Answer

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধাসমূহ উলেখ কর।

অথবা, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো আলোচনা কর।
অথবা, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সমস্যাবলি বর্ণনা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
যেকোন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রকৃত প্রস্তাবে প্রত্যেক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হলো একটি আবশ্যিক উপাদান। আধুনিককালে গণতান্ত্রিক অগণতান্ত্রিক নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক ব্যবস্থায়, এমনকি সামরিক শাসনাধীন রাষ্ট্রেও জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধাসমূহ:
বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মাত্রা অত্যন্ত সীমিত। বাংলাদেশে কিছু অন্তনির্হিত কারণ বা উপাদান বা শক্তি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এগুলো নিম্নরূপ :
১. দারিদ্র্য : আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিগণ অধিক হারে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে। বিভিন্ন গবেষক তাদের অনুসন্ধনে এ বিষয়টি প্রমাণ করেছেন। বাংলাদেশে সিংহভাগ লোক দরিদ্র। তাদের নিকট রাজনীতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আহারের সংস্থান, কাজেই দারিদ্র্য সবসমই এ দেশে বিরাট জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
২. অসচেতনতা ও উদাসীনতা : অশিক্ষিত, দারিদ্র্য ও দুর্বল সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এবং কাঠামোর দুর্বল ভূমিকার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগগোষ্ঠী এবং এমনকি শহরের জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ অসচেতনতায় ভোগে। ফলে তাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। এছাড়া সমাজে কিছু লোক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে উদাসীন। তারা কোন প্রকার রাজনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখায় না। আবার কিছু লোক রাজনীতিতে নির্দিষ্ট স্বার্থ অনুভব করে না বলে অংশগ্রহণে উদাসীন থাকে।
৩. শিক্ষার নিম্ন হার : বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণাষ্ঠী এখনো অশিক্ষিত ও নিম্ন শিক্ষিত। ফলে নির্বাচনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। এ জনগোষ্ঠী সাধারণত নির্বাচনে বেশি সাড়া দেয়, বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচনে এদের অংশগ্রহণ অপেক্ষাকৃত বেশি। এছাড়া, অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন: যোগাযোগ, প্রচারণা, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অনুপস্থিতি লক্ষণীয়।
৪. দুর্বল সামাজিকিকরণ : বাংলাদেশে শিক্ষার নিম্ন হার সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিকীকরণ (রাজনৈতিক দীক্ষায়) প্রক্রিয়ার সরকারী প্রচার মাধ্যম বিশেষ করে বৈদ্যুতিক মাধ্যম যে ভূমিকা রাখে তা নিতান্তই অপ্রতুল। দারিদ্র ও শিক্ষার নিম্নহার প্রেস মিডিয়ার সাথে তাদের যোগাযোগকে ব্যাহত করে। সামাজিক ও রাজনেতিক এলিট কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো গ্রামীণ জনগণের সামাজিকীকরণ খুব কমই সক্রিয়। ফলে এ জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সব সময় অনীহা প্রকাশ করে।
৫. নেতৃত্বের সততার অভাব ও দুর্নীতি : রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনগণের সমর্থন নির্ভর করে গ্রহণযোগ্যতার উপর। আর গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নেতৃত্বের গুণাবলির উপর ব্যক্তি বা সাংগঠনিক কাঠামোগত)। নেতৃত্বে সততার অভাব, দুর্নীতি কিংবা স্বজনপ্রীতি জনগণের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে, তারা হতাশায় ভোগে এবং আস্থাহীনতা হতাশা ধীরে ধীরে জনগণকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিমুখ করে দিতে পারে
৬. নেতৃত্বের গণবিচ্ছিন্নতা : দলীয় পরিচিতি বা দল সংশ্লিষ্টতা বা দলের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে। দলীয় পর্যায়ে কর্মকাণ্ডে স্থবির হয়ে পড়লে সার্থকগণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত হয়। তাছাড়া অংশগ্রহণ কম বেশি নির্ভর করে কর্মসূচির উপর, যোগ্য নেতৃত্বের উপর কিন্তু বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ সাধারণত নির্বাচনের সময় ছাড়া অন্যান্য সময় প্রায়শ জনবিচ্ছিন্ন থাকেন। এ বিচ্ছিন্নতা তাদের সাথে জনগণের দুরুত্ব বা ব্যবধান সৃষ্টি করে, ফলে হতাশা থেকে অনেক সময় জনগণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
৭. আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব : রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আদর্শ (Ideology) একটি অন্যতম বিষয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা কিংবা জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে রাজনৈতিক মতাদর্শ স্থিতিকরণ এবং তা বাস্তায়নে কর্মসূচি প্রণয়ন ও জনগণকে তা অবহিতকরণ অত্যন্ত জরুরী। কারণ জনগণের সমর্থন ছাড়া কোন কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি নেতৃত্বের অঙ্গীকারবদ্ধতার অভাবে অধিকাংশ সময় জনগণ তাদের প্রতি বিরূপ থাকে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে না।
৮. রক্ষণশীল সামাজিক অবস্থা : বাংলাদেশে জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো রক্ষণশীলতা বেশ প্রকট। অশিক্ষা,দারিদ্র্য ও দুর্বল সামাজিকীকরণ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জনগণের বড় একটি অংশকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী। এ নারী-জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ রক্ষণশীলতা একটি বড় বাঁধা।তাছাড়া রাজনৈতিক বা সরকারিভাবে সমাজের এ অংশ কে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট করার প্রক্রিয়া ও উদ্যোগ এখনো সীমিত।
৯. অনুন্নত রাজনেতিক সংস্কৃতি : বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংস্কৃতি পূর্ণ মাত্রায় বিকশিত নয়। অধিকাংশ জনগণ রাজনীতি বিষয়ে পূর্ণ সচেতন নয়। জনগণের মধ্যে সাংগঠনিক দুর্বলতা ও মেরুকরণ লক্ষ্য করা যায়। জনগণ প্রায়ই সরকারের ধরন ও বৈধতা বিষয়ে বিভক্ত থাকে। জনগণ ইনপুট আউটপুট কার্যাবলি সম্পর্কে অসচেতন থাকে। রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে বিভেদ-বিভাজন তীব্র করে অনেক সময় বেসামরিক সরকার প্রায় সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে থাকার কথা। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য বিকশিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রয়োজন। চাপের মুখে থাকে, যদিও সামরিকবাহিনী কিন্তু এ বিষয় এ দেশে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধক।
১০. সহিংসতা : বাংলাদেশে রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সহিংসতা। রাজনীতিতে সহিংসতা নৈমত্তিক বিষয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পেশিশক্তির ব্যবহার সাধারণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে চিহ্নিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, যেমন : মিছিল, সভা, নির্বাচন ইত্যাদিতে প্রতিনিয়ত পেশি শক্তির ব্যবহার লক্ষণীয়, ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিরাপদ নয় বলে জনগণের মধ্যে অংশগ্রহণ নিস্পৃহতা দেখা দেয় ।
উপসংহার : পরিশেষে বলতে পারি যে, বর্তমানে বহু ও বিভিন্ন স্বেচ্ছা সম্পাদিত ক্রিয়াকলাপ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হিসাবে পরিগণিত হয়। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর এই সমস্ত ক্রিয়াকলাপের প্রভাব প্রতিক্রিয়া অনস্বীকার্য। শাসকবর্গকে বাছাই করা এবং সরকারী নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সংগে এই সমস্ত ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কিত।সাম্প্রতিককালের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনীতিক বিষয়াদিতে গণঅংশগ্রহণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তবে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রকৃতি, পর্যায় ও মাত্রা সকল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমান নয়। সামাজিক সাংস্কৃতিক ও আর্থ
রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের পরিপ্রেক্ষিতে পার্থক্য প্রতিপন্ন হয়। স্বভাবতই রাজনৈতিক অংশগ্রহণমূলক ক্রিয়াকলাপের ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা দেয়। আবার রাজনৈতিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মানকে উন্নত করে।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!