ডিগ্রি ২য় বর্ষ(২০১৯-২০) নিয়মিত ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ চলবে ৭/০২/২০২৩ থেকে ৭/০৩/২০২৩ পর্যন্ত। *পরীক্ষা হবে কেন্দ্র খালি থাকলে এপ্রিলের শুরুতে বা ঈদের পরপরই। কলেজসমূহে ফরম পূরণ ফি ১৫০০ এর মধ্যে।

নেতৃত্বের মূল উপাদানসমূহ আলোচনা কর।

অথবা, গ্রামীণ নেতৃত্ব কী? গ্রামীণ নেতৃত্বের মূল ভিত্তিসমূহ উল্লেখ কর।
অথবা, গ্রামীণ/স্থানীয় নেতৃত্ব কাকে বলে? গ্রামীণ নেতৃত্বের মূল উপাদানগুলো লিখ।
উত্তর৷৷ ভূমিকা :
বিশ্বের প্রতিটি দেশের সমাজব্যবস্থাতেই নেতৃত্বের বিষয়টি সমাজের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।কারণ নেতৃত্ববিহীন কোনো সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ টিকে থাকতে পারে না। বর্তমান আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় স্থানীয় বা গ্রামীণ নেতৃত্বের ধারণা দিন দিন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নেতৃত্বের প্রয়োজন শুধু যে আন্তর্জাতিক এবং রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পরিসরেই নয়, স্থানীয় পর্যায়েও নেতৃত্ব প্রয়োজন । বৃহত্তর সমাজের উন্নয়নের জন্য তৃণমূল পর্যায়েও নেতৃত্ব প্রয়োজন ।
গ্রামীণ নেতৃত্ব : শাব্দিক অর্থে বাংলা ‘নেতৃত্ব’ শব্দটি ইংরেজি ‘Leadership’ শব্দের বাংলা প্রতিরূপ। নেতৃত্ব কথাটির
সাথে ‘নেতা’ বা (leader) এবং ‘কর্তৃত্ব’ বা আধিপত্য (Authority) এর বিষয়টি জড়িত। নেতৃত্ব মূলত একটি সামাজিক গুণ ।সাধারণ অর্থে, স্থানীয় এলাকাকে ঘিরে যে নেতৃত্ব গড়ে উঠে এবং বিকাশ লাভ করে তাকে স্থানীয় নেতৃত্ব বা গ্রামীণ নেতৃত্ব বলা হয় । অর্থাৎ গ্রাম বা এলাকাভিত্তিক নেতৃত্বই গ্রামীণ নেতৃত্ব।পারিভাষিক অর্থে, গ্রামীণ নেতৃত্ব হলো স্থানীয় বা গ্রামীণ ব্যক্তিদের আচরণগত গুণাবলি, যার মাধ্যমে তারা ব্যক্তিগত বা সংগঠিতভাবে স্থানীয় লোকজনের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যান এবং স্থানীয় এলাকাকে ভিত্তি করে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করেন।বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বে নেতৃত্বের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার স্থানীয় নেতৃত্বও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রামীণ নেতৃত্ব অত্যাবশ্যকীয় ।
গ্রামীণ নেতৃত্বের মূল উপাদানসমূহ : স্থানীয় বা গ্রামীণ সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে বিষয়সমূহ নেতৃত্বের মূল ভিত্তি বা উপাদান হিসেবে কাজ করে সেগুলি নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
১. বংশগত মর্যাদা : গ্রামীণ নেতৃত্বের একটি বড় উপাদান হলো বংশ মর্যাদা। গ্রামীণ সমাজে যে বংশে শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বেশি এবং উচ্চ পদস্থ চাকুরী করে সেই বংশ গ্রামীণ সমাজে ক্ষমতাবান। আবার যে বংশে সদস্যা-সংখ্যা বড় সে বংশ ব্যাপক জনসমষ্টির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। রাবতোবিছ যথার্থই বলেছেন “গ্রামবাসীরা নিজেদের উচ্চ বংশ, মধ্যবংশ ও নিচু বংশ এই তিন রকম পদমর্যাদাভোগী দলে বিভক্ত করেছে”।
২. ব্যক্তিগত গুণাবলি : জনসাধারণের মধ্য অভিন্ন শ্রেণিগত পটভূমি সত্ত্বেও বক্তৃতা করা, জনমত সংগঠিত করা, এবং বিভিন্ন বিষয়ে জনগণকে সংগঠিত করার সামর্থ্য সম্পন্ন ব্যক্তি বিশেষ হয়ে থাকে। এছাড়াও ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা,জনপ্রিয়তা, ক্যারিশমা, শিক্ষা, সততা ইত্যাদি গুণাবলির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি নেতা হতে পারেন। তাছাড়াও সমাজের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, চাকুরীজীবী বা অন্য যে কোনো উন্নত পেশার ব্যক্তিরা নেতৃত্বের আসন অলঙ্কত করতে পারেন।
৩. ভূমির মালিকানা : বর্তমানে সমাজব্যবস্থা আধুনিক হলেও গ্রামীণ সমাজের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে কৃষি। গ্রামীণ সমাজে ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘ভূমি’। যে যত বেশি ভূমির মালিক সে তত বেশি সম্মানিত। ভূমির মালিক তার অধীনে কাজ করা বর্গাচাষী, ভূমিহীনদের প্রভু হিসেবে মনে করে, তাই ভূমির মালিকানা অতি সহজেই নেতা বা নেতৃত্ব তৈরি করে।
৪. পারিবারিক ঐতিহ্য : গ্রামীণ নেতৃত্বের অন্যতম একটি প্রধান উপাদান পারিবারিক ঐতিহ্য। বিশেষ মর্যাদার অধিকারী, ক্ষমতাশালী, অভিজাত, জমিদার/জমির মালিকেরা নেতা হিসেবে স্বীকৃত। উদাহরণস্বরূপ- মিয়া বাড়ী,মিয়াসাহেব, তালুকদার, খান, চৌধুরী বাড়ির প্রধান গ্রামের নেতা হন। তাদের মৃত্যুর পর পরবর্তী পরিবার প্রধান নেতা হিসেবে স্বীকৃত পান ।
৫. রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের সাথে যোগাযোগ : বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় প্রশাসন ব্যবস্থা শহর থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত। সরকার তার কাজের সুবিধার্থে আমীণ কিছু নেতার সাহায্য নেয়। এ সময়ে যারা সরকারের সাথে সংযোগ রক্ষা করে চলতে পারে তারা গ্রামীণ নেতৃত্ব পেয়ে যান। উদারহরণস্বরূপ- সরকারি বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজ যেমন- রিলিফ, অর্থ সাহায্য, খাদ্য-সাহায্য প্রদান করে, এ সময় যারা সরকারের সাথে লিয়াজোঁ করতে পারে তারা নেতৃত্ব পেয়ে যান।
৬. ধর্মীয় প্রাধান্য : ধর্মকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। অতীতে ধর্মীয় প্রধানরাই সমাজের নেতৃত্ব দিতো। বর্তমানে মসজিদের ইমাম, পীর-মাশায়েয, মাদ্রাসার শিক্ষক, মাওলানা, মৌলভী, পুরোহিতরা ধর্মীয় সমস্যার সমাধান ছাড়াও যে কোনো বিরোধ মীমাংসা করে থাকেন। এভাবে তারা গ্রামীণ সমাজে নেতৃত্ব পেয়ে যায় ।
৭. আত্মীয়তার সম্পর্ক : গ্রামীণ সমাজ কাঠামোতে যারা শহরে অভিজাত পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করেন, গ্রামীণ সমাজে ঐ আত্মীয়তার সম্পর্ক কে কাজে লাগিয়ে নেতা হয়ে বসেন। কারণ ঐ আত্মীয়ের মাধ্যমে তারা প্রশাসনিক বা আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিভিন্ন জরিপ বলছে, বড় বিয়ে বা আত্মীয়তা করার সুবাদে অনেকেই নেতা হয়েছেন।
৮. সন্ত্রাস সৃষ্টির সামর্থ্য : বর্তমান সময়ে গণতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও “জোর যার মুল্লুক তার”নীতিতে কাজ হচ্ছে। নেতা হওয়ার জন্য গ্রামীণ সমাজে কেউ কেউ সন্ত্রাসী পোষে। এরা সন্ত্রাসের ভয় দেখিয়ে গ্রামীণ নেতৃত্ব কজ্বা করার চেষ্টা করে। তবে যে বা যারা এটা করতে পারে দুভার্গ্যজনকভাবে এরাও সমাজের নেতা হয়ে যান।
৯. আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতরেই যারা ক্ষমতা ভোগ করে যেমন (UP চেয়ারম্যান,মেম্বার) এরা সরকার এ আইনগতভাবে স্বীকৃত নেতা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলে এরা গ্রামীণ নেতৃত্বে প্রভাব বিস্তার করে।
১০. অর্থ ঋণদানের ক্ষমতা : গ্রামীণ সমাজে যার যত বেশি অর্থ থাকে সে তত বেশি ক্ষমতাবান। যে কোনো ব্যক্তি দরিদ্র কৃষক বা ঋণগ্রহীতাকে সহজেই তার কর্তৃত্বে নিয়ে আসতে পারে। আগের দিনে গ্রামে মহাজনরা দরিদ্র কৃষকদের অর্থ ঋণ দিয়ে তাদের উপর কর্তৃত্ব সৃষ্টি করে নেতৃত্ব দিতো। বর্তমানে মহাজনী ব্যবস্থা না থাকলেও তার জায়গা দখল করছে ধনী ব্যক্তি, চাকুরীরত ব্যক্তি, ব্যাংক ব্যালেন্সকারী ব্যক্তিবর্গ।
১১. রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা : ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততা কিংবা কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সাথে যোগাযোগ গ্রামীণ সমাজে ক্ষমতাবান ও নেতা হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। গ্রামীণ নেতৃত্ব এর সঙ্গে গ্রামীণ রাজনীতির একটি মজবুত সম্পর্ক রয়েছে। অনেক সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মী ক্ষমতার প্রভাবে গ্রামীণ নেতা পরিণত হয়।
১২. এনজিও : গ্রামীণ নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম একটি হাতিয়ার NGO। বিভিন্ন NGO গ্রামে ঋণ বিতরণ করে।যারা NGO সাথে ভাল সম্পর্ক রাখে কিংবা NGO তে চাকুরী করে তারা ভূমিহীন বা কৃষক শ্রেণির হাতে ঋণ দেওয়ার বদৌলতে নেতা হতে চায়। কৃষকরা বা ভূমিহীনরা এদের নেতৃত্ব স্বীকার করে নেয়। এভাবে NGO গ্রামীণ নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
উপসংহার : আলোচনা শেষে বলতে পারি, গ্রামীণ সমাজে বিভিন্নভাবে নেতৃত্ব তৈরি হতে পারে। তবে ভূমির মালিক বা মহাজনরাই হল আসল নেতা। এরা কৃষকদের নিজেদের কর্তৃত্বে রাখে সবসময়। এরা নিজেদের সন্তানদের শহরে উচ্চ শিক্ষার শিক্ষিত করে সমাজের উঁচু স্থানে চলে যায়। পরবর্তীতে ঐ উচ্চ শিক্ষিত সন্তানরাই আবার কোনো একসময় গ্রামের নেতার পরিণত হয়। তবে বর্তমান পরিবর্তনশীল সমাজে এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে অহরহ।

পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!