Answer

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারীদের অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া আলোচনা কর। সংরক্ষিত আসনে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য তুমি কী কী সুপারিশ করবে?

অথবা, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারীদের অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া বর্ণনা কর। সংরক্ষিত
আসনে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য তোমার সুপারিশমালা তুলে ধর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের অন্যতম অঙ্গ হিসেবে আইনসভা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেননা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ আইনসভার মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে আইন প্রণয়ন করে এবং আইন পরিষদে আস্থাভাজন মন্ত্রিপরিষদ দেশ শাসন করে। জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংস্থা। জাতীয় সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া : বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা দেশের পশ্চাৎপদ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও শ্রেণির স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে যে খুব আগ্রহী ছিলেন তা সংবিধানে সন্নিবেশিত বিভিন্ন অনুচ্ছেদ থেকে বুঝা যায়। রাষ্ট্রের এই অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে। অনুচ্ছেদ ৯,১০,১২,১৯, ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৬৫ তে নারীর সমঅধিকার এবং পার্লামেন্টে তাদের অংশগ্রহণের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ সমন্বয় গঠিত স্থানীয় শাসন, শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎসাহ করবেন এবং এসব প্রতিষ্ঠান সমূহকে কৃষক, শ্রমিক এবং মহিলাদেরকে যথাসম্ভব বিশেষ প্রতিনিধিত্ব দেয়া হবে। অনুচ্ছেদ ১০-এ বলা হয়েছে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনুচ্ছেদ ১৯ এ বলা হয়েছে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবেন। ২৭ নং অনুচ্ছেদ বলা আছে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- (১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। (২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন । (৩) কেবল ধর্ম; গোষ্ঠী; বর্ণ; নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশে কিংবা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তির বিষয় কোনো নাগরিককে কোনোরূপ অসমতা, বাধ্যতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাবে না। (৪) নারীরা বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের ও যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হতে এ অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না। ২৯নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- (১) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে। (২) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হবে না কিংবা সেক্ষেত্রে তার প্রতি কোনো বৈষম্য থাকবে না।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ৩০০টি সাধারণ আসন সম্বলিত একটি এককক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা। এ আসনগুলো সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্তি সাপেক্ষে একক ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত। এর সাথে মহিলাদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসন সমন্বয় সংসদের মোট আসন সংখ্যা ৩৫০টি।নারীদের পশ্চাদপদতার কথা ভেবে মহিলাদের জন্য ৫০টি আসন (সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আসন সংখ্যা ৪৫ হতে ৫০ এ বর্ধিত করা হয়) রাখা হয়েছে। অবশ্য এ ব্যবস্থা নারীর সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করেনি। ফলে নারীরা দু’ভাবে জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি হওয়ার অধিকার লাভ করেছেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সাধারণ আসন এবং সংরক্ষিত মহিলা আসন।
সংরক্ষিত আসনে অংশগ্রহণ : সংরক্ষিত নারী আসনের সূত্রপাত ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর থেকেই। এ সময় পাকিস্তানের ১-৭টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু এ সংখ্যা বিভিন্ন সময় উঠানামা করতো। ১৯৫৪ সালে যুক্ত ফ্রন্টের সরকার সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫টি নির্ধারণ করে। ১৯৭২ সালে সংবিধানের ৬৫নং ধারার মাধ্যমে সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়। এতে বলা হয় এ সংবিধান প্রবর্তন হতে ১০ বছর পর্যন্ত সংসদে ১৫টি আসন কেবল নারী সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এ বিধান অনুযায়ী প্রথম সংসদে ১৫জন নারী সদস্য সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত এমপিদের দ্বারা নির্বিাচিত হয়। ১৯৭৮ সালে সংবিধানের এ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৩০ এ এবং সময় ১০ থেকে ১৫ বছর করা হয়। ১৯৯০ সালে সংবিধানের দশম সংশোধনী পাস হয় এবং এর ফলে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন আরো দশ বছর বাড়ানো হয়। ফলে পঞ্চম (১৯৯১-৯৫) ও সপ্তম (১৯৯৬-২০০১) সংসদে ৩০ জন মহিলা সদস্য সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত হন। সংবিধানের দশম সংশোধনী অনুযায়ী মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ সময় ২০০১ সালের এপ্রিলে শেষ হয়। ফলে সপ্তম সংসদে সংরক্ষণ সময় আরো বৃদ্ধি করে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়নি। কিন্তু অষ্টম সংসদে ও মাঝামাঝি সময় অর্থাৎ ২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে আসন সংখ্যা ৪৫ করা হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর গঠিত ৮ম জাতীয় সংসদের প্রথম দিকে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে নারী সদস্য নির্বাচিত হয়নি। ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৩০ থেকে ৪৫ এর উন্নীত করা হয়। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংক্ষিত মহিলা আসন থেকে ৫০ এ উন্নীত করা হয়। ফলে ১০ম জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে এবং তারা সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতিতে বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায়, জাতীয় সংসদের সদস্যগণ যেসব আইন প্রণয়ন করে তা কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেই নয়, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে। সুতরাং আইন প্রণয়নের এ সর্বোচ্চ সংস্থায় নারীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব বহাল রাখা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!