ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে নারীকে কিভাবে উপস্থাপন করা হয়? বর্ণনা কর।

অথবা, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে নারীকে উপস্থাপনের রূপরেখা তুলে ধর।
অথবা, গণমাধ্যমে নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়? বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বর্ণনা কর।
অথবা, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে নারীকে উপস্থাপনের রূপরেখাসমূহ সবিস্তারে মূল্যায়ন
কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং পরিবর্তনশীল কর্ম এলাকা ‘গণমাধ্যম’। গণমাধ্যম ছাড়া উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল যেকোনো দেশেই নাগরিক জীবনে গুরুতর ছন্দপতন ঘটে। পাশাপাশি গণমাধ্যমেই উপস্থাপিত হয় সমাজজীবনের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি। সে জন্যই বলা হয়, গণমাধ্যম শুধু বাস্তবতাকে ব্যাখ্যাই করে না, সৃষ্টিও করে। আমাদের বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা হলো পুরুষতান্ত্রিক। এ সমাজে প্রচলিত মতাদর্শ হলো নারীদের তুলনায় পুরুষ শ্রেষ্ঠ। তাই নারী পুরুষের অধস্তন এবং এ অধস্তনতা সমাজে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়। গণমাধ্যম যেহেতু সমাজেরই অংশ, তাই গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত নারীদের অধস্তনতা চিত্রায়িত হতে থাকে এবং পুরুষ যেভাবে দেখতে চায় সেভাবেই গণমাধ্যমে নারীদেরকে তুলে ধরা হয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে নারীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় : আমাদের দেশে প্রচলিত প্রধান গণমাধ্যমগুলো হচ্ছে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ইত্যাদি। গণমাধ্যমে নারীর যে চিত্র দেখা যায় তা নারীদের জন্য অবমাননাকর এবং সেটা তার অধস্তনতাকে নির্দেশ করে। যদিও বর্তমানে কিছু কিছু গণমাধ্যমে নারীদের ইতিবাচক দিক তুলে ধরা হয় কিন্তু এটা পরিমাণে খুব গণ্য। গণমাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা নারীদের নেতিবাচক উপস্থাপনই দেখে থাকি। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রধান গণমাধ্যমে নারীকে কিভাবে উপস্থাপন করা হয় তা নিচে আলোচনা করা হলো :
১. সংবাদপত্রে নারী : গবেষণায় দেখা যায়, স্বাভাবিক অবস্থায় সংবাদপত্রের মাত্র ৫ শতাংশ জায়গা থাকে নারীদের জন্য। প্রথম পাতায় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের পাশে নারীদের সংবাদ থাকে খুব কমই। নারী বিষয়ক যেসব আইটেম কাগজে ছাপা হয়, তাতে আবার একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে নারীদের ছবি। সংবাদপত্রের কাটতি বাড়ানোর জন্য নারীদের ছবিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। সংবাদপত্রের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন, মালিক শ্রেণির স্বার্থ বজায় রাখা এবং সেসব চিন্ত ভিাবনা ও মূল্যবোধের, যা পাঠকের মানসিকতায় বিরাজমান। আমাদের দেশে সংবাদপত্রগুলোতে নারীদেরকে যেভাবে তুলে ধরা হয় তার কতকগুলো রূপ নিম্নে দেয়া হলো :
ক. নির্যাতিতা হিসেবে নারী : সংবাদপত্রের পাতায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতার প্রতিফলন ঘটছে। এর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক উভয়ই আছে। বর্তমানে নির্যাতনের খবরগুলো গুরুত্বসহকারে ছাপার ফলে সমাজে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে এক ধরনের ধিক্কার সৃষ্টি হচ্ছে এবং কখনো কখনো তার ভিত্তিতে সামাজিক আন্দোলনও গড়ে উঠছে। আবার রক্ষণশীল ধারার গণমাধ্যমে ক্ষেত্রবিশেষে এমন ইঙ্গিত থাকে যে, মেয়েরা রাস্তাঘাটে অবাধে চলাফেরা করছে বলেই ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি বেশি ঘটছে। ফলে মেয়েদের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। আবার কিছু কিছু পত্রিকা কাটতি বাড়ানোর জন্য এবং পাঠকের বিকৃত বিনোদনের জন্য ধর্ষণের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ছাপছে। এছাড়া সংবাদপত্রে অপরাধীর বদলে নির্যাতিতা নারীদের ছবি ও পরিচয় প্রকাশের কারণে নির্যাতিতা নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খ. অসহায় ও দুর্বল হিসেবে নারী : বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, দুর্ভিক্ষের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রে নারীদের ছবিই প্রাধান্য পায়। এক্ষেত্রে নারীদের দুর্বল ও অসহায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া এসব দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে অসহায় নারীদের ছবিই সংবাদপত্রগুলোতে দেখা যায়।
প. আদর্শ ও সুন্দরী নারী : বর্তমানে বিভিন্ন সংবাদপত্রে নারীদের জন্য আলাদা পাতা থাকে এটাকে বলে ‘নারীপাতা’। এ নারীপাতায় জুড়ে থাকে রান্নাবান্না, ঘর সাজানো, নারীদের সাজগোজ এবং রূপচর্চার কথা। আর পত্রিকার সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য থাকে সুন্দর সুন্দর নারী মডেলের ছবি। নারীর সৌন্দর্যকে এখানে গুরুত্ব দেয়া হয়। তবে বর্তমানে কিছু কিছু পত্রিকায় নারী অধিকার, নারী আন্দোলন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখা হয়। যেমন- দৈনিক প্রথম আলোর নারী মঞ্চ পাতা।
ঘ. খেলার পাতায় নারী : খেলার পাতায় নারীদের খবর থাকে খুব কম। নারী খেলোয়াড়দের খেলার খবরের চেয়ে তাদের মোহময়ী ভঙ্গির ছবি প্রকাশ করার দিকে বেশি আগ্রহ দেখা যায়। যেমন- সানিয়া মির্জা, শারাপোভা, আনা কুর্নিকোভার মতো গ্লামারাস খেলোয়াড়দের ছবিই সংবাদপত্রে বেশি দেখা যায়। তাদের সৌন্দর্যকে এখানে পুঁজি করা হয়
পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য।

  1. পত্রিকার বিজ্ঞাপনে নারী: সংবাদ হিসেবে নারীকে সংবাদপত্রের পাতায় বেশি দেখা না গেলেও পত্রিকার বিজ্ঞাপনগুলোতে নারীর ছবি দেখা যায়। এখানেও সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেয়া হয় পণ্যের প্রচারের জন্য। নারী হয় সৌন্দর্য সর্বস্ব।
    ২. রেডিওতে নারীকে উপস্থাপন রেডিওতে প্রচারিত মহিলাদের অধিকাংশ অনুষ্ঠান পত্রিকার মহিলা পাতার অনুরূপ। সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন রেডিওতে নারীদের নিয়ে সাধারণত যেসব অনুষ্ঠান হয় তার মধ্যে রয়েছে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক অনুষ্ঠান। রেডিওতে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক অনুষ্ঠানে মুখ্য ভূমিকা থাকে নারীর। কেননা নারীকে সহজেই জনুশাসন পদ্ধতির ভোক্তায় পরিণত করা যায়। এ সকল বিজ্ঞাপন মনে করিয়ে দেয় যে, জন্মদান ব্যতীত নারীর
    দ্বিতীয় কোনো ভূমিকা প্রায় নেই-ই। নারীকে সমাজ রূপান্তরের কর্মে ভূমিকা রাখতে হবে এ সত্য নারীদের জন্য বরাদ্দ সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানেও উচ্চারিত হয় না।
    ৩. টেলিভিশনে নারীর চিত্রায়ণ : টেলিভিশন বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী গণমাধ্যম এবং এর ব্যবহারকারীও পৃথিবীব্যাপী চেয়ে বেশি। আর অডিও ভিস্যুয়াল মিডিয়া হওয়ার কারণে এতে, নারীকে সৌন্দর্য ও যৌনতার প্রতীক
    হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা থাকে কারণ সমাজও নারীকে সেভাবে দেখে। টেলিভিশনের সংবাদ, নাটক, টেলিফিল্ম,
    ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে নারীকে সৌন্দর্য ও যৌনতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। টিভিতে আমরা নারীকে যেভাবে দেখি তার কয়েকটি চিত্র নিম্নে দেয়া হলো।
    ক. সনাতন বা গতানুগতিক ভূমিকায় নারী : নারীর প্রধান কাজ সপ্তান লালনপালন, ঘরগৃহস্থালির দেখাশোনা, রূপচর্চা, রান্নাবান্না ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
    খ. সুন্দর নারী : বর্তমান নাটকগুলোতে বেশিরভাগ নারীর ভূমিকা হয় প্রেমিকার। পুরুষের প্রশংসা ও ভালোবাসা পাওয়ার জন্যই যাদের জন্ম। কেবল সৌন্দর্যই এদের গুণাগুণ বলে বিবেচ্য। শুধু নাটক নয়, সব অনুষ্ঠানে সৌন্দর্যকে গুরুত্ব
    ৭. শোভাবর্ধক : টক শো কিংবা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানগুলোতে নারীদের প্রাধান্য নেই, তারা থাকে উপস্থাপকের সহকারী হিসেবে। এখানে তার অবস্থান শোভাবর্ধকের।
    ঘ. মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীর ব্যবধান : বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকগুলোতে বছরের পর বছর ধরে নারীর কিছু গৎবাধা প্রতিমা কাজ করছে। যেমন- ধনাঢ্য ঘরের মেয়ে মানেই সে হবে হাতকাটা ব্লাউজ পরা, উচ্ছৃঙ্খল, খেয়ালি। মধ্যবিত্ত ঘরের মায়েরা হবেন সন্তান অন্তপ্রাণ, সহস্র, পরল শান্তিবাদী। গ্রামীণ তরুণী হবে অবশ্যই আত্মমর্যাদাহীন
    ভালোবাসায় সমর্পিত এবং সতীত্ব রক্ষায় ব্যস্ত।
  2. সংবাদ পাঠিকা হিসেবে নারী : সংবাদ পাঠিকা হিসেবে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাই বেশি। এটা প্রমাণ করে যে, টেলিভিশন সংবাদ বিভাগে নারীর সৌন্দর্যকে মূল্য দেয়া হয়।
    চ. টিভি বিজ্ঞাপনে নারী : পণ্য বিক্রির মাধ্যম হিসেবে নারী মুখ ও নারী দেহকে যতটুকু সম্ভব নগ্নভাবে ‘Exploit’ করা। আমাদের দেশের টিভি বিজ্ঞাপনগুলো নারীর স্টেরিওটাইপ ইমেজ তুলে ধরতে তৎপর। কর্তব্যপরায়ণ মা, সুচারু গৃহিণী এবং সুসজ্জিতা, সুদর্শনা, প্রেমময়ী স্ত্রী ভোগবাদী সমাজের এ নারীরূপ টেলিভিশন বিজ্ঞাপন বার বার প্রতিফলিত ও
    সুপ্রতিষ্ঠিত করছে। বিজ্ঞাপন আজ নারীসর্বস্ব। যে সমাজে নারী পণ্য ছাড়া আর কিছু নয় সে সমাজের গণমাধ্যম তাকে ঐরূপেই উপস্থাপিত করবে এটাই স্বাভাবিক।
    চলচ্চিত্রের পর্দায় নারীর উপস্থাপন : অন্য শিল্প মাধ্যমগুলোর তুলনায় চলচ্চিত্রে নারীদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। চলচ্চিত্র শিল্পে নারীরা ভোগের উপ্যমান। চলচ্চিত্রে নারী পুরুষের চোখে দেখা অপর লিঙ্গমাত্র। বাংলাদেশের লচ্চিত্রে নারীদেরকে সাধারণত যেভাবে তুলে ধরা হয় তা আলোচনা করা হলো :
    ক. নিষ্ক্রিয় : চলচ্চিত্রে পুরুষ চরিত্র সবসময় সক্রিয়। অন্যদিকে, নারী চরিত্র সবসময়ই নিষ্ক্রিয় ও ক্ষমতাহীন।
    খ. যৌন উদ্দীপক : চলচ্চিত্র নারীদেরকে যৌন উদ্দীপক উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করে। নারীদেরকে এমন সব পোশাক পরানো হয় এবং এমন ভাবভঙ্গি করতে বাধ্য করা হয়, যা যৌন আবেদন সৃষ্টি করে।
    গ. পতিব্রতা স্ত্রী : অধিকাংশ চলচ্চিত্রে নারীকে পতিব্রতা হিসেবে দেখানো হয়। যার একমাত্র কাজ হলো লম্পট স্বামীকে ভালো পথে আনা, নানা কলাকৌশলে স্বামীকে ঘরে ফিরিয়ে এনে তার সেবায় আত্মোৎসর্গ করা।
    ঘ. প্রেমিকা : চলচ্চিত্রের পর্দায় নারীর প্রেমিকা রূপটিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এ নায়িকার কাজ হলো যে, কোনোভাবে নায়ককে প্রেমের ফাঁদে ফেলা এবং তার মনোযোগ আকর্ষণ করা।
    ঙ. পেশাহীন : অধিকাংশ চলচ্চিত্রে নারীদের কোনো পেশা দেখানো হয় না। নারীদের অংশগ্রহণ থাকে মা, বোন এবং প্রেমিকা হিসেবে। তবে দু’একটি সিনেমায় নায়িকাকে উকিল কিংবা পুলিশের ভূমিকায় দেখা যায়।
    চ. ধর্ষিতা নারী : বাংলাদেশের মূলধারার প্রায় সব চলচ্চিত্রেই কয়েকটি করে ধর্ষণের দৃশ্য থাকে। দেখা যায়, নায়কের বোন বা অন্য কেউ ধর্ষিত হলে সে আত্মহত্যা করে। এতে সমাজে ধর্ষিতা নারীদের আত্মহত্যা করার দিকে
    উৎসাহিত করা হয়।
    উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে নারীকে কিভাবে উপস্থাপন করা হয় তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীদেরকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে। তবে সমাজে নারীর যে বৈষম্যমূলক অবস্থান তার জন্য গণমাধ্যম একা দায়ী নয় এবং গণমাধ্যমই শুধু নারীদের নেতিবাচক ইমেজ প্রতিষ্ঠা করে না। গণমাধ্যম ও নারীদের মধ্যকার নেতিবাচক সম্পর্কের জন্য দায়ী আমাদের সমাজের বৈষম্যমূলক মতাদর্শ। তাই আমাদেরকেই সক্রিয় হতে হবে গণমাধ্যমে নারীদেরকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার জন্য।
পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!