্ব, সাম্য ও শান্তির পতাকা নিয়ে তাঁরা দলে দলে বাংলায় প্রবেশ করেন। তৎকালীন ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থায় তাঁদের বাণী সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং প্রচলিত সমাজব্যবস্থার মর্মমূলে কার্যকর আঘাত হানে। অবশ্য এর পিছনে তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় ছিল কার্যত দায়ী। কেননা, পূর্ববর্তী হিন্দু রাজা বল্লাল সেন হিন্দুধর্মকে নানা গোত্রে বিভক্ত করে সমাজকে এক বৈষম্যের উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছিল। নিম্নশ্রেণির বা বর্ণের হিন্দুরা সামাজিকভাবে নির্যাতিত বা অধঃপতিত অবস্থায় পতিত হয়েছিল। এমনকি তাদের জন্য পূজা অর্চনা ও বেদপাঠ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তাদের অনেক সামাজিক অধিকার পর্যন্ত রহিত করা হয়েছিল। নিম্নবর্ণের হিন্দুরা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সাথে বসে খাবার পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারতো না। অন্যদিকে বৌদ্ধধর্মের অনুসারী সাধারণ বৌদ্ধরাও সেন রাজাদের দ্বারা নানাভাবে নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়েছিল। ফলে উভয় ধর্মের সাধারণ মানুষ মুক্তির জন্য উন্মুখ হয়ে পড়েছিল। এ ঐতিহাসিক সময়ে সুফিদের সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ববোধের বাণী এ সমস্ত মানুষকে মুগ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে তাঁরা দলে দলে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হতে শুরু করে। এতে শোষিত বঞ্চিত মানুষেরা ফিরে পায় তাদের সামাজিক মর্যাদা এবং অধিষ্ঠিত হয় সমাজের মর্যদাপূর্ণ স্থানে। ফলে সমাজ কাঠামোতেও সূচিত হয় ব্যাপক পরিবর্তন। সুফিবাদের সামাজিক প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সতেরো ও আঠারো শতকে এদেশের সাধারণ মানুষকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলা। জমিদার, রাজন্যবর্গ এমনকি ইংরেজ শাসকদের শার্সনে বঞ্চিত, শোষিত,অত্যাচারিত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সুফিরা তাদের শক্তি দিয়েছে, সাহস দিয়েছে, সংঘটিত করেছে এবং নেতৃত্ব দিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখা যায় তাঁদের (সুফিদের) দ্বারা এমন কিছু আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে যা প্রবল শক্তিধর ইংরেজ শাসকের ভিতকেও নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। হাজী শরিয়তউল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন, তিতুমীরের সংগ্রামকে এক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা যায়। এসব আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক নয় বরং বাংলার সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তাছাড়াও সুফিরা শিক্ষার প্রসার, আর্তের সেবা দারিদ্র্যের ভাগ্যোন্নয়ন তথা সর্বোপরি মানবতাবাদী ধ্যানধারণা প্রসারের মাধ্যমে এদেশের সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তনে সুস্পষ্ট ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা এদেশে নানা স্থানে অগণিত খানকা, দরগা, মক্তব নির্মাণ করেছেন। এসবের মাধ্যমে তাঁরা একদিকে শোষিত বঞ্চিত মানুষ তথা আর্তের সেবায় মনোনিবেশ করেছে অন্যদিকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন। ফলে সমাজের অগণিত মানুষ তাদের সংস্পর্শে এসে আদর্শ মানুষে পরিণত হয়েছে। তারা দেখছে আধ্যাত্মিকতার আলো ও মুক্তির পথ । মানুষে মানুষে যে কোন ভেদাভেদ নেই এ শিক্ষাও সুফিরাই প্রচার করেছে বাংলার মাটিতে। যদিও ইসলামের আদর্শের প্রচারই ছিল সুফিদের মূল লক্ষ্য তথাপি ধর্মের ব্যাপারে কোন প্রকার বাড়াবাড়ি বা গোঁড়ামি তাঁদের ছিল না। ফলে সকল শ্রেণির মানুষ তাঁদের সমানভাবে ভক্তি শ্রদ্ধা করতো। আর তাঁদের এই শিক্ষা ও জীবনাচারের সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ে বাংলার সমাজব্যবস্থায় ফলে প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়।
উপসংহার : আলোচনার সারসংক্ষেপে বলা যায়, বাংলার মাটিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতি, তাদের ধর্ম ও মতাদর্শের আগমন ঘটেছে সেই প্রাচীন কাল থেকেই।সময়ের বিবর্তনে এসবের অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে ইতিহাসের অতল গহ্বরে। কিন্তু সুফিবাদের বাণী আগমন কাল থেকে অদ্যাবধি রয়ে গেছে অম্ল । হয়ে। কেননা, সুফিদের চিন্তাচেতনা ও জীবনাচারের সঙ্গে এদেশের মানুষের জীবনবোধের রয়েছে এক আশ্চর্য মিল।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!